মাছ চাষে উন্নতির জন্য গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে মাছের উৎপাদন ক্রমাগত বেড়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো জলাশয়ের সংখ্যা কমেছে, জলদূষণ বেড়েছে, বসতবাড়ি নির্মাণের কারণে আবাদি জমি কমেছে। বর্তমানে মৎস্য উৎপাদন ৪৫ লাখ টনেরও বেশি। সরকারের পরিকল্পনা এটি দ্বিগুণ করা। ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বে এখনকার উৎপাদনের চেয়ে দ্বিগুণ পরিমাণ মাছের চাহিদা তৈরি হবে। আর এ মাছের জোগান দিতে হবে

অধ্যাপক ড. এ এম সাহাবউদ্দিন শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যাকোয়াকালচার অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের ডিন। দেশের মৎস্য চাষের অগ্রযাত্রা, প্রযুক্তির ব্যবহার, অ্যাকোয়াকালচার সিস্টেম, উন্নত জাতের উদ্ভাবন, সরকারি-বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ, মাছ রফতানি ও অন্যান্য প্রসঙ্গে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আবিদ মঈন খান

বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর মৎস্য চাষের অগ্রযাত্রা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ কী রকম দেখছেন?

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে মাছের উৎপাদন ক্রমাগত বেড়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো জলাশয়ের সংখ্যা কমেছে, জলদূষণ বেড়েছে, বসতবাড়ি নির্মাণের কারণে আবাদি জমি কমেছে। বর্তমানে মৎস্য উৎপাদন ৪৫ লাখ টনেরও বেশি। সরকারের পরিকল্পনা এটি দ্বিগুণ করা। ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বে এখনকার উৎপাদনের চেয়ে দ্বিগুণ পরিমাণ মাছের চাহিদা তৈরি হবে। আর এ মাছের জোগান দিতে হবে চাষ থেকে। কারণ আহরণের মাছের পরিমাণ শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বেই কমছে। ভবিষ্যতে মাছ চাষে চীন ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। মাছের উৎপাদন দ্বিগুণ করতে পারলে আমরা যেখানে বিশ্বে বর্তমানে পঞ্চম অবস্থানে আছি, সেখান থেকে এগিয়ে যাব। দেশের মাটি, পানি ও জলবায়ু মাছ চাষের উপযুক্ত। গ্রামবাংলায় আসলে মাছ চাষের জন্য পুকুর কাটা হয় না। নানা প্রয়োজনে মাটি কাটার পর খানাখন্দ হলে সেগুলো পুকুর হিসেবে ব্যবহার হতো। এখন আধুনিক পদ্ধতি আসায় মাছ চাষ একটি বাণিজ্যিক রূপ পেয়েছে, চাষীরা শুধু নিজের ঘরের প্রয়োজন মেটানোর জন্য মাছ চাষ করেন না। কারণ মাছের চাহিদা বেড়েছে, মানুষ প্রযুক্তি সম্পর্কে জানছে, অল্প জায়গায় কীভাবে উৎপাদন বাড়ানো যায় তা শিখছে। প্রথম দিকে নদী-নালা-বিল থেকে মাছ ধরা হতো, পরে বিভিন্ন জাতের মাছ একসঙ্গে করে মিশ্রচাষ করা হতো এবং সেখান থেকে যখন দেখা গেল মিশ্র চাষে অল্প পরিমাণে মাছ হয়, তখন একক চাষ করা হয়েছে বা অধিক ঘনত্বে নির্দিষ্ট একটি জাতের মাছের চাষাবাদ করা হয়। সেখান থেকে পরবর্তী ধাপে এসেছে নিবিড় ও অতিনিবিড় চাষ, অর্থাৎ প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে মাছের উৎপাদন বাড়ছে। প্রতি ইউনিট বা নির্দিষ্ট জায়গা থেকে আগে যে পরিমাণ মাছ উৎপাদন হতো তার থেকে অনেকাংশে মাছ উৎপাদন বেড়েছে। যার কারণে আমাদের জমি কমে গেলেও স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে মোট উৎপাদন বেড়েছে, এটিই বড় অর্জন। আর মাছ চাষে উৎপাদন বাড়ানো সরকারের একটি লক্ষ্য এবং মাছের চাষ এভাবে বৃদ্ধি পাওয়া অব্যাহত রাখার ফলে যারা এ মাছ চাষে জড়িত ও নতুন করে জড়িত হচ্ছেন, তাদের সবাই এখন বাণিজ্যিক চিন্তা থেকে মাছ চাষ করছেন। আমাদের দেশটা যেহেতু কৃষিপ্রধান দেশ, তাই এটাই স্বাভাবিক। তবে আধুনিকায়ন বা যন্ত্রের ব্যবহার, মাছ চাষের প্রযুক্তিগুলোর ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে দুর্বলতা রয়েছে। আর মাছচাষীদের মূল সমস্যা বাজারমূল্য। উৎপাদিত মাছগুলোর খুব কম সংখ্যক বৈদেশিক বাজারে যায়। দেশের বাজারে জোগান বাড়লে মাছের দাম কমে। ফলে মাছচাষীরা খাদ্য ও পরিচর্যা খরচ ইত্যাদি মিলিয়ে বাজারমূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারছেন না। তাই প্রযুক্তিনির্ভর চাষ পদ্ধতিতে বিনিয়োগ ব্যয়ের সমানুপাতে আয় হচ্ছে না। আজকের যুগে প্রযুক্তির অগ্রগতির কল্যাণে সবাই ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। অনেকেই অনলাইন থেকে মাছ চাষের পদ্ধতি দেখে কিন্তু সেগুলো যাচাই-বাছাই করে গ্রহণ করা উচিত। এভাবে উদ্যোক্তা হয়ে যাওয়াটা আসলে ভুল এবং ভুল করে অনেকে মাছ চাষে আশাহত হয়ে পড়েন। আসলে ইন্টারনেটে যে পরিমাণে লাভের আশা দেখানো হয় সেটার বাস্তবতা কতটুকু তা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপ করলে জানা যাবে। তাই নতুন উদোক্তাদের প্রতি পরামর্শ যেন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করেই মাছ চাষের উদ্যোগ নেয়া হয়।

মাছ চাষে যারা জড়িত এবং নতুন উদ্যোক্তা যারা রয়েছেন, মাছ চাষের উন্নয়নে প্রযুক্তি ব্যবহারে তারা কী ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছেন? 

প্রযুক্তি সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকায় প্রযুক্তির সঙ্গে অনেক মাছচাষী খাপ খাইয়ে নিতে পারছেন না। চাষীদের প্রায়োগিক জ্ঞানের কমতি আছে। এজন্য বিনিয়োগের আগে প্রযুক্তি সম্পর্কে শিক্ষা এবং কারিগরি দক্ষতা অর্জন প্রয়োজন। জ্ঞাতব্য, নতুন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়টি চলে আসে। যন্ত্রের ব্যবহার যেখানে আছে সেখানে বিদ্যুতের ব্যবহার আছে কিন্তু বিদ্যুৎ ব্যবহার করে আমি কতটুকু উৎপাদন করব এবং সেই উৎপাদিত মাছের বাজারমূল্য কত হবে তার হিসাব রাখতে হবে। এখন যদি আমি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করি, তাহলে আমি মাছ উৎপাদন বেশি করতে পারব। কিন্তু লাভের পরিমাণ এখানে কম থাকবে। যখন আমার উৎপাদন বেশি হবে তখন আমাকে অল্প লাভে বেশি পরিমাণে বিক্রি করতে হবে। আমাদের অধিকাংশ মানুষ এই জায়গাতেই ভুল করে থাকেন। তারা বলে থাকেন—প্রযুক্তি ব্যবহার করে লাভ তো বেশি হয় না, সাধারণ পদ্ধতির চেয়ে বেশি লাভ হবে না। কিন্তু যখন আপনার উৎপাদন অনেক বেশি বেড়ে যাবে, তখন আপনি সেখান থেকে লাভ করবেন। আর মনে রাখা দরকার, আধুনিক প্রযুক্তিগত মাছ চাষে স্থায়ী বিনিয়োগটা বেশি প্রয়োজন হয়ে থাকে। স্থায়ী বিনিয়োগ যেহেতু বেশি, তাই যেকোনো প্রকল্প শুরুর আগে কত বছরের প্রকল্পটি করা হচ্ছে তা আগেই ভেবে নিতে হবে, তাহলে আর মানুষ আশাহত হবে না। তাই ঝুঁকির মাত্রা জেনে প্রকল্প বিনিয়োগে যেতে হবে।

আমাদের দেশে তো রিসার্কুলেটি অ্যাকোয়াকালচার সিস্টেম (আরএএস), বায়োফ্লক, ইন পন্ড রেসওয়ে সিস্টেম আইপিআরএসসহ বিভিন্ন ধরনের অ্যাকোয়াকালচার সিস্টেম আছে এগুলোর মধ্যে আমাদের দেশের মাছ চাষের জন্য কোনটা বেশি উপযোগী?

সব প্রযুক্তি আমাদের মাছ চাষের জন্য আমরা দেশে ব্যবহার করতে পারি, কিন্তু স্থান, কাল, অবস্থা, ব্যক্তি, উদ্যোক্তাভেদে তা ভিন্ন ভিন্নভাবে তৈরি হবে। যদি আমরা রিসার্কুলেটি অ্যাকোয়াকালচার সিস্টেম অর্থাৎ আরএএসের কথা বলি, তাহলে এ পদ্ধতি সবার জন্য নয়। যদি আমরা বায়োফ্লক পদ্ধতির কথা বলি, তাহলে সেটা কিন্তু যেমন ক্ষুদ্র পরিসরের চাষীদের জন্য উপযোগী তেমনি বড় পরিসরের চাষীদের জন্য উপযোগী। ইন পন্ড রেসওয়ে সিস্টেম বা যাকে আমরা আইপিআরএস বলে থাকি, সেক্ষেত্রে কিন্তু পদ্ধতিটি সবার জন্য নয় কারণ এখানে বিনিয়োগের মাত্রাটা বেশি হয়ে থাকে। তার মানে, যিনি বিনিয়োগ বেশি করতে পারবেন তার বিজনেস প্রোফাইল অর্থাৎ তিনি কতদিনে এখান থেকে লাভ উঠাবেন তার হিসাব রাখতে হবে। এখানে উল্লিখিত প্রতিটি প্রযুক্তি ব্যবস্থা নতুন নয়—এ পদ্ধতিগুলো বহির্বিশ্বে ব্যবহার করা হচ্ছে। এখন শুধু আমরা কীভাবে আমাদের দেশের আঙ্গিকে এগুলো তৈরি করব সেটাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের দেশে রিসার্কুলেটি অ্যাকোয়াকালচার সিস্টেম অর্থাৎ আরএএস তৈরির ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত অধিকাংশ যারা উদ্যোক্তা আছেন তারা বাইরে থেকে সরঞ্জামগুলো আমদানি করে আনেন এবং সরঞ্জামগুলো বাইরের লোকদের দিয়ে সেটআপ করেন। যেকোনো পদ্ধতি তৈরির জন্য বাইরে থেকে কোনো সরঞ্জামাদি আনতে গেলে তার সঙ্গে ডিউটি ট্যাক্স সংযুক্ত হবে। এছাড়া জাহাজের আনয়ন খরচ যোগ হবে। পাশাপাশি এমনটি করার ফলে দেশের অর্থ অন্য দেশে চলে যাচ্ছে। আরো একটি বড় সমস্যা, এমনভাবে কাজ করলে দেশীয় উদ্যোক্তা তৈরি হয় না যারা কিনা এমন আধুনিক চাষের পদ্ধতির মেশিন যন্ত্রপাতি তৈরি করবে। আমরা চাই, দেশে এসব মেশিন তৈরি হোক যার জন্য আমরা কম খরচে আরএএস পদ্ধতি নির্মাণ করেছি। এগুলো যেহেতু সম্পূর্ণ আমাদের দেশে তৈরি, তাই এ পদ্ধতিতে গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যয় অনেকটাই কমে গেছে। আর যারা প্রথম দিকে বায়োফ্লক করেছেন, তাদের সব ধরনের সরঞ্জামাদি আমদানিনির্ভর ছিল। যে কারণে অত্যধিক খরচের বোঝা তাদের কাঁধে নিতে হতো। এখন সে জায়গায় খরচ অনেকটা কমে এসেছে। যেমন আগে যে ট্যাংক বানাতে ১০ হাজার টাকার মতো খরচ পড়ত এখন তা মাত্র চার-পাঁচ হাজারে তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। তাই বলা যায়, আগের চেয়ে খরচ ও পদ্ধতিগুলো আরো আধুনিকায়ন হওয়ার ফলে বিভিন্ন আঙ্গিকে দেশীয় উদ্যোক্তা এ পদ্ধতিগুলোর খরচ কমিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। প্রযুক্তির বিকাশ যদি না ঘটত, তাহলে এটি সম্ভব হতো না। আরো একটি বিষয় হচ্ছে, যেহেতু আরএএস ও বায়োফ্লকের মতো এ ধরনের পদ্ধতিতে স্বল্প জায়গায় অধিক মাছ চাষ করা যাচ্ছে, যাতে কোনো প্রকার অ্যান্টিবায়োটিক ও কেমিক্যাল থাকে না। এমনকি স্বাদে ও মানেও ভালো হয়ে থাকে। এজন্য এগুলো স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রফতানির জন্য উপযোগী হয়ে থাকে। আর ভবিষ্যতে বিশ্বের নিজের ও অন্যদের মাছ খাওয়ায় এবং বায়ো-সিকিউরিটি, বায়ো কন্টামিনেশন ফ্রি মাছ পেতে হলে আমাদের আধুনিক পদ্ধতিতে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। তবে আধুনিক বিদ্যমান প্রযুক্তির সম্যক ধারণা নিয়ে মাছ চাষে আসতে হবে, না হলে সফলতা দুষ্প্রাপ্য। মূলত কোনো প্রযুক্তি পদ্ধতি আপনাআপনি ব্যর্থ হয় না, কোনো প্রযুক্তি পদ্ধতিকে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অনুপযুক্ত বলা যাবে না। আমাদের এসব পদ্ধতি বোঝার ক্ষেত্রে কিছু ভুল থেকে যাচ্ছে এটাই আমাদের মূল সমস্যা। আমরা অতিলাভের আশায় পুরোপুরি ধারণা না নিয়ে কাজ করতে যাওয়ার জন্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে আশাহত হচ্ছি। তবে আমি আশাবাদী বায়োফ্লক ও আরএএস উভয় পদ্ধতিগুলো স্বল্প সময়ের মধ্যে অল্প খরচের মাধ্যমে দেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারব। আর যাদের বড় জলাশয় আছে আর বড় আকারে বিনিয়োগ করতে সক্ষম তাদের জন্য আমরা পরামর্শ দেব আইপিআরএস পদ্ধতিতে যাওয়ার। মূলত যাদের জায়গার স্বল্পতা, পুঁজি কম তাদের জন্য উপযোগী হচ্ছে বায়োফ্লক ও আরএএস পদ্ধতি। এখন কেউ হয়তো চাইল, ঈল বা কুঁচিয়া মাছের কালচার করবেন। তার জন্য যেমন পদ্ধতি ভিন্ন হবে, তেমনি নতুন জাতের যে মাছগুলো আসছে সেগুলোর কালচারের জন্য পদ্ধতি কিন্তু ভিন্ন হবে। আমাদের দেশের মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বিভিন্ন হ্যাচারির প্রচেষ্টায় এখন কিন্তু অনেক বিলুপ্ত মাছের জাতকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। যখন উচ্চমূল্যের মাছের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি পাবে, তখন সেটা এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে চাষের আওতায় আনা সম্ভব হবে। আসলে কম মূল্যের মাছ চাষ করে উদ্যোক্তা বেশি লাভবান হতে পারেন না। আর যারা কম খরচের বায়োফ্লক করার মাধ্যমে শিখতে চান, তাদের প্রতি আমার পরামর্শ থাকবে—তারা যেন তেলাপিয়া দিয়ে শুরু করেন। প্রথমেই শিং, মাগুর, গুলসা টেংরা এসব দিয়ে যেন শুরু না করেন। এগুলো যেহেতু উচ্চমূল্যের মাছ, এদের জন্য পরিচর্যা একটু ভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। প্রথমে করতে গিয়ে ঠিকমতো বুঝতে ব্যর্থ হলে লোকসানের আশঙ্কা থেকে যায়। আর সে হিসেবে তেলাপিয়া মাছ কিন্তু শক্ত প্রজাতির মাছ, তাই এ মাছে নতুন উদ্যোক্তারা কিছুটা সময় পাবেন, কোনো উনিশ-বিশ হলে এতে সংশোধনের সুযোগ থাকবে। তেলাপিয়া মাছ সহজে সমূলে ধ্বংস হয়ে যায় না। আর এ মাছ কিন্তু সারা বিশ্বে জনপ্রিয় ও চাহিদাসম্পন্ন মাছ এবং এর রফতানি সম্ভাবনাও আছে। তাই ছোট উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে প্রথম দিকে চার থেকে ছয় মাস পর্যন্ত অন্তত প্রথম ক্রপ হিসেবে তেলাপিয়া চাষ করা উচিত। পরবর্তী সময়ে তারা অন্য মাছ চাষে যেতে পারেন। যেমন কৈ, মাগুর, পাবদাসহ অন্যান্য মাছ।

আমাদের দেশে মাছের উন্নত জাত উদ্ভাবনী গবেষণার অবস্থা কেমন?

মাছ চাষে উন্নতির জন্য গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু চাষ করে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, সঙ্গে নতুন কী কী জাত এল সেটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আগে কিন্তু শুধু রুই, কাতলা, মৃগেল, সরপুঁটি, কার্প এ ধরনের মিশ্র জাতের মাছ চাষ করা হতো। এখন শিং, মাগুর, পাবদা, গুলসা ইত্যাদির বাণিজ্যিক চাষ হচ্ছে। মেনি, পুঁটি, মহাশোলসহ অন্যান্য বিলুপ্তপ্রায় মাছ চাষ না করলে বা প্রযুক্তির উদ্ভাবন না করলে পোনা পাওয়া যেত না। বিলুপ্তপ্রায় মাছগুলোর পোনা পাওয়া না গেলে তো চাষ করা সম্ভব হতো না। এর মানে গবেষণাকাজ সফল হচ্ছে। আর জাত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে রুই মাছের ক্ষেত্রে আমাদের মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট সুবর্ণ রুই উদ্ভাবন করেছে, যার বৃদ্ধির হার অনেক বেশি। আমাদের ওয়ার্ল্ড ফিশ নামে একটি সংস্থা রয়েছে, তারা জেনারেশন-থ্রি নামে একটি রুইয়ের জাত উদ্ভাবন করেছে, যার উৎপাদন সাধারণ রুই মাছের তুলনায় ৩৭ শতাংশ বেশি। কিন্তু আমাদের মূল দুর্বলতা এখনো কিছু কিছু জায়গায় রয়ে গেছে, সে খাতগুলোয় নজর দেয়া ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হাতে নেয়া খুব জরুরি। সেটা হচ্ছে আমাদের সমুদ্র অর্থনীতির দিকে নজর দেয়া। কারণ আমরা এখন পর্যন্ত সমুদ্রের একটি মাছের পোনাও ব্রিডিং, চাষ বা মাছের খাদ্য তৈরিতে সক্ষম হইনি। সমুদ্রের কোরাল, গ্রুপার, স্নেপার যে মাছ সহজে চাষ করা যায় সেগুলোকে চাষের দিকে নিয়ে আসতে হবে। তাহলে সুনীল অর্থনীতির অংশ হিসেবে সামুদ্রিক মাছ চাষ স্বাদু পানির মাছ চাষের সঙ্গে একতালে এগিয়ে যাবে। তবে স্বাদু পানিতে মাছ চাষের ক্ষেত্রে গবেষণা ও উৎপাদন অনেক বেড়েছে এবং ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও নদীতে যে মাছের ব্যবস্থাপনা করা হয় সেখানেও আমাদের অনেক সুনাম রয়েছে। কিন্তু এখন আমাদের সমুদ্র অঞ্চলের অর্ধ লবণাক্ত মাছগুলোর দিকে নজর দিতে হবে, তাহলে ওই অঞ্চল যখন দাঁড়িয়ে যাবে, আমাদের দেশও মাছ চাষে সামনে এগিয়ে যাবে। আর আমাদের রফতানি করা যায় এমন মাছগুলোর দিকে বেশি নজর দিতে হবে।

বাংলাদেশের মৎস্য খাতে সরকারি-বেসরকারি অংশগ্রহণ যথেষ্ট বলে মনে করেন?

বেসরকারি অংশগ্রহণ মৎস্য খাতে ভালোভাবে আছে। এছাড়া প্রক্রিয়াকরণ ও মাছের খাদ্য তৈরির কারখানাগুলো কিন্তু বেসরকারিভাবে হচ্ছে। মূলত এ কারণে দেশে মাছের উৎপাদন ৪৫ লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে। কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নতুন প্রযুক্তি তৈরি বা গবেষণা করলে সরকার তা মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেয়। এছাড়া বেসরকারি উদ্যোক্তারা চাষের মাছের খাদ্যের মান ঠিক রাখছে কিনা সেটা সরকার মনিটরিং করবে, উৎপাদিত মাছ মানুষের জন্য খাদ্য হিসেবে নিরাপদ কিনা তা নিশ্চিত করবে সরকার, বিদেশে রফতানির আগে মাছের চাহিদাপত্র মানসম্মত হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করবে সরকারি সংস্থাগুলো। অনেকেই অভিযোগ করে, মাছ চাষে অ্যান্টিবায়োটিক বা হরমোন ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এগুলো জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কিনা বা যে ওষুধ দেয়া হচ্ছে সেগুলো অনুমোদনসাপেক্ষে আসছে কিনা তা যেন সরকারি সংস্থার মাধ্যমে নজরদারি করা হয়। সরকারি সংস্থাগুলো দায়িত্ব পালন করলে মৎস্য উৎপাদন নিরাপদ হবে।

মৎস্য খাতে রফতানির সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জগুলো কীভাবে দেখছেন?

রফতানির ক্ষেত্রে মূল চ্যালেঞ্জ নানা নিষেধাজ্ঞা। কারণ মাছ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণের সঠিক পন্থা অবলম্বন করা হচ্ছে না। মাছের মধ্যে বাইরে থেকে অনুপ্রবিষ্ট কিছু পাওয়া গেলে তা ভেজাল হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং তখন নিষেধাজ্ঞা আসে। সমাধান একটাই, সেটা হলো নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করে মাছ চাষ করতে হবে। নিরাপদ পরিবেশের মান নিশ্চিত হলে বিদেশী বাজার ধরা সম্ভব। রফতানি বাজারে চিংড়ি, কুঁচিয়া, কাঁকড়া এসব বিদেশী বাজারে যাচ্ছে আর এগুলোর ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা আসে যখন যথাযথ মান রক্ষা হয় না। আমরা যদি তেলাপিয়া ফিলেট বা পাঙাশ ফিলেট সারা বিশ্বে পাঠাতে চাই, বিশ্বের গ্রহণযোগ্য মান অর্জন করতে হবে। আর তাই বায়ো সিকিউরিটি ও গুড অ্যাকোয়াকালচার দরকার। ফার্মগুলোকে তাই রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনা উচিত। তাহলে অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। এছাড়া মাছ চাষের পদ্ধতি ও প্রযুক্তি আমাদের শিক্ষার্থীরাই কিন্তু কীভাবে ঘরে বসে পুরো ফার্মটা মনিটর করবেন তার ব্যবস্থা তৈরি করে ফেলেছে।

আমিষের অভাব নিরসনে আমাদের দেশের মৎস্য খাত কি যথেষ্ট বলে মনে করেন?

প্রতিদিন একজন মানুষের জন্য ৬৩ গ্রাম মাছের লক্ষ্য রাখা হয়েছিল, তা এখন ৬৫ গ্রামে উন্নীত হয়েছে। এখন নতুন করে ৭০ গ্রামের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছি। মাথাপিছু ৭০ গ্রাম মাছের প্রয়োজন মেটাতে উৎপাদন বাড়াতে হবে।

আরও