বাস্তবতা থেকে দূরে থাকায় লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হতে পারে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট। এখনকার সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা-মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণও গুরুত্ব পায়নি বাজেটে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ‘বাজেট সংলাপে’ এসব বিষয় উঠে আসে।
গতকাল গুলশানের একটি হোটেলে বাজেট সংলাপের আয়োজন করা হয়। এতে বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতা, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, এনজিও কর্মকর্তা, শ্রমিক নেতা এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান এমপি।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ তুলে ধরেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, ‘বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাজেটের পদক্ষেপ মূল্যায়নে একটি মধ্যমেয়াদি পর্যালোচনা করা অত্যাবশক হয়ে পড়েছে।’ এ সময় তিনি সামষ্টিক অর্থনীতির চারটি সুস্পষ্ট চাপের কথা বলেন। এর মধ্যে রয়েছে রাজস্ব আদায়, ব্যাংকের ওপর অতিনির্ভরশীলতা, মূল্যস্ফীতি এবং ডলারের দাম বৃদ্ধি। মূল বক্তব্যে প্রস্তাবিত বাজটের ওপর তিনি ১০টি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোর বিষয়ে প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এক্সচেঞ্জ রেট এবং রফতানি বৃদ্ধির বিষয়ে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নেয়া হয়নি বলে মনে করছেন তিনি। আর্থিক কাঠামোর ক্ষেত্রে ১৬ শতাংশ রাজস্ব বাড়াতে বিপিসির লাভের ওপর নির্ভরতা করা হবে কিনা সে প্রশ্নও তোলেন তিনি। আর ঘাটতি সংস্থানে ৫০ শতাংশের বেশি ব্যাংকনির্ভরতা মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেবে বলে জানান তিনি। তার মতে, সরকারি ব্যয়ের ৪২ শতাংশ সরকারি সেবার পেছনে বরাদ্দ রাখলেও কৃষি বরাদ্দ কমেছে ১০ শতাংশ। এছাড়া কৃষিতে ৩৪ শতাংশ এবং খাদ্যে ভর্তুকির পরিমাণ কমেছে ১০ শতাংশ।
এডিপিতে পাঁচটি খাতেই ৭৪ শতাংশ বরাদ্দ দিলেও শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে তা কমেছে। যেখানে যোগাযোগ এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে মোট এডিপির ৪৫ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। শিক্ষায় জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৭৬ বরাদ্দ। স্বাস্থ্যে যা ১ শতাংশের চেয়ে কম। স্বাস্থ্যে সরকারি ব্যয়ে ১৮৬ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮৪তম। এদিকে রাজস্ব আদায়ে একটি নতুন দালাল শ্রেণী তৈরির চেষ্টা করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ এবং ঘুসের লেনদেন বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কার কথা জানান ড. ফাহমিদা।
এনজিও ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কর উঠয়ে নেয়ার প্রস্তাব করা হয়। বাজেটে মূল্যস্ফীতি কমাতে সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপের কথা বলা হয়নি। ড. ফাহমিদা বলেন, ‘সামাজিক সুরক্ষা থেকে পেনশন আলাদা করায় তা জিডিপির ২ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। বর্তমান অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও খাদ্যসহায়তায় বরাদ্দ কমেছে। আইএমএফের সংস্কার নিয়েও কিছু বলা হয়নি বাজেটে।’
অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনুসর বলেন, জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আহরণ এখনো সিঙ্গেল ডিজিটে থাকা গ্রহণযোগ্য নয়। তবুও প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে কম বরাদ্দ দিলেও ঘাটতি সংস্থান করা খুবই চ্যালেঞ্জিং হবে মনে করছেন তিনি। ব্যাংক ডিপোজিট কমতে থাকায় দেড় লাখ কোটি টাকা সংস্থান করার সামর্থ্য ব্যংকগুলোর নেই বলে মনে করছেন ব্র্যাক ব্যাংকের এ চেয়ারম্যান। ব্যাংক খাতের অপব্যবহার করায় এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে বলে মত দেন তিনি।
ব্যাংক এবং শেয়ার মার্কেটে টাকা না পেয়ে সরকারের শেষ ভরসা হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তখন রাশিয়া-সোমালিয়ার মতো টাকা ছাপাতে হবে। এ বছর ৬০ হাজার কোটি টাকার মতো ছাপাতে হয়েছে। এটা আগে হয়নি মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এতে মূল্যস্ফীতি আবার বেড়ে যাবে।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএনপি নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘গত ৩০ বছরে যে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছিল তা এখন নষ্ট করা হয়েছে। সামষ্টিক কাটামো ভেঙে ফেলা হয়েছে। আগে এলসি খুলতে কখনো সমস্যা হয়নি। ডলারের দাম কৃত্রিমভাবে ধরে রাখায় মূল্যস্ফীতি আমদানি করা হয়েছে। আবার বাংলাদেশ ব্যাংক ৭০-৭৫ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে যাচ্ছে, যা মূল্যস্ফীতি বাড়াচ্ছে।’ প্রকৃত রিজার্ভ ২১ বিলিয়ন ডলারের বেশি হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রিজার্ভের অর্থ উন্নয়ন ফান্ডে দেয়ায় তা পাচার হয়ে গেছে।’
পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান অনির্বাচিত সরকার বলায় প্রতিবাদ জানিয়ে এ বিষয়ে সিপিডির অবস্থান জানতে চান। সুশাসনের কোনো ঘাটতি থাকলে তিনি বিএনপিকে আদালতে বা জনতার আদালতে যেতে বলেন। গ্যালারিতে বসে খেলতে পারবেন না মন্তব্য করে রাস্তায় নামার আহ্বান জানান। মন্ত্রী বলেন, ‘হরতাল ডাকলেও এখন কেউ আসবে না। কারণ মানুষ বুঝে গেছে, তারা সুশাসন ও উন্নতির দিকে আছে।’
মূল্যস্ফীতি বাজেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘এটা বেশ কিছুদিন আগে থেকেই হয়ে আসছিল। এটা নিয়ন্ত্রণে আমরা চেষ্টা করছি। মধ্যবিত্ত হয়তো আমাদের চেষ্টা টের পাচ্ছে না। কারণ আমাদের লক্ষ্য নিম্নবিত্তদের নিয়ে। তাদের জন্য কম দামে চাল-ডাল বিক্রি করছি।’