জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ২০২২-২৩ অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। এখন পর্যন্ত ১১ মাসে আয় হয়েছে ২ লাখ ৮২ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা। লক্ষ্য পূরণে চলতি জুনে ৮৭ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ করতে হবে, যা প্রায় অসম্ভব বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, ডলার সংকট, পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং এলসি (ঋণপত্র) কমে যাওয়ার কারণে রাজস্ব আয় কমেছে। ফলে অর্থবছর শেষে ঘাটতি থেকে যাবে বড় একটি পরিমাণ অর্থ।
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, মে মাস পর্যন্ত আগের মতোই ভ্যাট আদায় সবচেয়ে বেশি হয়েছে, যা প্রায় ১ লাখ ৯৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের ১১ মাস পর্যন্ত যদিও ভ্যাট আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ২১ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, মূল্যস্ফীতির কারণেই ভ্যাট আহরণ বেড়েছে। এর পরই সবচেয়ে বেশি আহরণ হয়েছে আয়কর। আর কম আহরণ হয়েছে আমদানি ও রফতানি পর্যায়ের (কাস্টমস) রাজস্ব।
চলতি অর্থবছরে কাস্টমস থেকে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ১ লাখ ১১ হাজার কোটি, স্থানীয় পর্যায়ে মূসক (ভ্যাট) থেকে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৯০০ কোটি এবং আয়কর ও ভ্রমণ কর থেকে ১ লাখ ২২ হাজার ১০০ কোটি টাকা। তবে মে মাস পর্যন্ত কাস্টমস থেকে রাজস্ব আয় হয়েছে ৮৩ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকা। যদিও এ ১১ মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪৬৪ কোটি টাকা। স্থানীয় পর্যায়ে মূসক (ভ্যাট) থেকে আয় হয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার ৮০৯ কোটি। যেখানে মে মাস পর্যন্ত ১ লাখ ২১ হাজার ৮৪১ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। মে মাস পর্যন্ত আয়কর ও ভ্রমণ কর থেকে ৯২ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য থাকলেও এসেছে ৮৮ হাজার ৯৫৯ কোটি টাকা। সে হিসাবে রাজস্ব আয়ের কোনো খাতেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি এনবিআর। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৬ হাজার ৮১৬ কোটি টাকা ঘাটতি কাস্টমস রাজস্বে। এর পরই রয়েছে ভ্যাটের ঘাটতি, ১২ হাজার কোটি টাকা। আয়কর ও ভ্রমণ করে ঘাটতি ৩ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা।
এনবিআরের হালনাগাদ তথ্যে অবশ্য দেখা যায়, মে মাসে কাস্টমস খাতে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আয় হয়েছে। আয়কর ও ভ্রমণ করে রাজস্ব আয় হয়েছে ১ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা বেশি। তবে মূসকে ১ হাজার ৮৯৫ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ে ঘাটতি রয়েছে।
জানতে চাইলে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমদানিতে রাজস্ব আয় বেশি হওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার। হঠাৎ করে কী এমন পণ্য আমদানি বাড়ল, সেটা দেখা দরকার। কৃচ্ছ্রসাধনের এ সময়ে বিলাসবহুল পণ্য আমদানি বেড়েছে কিনা তাও ভালো করে দেখতে হবে। এছাড়া মূসকে রাজস্ব আয়ে ঘাটতির সঙ্গে মানুষের কেনাকাটা কমিয়ে দেয়ার বিষয়টি জড়িত।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অবশ্য বলেন, ‘গত মাসগুলোয় গাড়ি আমদানি বেড়ে যাওয়ায় রাজস্ব আয় বেড়েছে, যা চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে একেবারেই ছিল না।’ আগামী মাসেও কাস্টমসে রাজস্ব আয় বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ১৪ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকা। তবে সেই লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি এনবিআর। উল্টো ঘাটতি রয়েছে ৩২ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা। সেই হিসাবে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে জুনে ৮৭ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ করতে হবে।
এদিকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদরা যদিও এনবিআরের এ রকম লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণকে অস্বাভাবিক বলে মন্তব্য করছেন। বর্তমান সময়ের বাস্তবতায় উচ্চাভিলাষী এমন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব বলেই মত তাদের। অবশ্য এনবিআর কর্মকর্তাদের মতে, শিগগিরই ডলার সংকট কেটে যাবে। আবারো গতি ফিরবে ব্যবসা-বাণিজ্যে, রাজস্ব আয়ও বাড়বে।
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, ‘এনবিআরের রাজস্ব আয়ের তিনটি খাতের পারস্পরিক সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। ঘাটতি কমাতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বছরের কোনো এক সময় রিভাইস করে এনবিআর। তবে এবার তা করা হয়নি। এনবিআর হয়তো মনে করেছে কিংবা দেখাতে চায় দেশের অর্থনীতি ভালো আছে।’