জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে সরকার বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নিচ্ছে না। এলএনজির ওপর আরো নির্ভরতার কৌশল বাড়িয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত ‘শ্বেতহস্তী’তে পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
গতকাল গুলশানের একটি হোটেলে জ্বালানি ও বিদ্যুৎবিষয়ক সমস্যা এবং প্রস্তাবিত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে করণীয় শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলা হয়। অনুষ্ঠানে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এ-সংক্রান্ত গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাত সংকটাপন্ন মুহূর্ত পার করছে। অথচ গত এক দশকে এ খাতের অনেক অর্জনও আমরা দেখেছি। সিংহভাগ মানুষের কাছে বিদ্যুৎ সংযোগ পৌঁছে গেছে। সারা দেশে পাওয়ার জেনারেশনে অভূতপূর্ব পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু এগুলো করতে গিয়ে আমরা ভুলভাবে আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছি। জ্বালানি পছন্দের ক্ষেত্রে একধরনের ভুল রয়েছে, যে কারণে এ খাতে একধরনের দায় বাড়ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানিতে ভর্তুকি বাড়ছে। সেখানে জীবাশ্ম জ্বালানির ক্ষেত্রে কেবল উৎসাহ দেয়া হচ্ছে।’
বিদ্যুৎ খাতের উচ্চমূল্য শিগগিরই চলে যাবে না। এটা আরো কিছুকাল থাকবে। আমদানিনির্ভর জ্বালানির কারণে ক্যাপাসিটি পেমেন্টের সমস্যাটা আগামীতেও থেকে যাবে বলে জানান এ গবেষক।
তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাত ভর্তুকিনির্ভর হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে ভর্তুকির রেট গত বছরের তুলনায় ৩৪ শতাংশ বেড়েছে। জিডিপি হিসাবে এটি অনেক বড়। ভবিষ্যতে এ ভর্তুকির বিষয়টি কীভাবে হ্যান্ডল করা হবে? এর ফলে সামাজিক নিরাপত্তা খাতগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে কিনা, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।’
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘এবারের বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দ ২৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। বাড়তি বরাদ্দের ৯৩ শতাংশ রাখা হয়েছে পাওয়ার জেনারেশনে। বাজেটে ৯৬টি প্রজেক্টের মধ্যে মাত্র পাঁচটি দেখতে পাচ্ছি নবায়নযোগ্য জ্বালানি। আগামীতে ২৩ হাজার মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ যোগ হতে যাচ্ছে বলে অর্থমন্ত্রী বলেছেন। বাড়তি এ বিদ্যুৎ নিয়ে কী করব, সেটাই দুশ্চিন্তার কারণ।’
সিপিডির মতে, সরকার জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নিচ্ছে না। বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে যে উদ্যোগ ও পরিকল্পনা নেয়া দরকার তা হচ্ছে না। বিদ্যুৎ খাতে এলএনজির ওপর আরো নির্ভরতার কৌশল দৃশ্যমান হচ্ছে। অথচ এ জায়গা থেকে সরে আসা দরকার। নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে এখনো এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। অথচ এটিতে বড় বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। সরকারের নেয়া উদ্যোগ শুভকর নয় বলেও মনে করছে সিপিডি। তারা বলছে, লোডশেডিং চলমান থাকবে। জ্বালানি খাতের জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ আগামীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। সেজন্য এ বিষয়ে নজর দেয়া প্রয়োজন।
বর্তমানে আইএমএফ-কেন্দ্রিক যে সংস্কার চলছে, সেই সংস্কার দিয়ে জ্বালানি খাতের সংস্কার সম্ভব হবে না। এর বাইরে অন্য দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও দেখতে হবে বলে মনে করে সিপিডি।
ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর খসরু মোহাম্মদ সেলিম বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানির যে সম্ভাবনা রয়েছে, সেটি আমরা কাজে লাগাতে পারছি না। ইরিগেশনে আমরা সোলার ব্যবহার করব। কিন্তু বাস্তবতা হলো অনেক বছর পেরিয়ে গেলেও আমরা মাত্র তিন হাজার সোলার পাম্প ইরিগেশন করেছি। কিন্তু কেন এটি আমরা করতে পারলাম না। কারণ সরকারের পলিসিগুলো প্রচার হয় না। এগুলো আমরা কাজে লাগাই না। দেশের প্রকৌশলীরা এ পলিসির বিষয়ে খুব বেশি জানেন না। স্টেকহোল্ডাররাও এ বিষয়ে জানেন না। কিন্তু মানুষ না জানলে কীভাবে বিনিয়োগ করবে? সে সুযোগ তো আমাদের দেশে নেই।’
সিপিডির উপস্থাপিত বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বলেন, ‘আমাদের সমস্যাটা জ্বালানির। বিদ্যুৎ খাতে এই যে সমস্যা, সভরেন গ্যারান্টি দিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছেন উদ্যোক্তারা। আমরা কথায় কথায় মেগাওয়াট নিয়ে কথা বলি। একটা সময় আমাদের বিদ্যুৎ ছিল না। গ্যাস ছিল। ফলে রাজনৈতিকভাবে একটা সময় মেগাওয়াটকে আমরা এমন জায়গায় নিয়ে গেছি যে এ মেগাওয়াটকে জ্বালানি দিয়ে পূরণ করার সক্ষমতা আর নেই।’
তিনি বলেন, ‘এ সংকটের পেছনে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও কডিভ মহামারীর কথা বলা হয়। আমরা মানছি এ সংকট ছিল। কিন্তু এটি কাটানোর জন্য পরিকল্পনা কোথায়? গত বছর এ সংকট যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে তখন তারা দেশে গ্যাসের এক্সপ্লোরেশনের কথা বলে। কিন্তু এখন গ্যাসের দাম কম, কয়লার দাম কমে যাওয়ায় আবারো সেই পুরনো মানসিকতায় চলে গেছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র বানাতে হবে। সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ৬০ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলেন মন্ত্রী। সভরেন গ্যারান্টি দিলে এগুলো করা যাবে। কিন্তু এগুলো কি চালানো যাবে? আদৌ কি এ বিদ্যুতের প্রয়োজন আছে? মেগাওয়াটের ভিত্তি আমরা বরাবরই প্রক্ষেপণ করি। এটি একটি ভুল ধারণা। দেশে পাওয়ার প্লান্ট হয়েছে। পাইপলাইন হয়নি। তাহলে কীভাবে এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র চলবে।’
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বদরূল ইমাম বলেন, ‘সিপিডির তথ্যবহুল এ প্রতিবেদন যথেষ্ট উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে আমাদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানির যে সমস্যা, সেটি চিন্তা করলে মৌলিকভাবেই আমাদের জ্বালানি সমস্যা রয়েছে। দেশের এ সমস্যা আগামী পাঁচ বছর কিংবা দুই বছরে কি ঠিক হয়ে যাবে? বাংলাদেশের জ্বালানির সিংহভাগ আসে গ্যাস থেকে। আর এ গ্যাসের অর্ধেক আসে শেভরনের আওতাধীন বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ড থেকে। এ ফিল্ডে একসময় ধস নামবে। সারা জীবন একটি গ্যাস ফিল্ড থেকে গ্যাস পাওয়া যায় না। তিন থেকে পাঁচ বছরে মধ্যে আকস্মিকভাবে এ ফিল্ডের গ্যাস উৎপাদন কমে যাবে। তখন কী হবে আসলে? এটার বিকল্প পরিকল্পনা নীতিনির্ধারকদের কি আছে? আমার জানা নেই।’
আলোচনায় জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, ‘আইন পরিবর্তন করে গণশুনানি তুলে দেয়া হয়েছে। যাতে আমরা বলতে না পারি যে কত হাজার কোটি টাকা কোথায় চুরি হয়েছে। কোথায় লুটপাট হয়েছে এবং কীভাবে হয়েছে তা যেন জানতে না পারি সে কারণে।’
তিনি বলেন, ‘২০২২ সালে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সময় দেখা গেল জ্বালানি উন্নয়ন ফান্ডের ৬৫ শতাংশ ব্যয় হয়নি। আর ৩৫ শতাংশ কোথায় কীভাবে ব্যয় করেছে, সেটা কেউ বলতে পারছে না। জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল, বিদ্যুৎ উন্নয়ন তহবিলে টাকা দিয়ে যাচ্ছি। এগুলো না দিলে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম কমত। আমাদের টাকার ওপরে সুদ নেয়া হচ্ছে। এভাবে আমরা ঠকছি।’