বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকটের মধ্যেই গত মাসের শেষের দিকে বাংলাদেশের ঋণমান একধাপ কমিয়ে বিএ৩ থেকে বি১-এ নামিয়ে দিয়েছে আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থা মুডি’স। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে এখন উঁচুমাত্রার দুর্বলতা ও তারল্যের ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে চলমান সংকটের মধ্যে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। তবে মুডি’স ঋণমান কমিয়ে দেয়ায় দেশের কিছু আসে যায় না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার।
মুদ্রানীতি ঘোষণা অনুষ্ঠানে গতকাল গভর্নর আব্দুর রউফ বলেন, ‘২০১২ সালে সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর জন্য মুডি’সের রেটিং নেয়া হয়েছিল। আমাদের রিজার্ভ ছিল ১০ বিলিয়ন ডলার। এরপর ১৩ বছর ধরে একই গ্রেড দিয়ে এসেছে। আমার যখন রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার হলো, মাথাপিছু আয় ৩ হাজার ডলারের কাছাকাছি গেল তখনো তারা গ্রেড পরিবর্তন করেনি। ১০ বছর আগের তুলনায় এখন বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক ভালো।’ তিনি বলেন, ‘যেসব কারণে এখন রেটিং কমানো হয়েছে, তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না। যেটা করা হয়েছে সেটাকে পিওর ইকোনমিক রিপোর্টিং বলা যাবে না। এর মধ্যে ভূরাজনৈতিক ব্যাপার-স্যাপার আছে। ২০১২ সালের সঙ্গে তুলনা করলে কোনো একটি নির্দেশকেও আমাদের অবস্থা খারাপ নেই। তাই এ রেটিং কমল কি বাড়ল এতে কিছু আসে যায় না।’ ভূরাজনৈতিক বিষয়টি কী? এ বিষয়ে জানতে চাইলে গভর্নর বলেন, ‘এ ব্যাপারে আর বিস্তারিত না বলাই ভালো।’
দেশের বাজারে হুন্ডির মহামারী চলছে বলেও মন্তব্য করেছেন গভর্নর। তিনি বলেন, ‘ডলারের বিনিময় হার ও রিজার্ভ—এ দুটি নিয়ে আমরা এখনো লড়াই করছি। রফতানি গত বছরের চেয়েও ৭ শতাংশ বেশি আছে। রেমিট্যান্স ২ শতাংশ বেশি আছে। দেশে হুন্ডির একটা মহামারী চলছে, আমরা যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছি। আমদানি কমিয়ে নিয়ে এসেছি। আমাদের অর্থনীতি আরো সবল হচ্ছে।’
আব্দুর রউফ তালুকদার বলেন, ‘আমাদের পাইপলাইনে ৫০ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ এরই মধ্যে অনুমোদন হয়ে আছে। এটা আমরা চার-পাঁচ বছরে খরচ করতে পারব। এ বছর যদি এর এক-চতুর্থাংশ বা ১২ বিলিয়ন ডলার ব্যবহার করতে পারি তাহলে ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টে একটা বিরাট জাম্প হবে।’
দেশের আটটি ব্যাংক সিআরআর ও এসএলআর রাখতে পারছে না জানিয়ে গভর্নর বলেন, ‘সিআরআর ও এসএলআর রাখতে না পারা ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে তাদেরকে নীতির মধ্যে ফিরিয়ে আনা। তারা যে সংকটে আছে তা থেকে উদ্ধার করা। আমরা সে লক্ষ্যে কাজ করছি। আশা করছি সেপ্টেম্বরের মধ্যেই যাদের সিআরআর সংকট আছে সেগুলো ঠিক হবে।’
ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে দুই বছর আগে দেশের ব্যাংকঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশ বেঁধে দেয়া হয়। ঋণের সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দেয়ার সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক ছিল মন্তব্য করে গভর্নর বলেন, ‘ওই সিদ্ধান্তটি অর্থনৈতিক বিচারে নেয়া হয়নি। আমরা রাজনৈতিক শীর্ষ নেতৃত্বকে বুঝিয়েছি। ৯ শতাংশ সুদের সিদ্ধান্তটি যখন নেয়া হয়েছিল, সেটি ওই সময়ের বিচারে ঠিক ছিল কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন। এ কারণে আমরা ঋণের সুদহারকে বাজারভিত্তিক করার উদ্যোগ নিয়েছি।’