বাংলাদেশের অতীত নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক ও প্রশংসা দুটোই আছে

কমিশনের ছাপানো উন্মুক্ত বহুল প্রচারিত কর্মপরিকল্পনা রয়েছে। ছাপানো সেই বই নিয়ে দেখতে পারেন। সেখানে অনূর্ধ্ব ১৫০ আসনে, প্রাপ্যতা সাপেক্ষে, ইভিএমের মাধ্যমে ভোট গ্রহণের সিদ্ধান্ত ব্যক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, উদ্ভূত বৈশ্বিক পরিস্থিতি, আর্থিক সংকট ইত্যাদি কারণে আবশ্যক সংখ্যক ইভিএম সংগ্রহ

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) হিসেবে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন সাবেক আমলা কাজী হাবিবুল আউয়াল। তার নেতৃত্বে গঠিত কমিশন এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি সংসদীয় আসনে উপনির্বাচন, সিটি করপোরেশনসহ সাত শতাধিক স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আয়োজন করেছে। সফলতার পাশাপাশি হয়েছেন সমালোচিতও। সমসাময়িক এসব বিষয়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন, নির্বাচন কমিশনের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে গতকাল বণিক বার্তার বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন সিইসি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তোফাজ্জল হোসেন

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করার লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাই।

কমিশনের ছাপানো উন্মুক্ত বহুল প্রচারিত কর্মপরিকল্পনা রয়েছে। ছাপানো সেই বই নিয়ে দেখতে পারেন। সেখানে অনূর্ধ্ব ১৫০ আসনে, প্রাপ্যতা সাপেক্ষে, ইভিএমের মাধ্যমে ভোট গ্রহণের সিদ্ধান্ত ব্যক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, উদ্ভূত বৈশ্বিক পরিস্থিতি, আর্থিক সংকট ইত্যাদি কারণে আবশ্যক সংখ্যক ইভিএম সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। পরিবর্তিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনেই ব্যালটে ভোট গ্রহণ করা হবে।

আগের দুই নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট পরিচালনা করতে পারেনি বলে সমালোচনা রয়েছে। ইসি নির্বাচন পরিচালনায় ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করতে পারে না বলে বিরোধী রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে নানা মহলে প্রায়ই আলোচনা-সমালোচনা হয়। আগামী নির্বাচনে এসব সমালোচনা কাটিয়ে উঠতে কমিশনের পক্ষ থেকে কী কী পদক্ষেপ নেবেন?

আগের দুটি নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে মন্তব্য করব না। নির্বাচন দেশে নতুন হচ্ছে না। অতীতে অনেক নির্বাচন হয়েছে। বিতর্ক হয়েছে। প্রশংসা হয়েছে। সমালোচনা হয়েছে। সফলতা-বিফলতার বিষয়টি আপেক্ষিক। নির্বাচন কমিশন তার যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাবে। গত ১২-১৪ মাসে সংসদের কয়েকটি উপনির্বাচনসহ স্থানীয় সরকারের সাত শতাধিক নির্বাচন বর্তমান কমিশন করেছে। বিতর্ক-সমালোচনা তেমন একটা হয়নি। নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের, বিশেষত প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন। প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর ভূমিকা আন্তরিক, নিরপেক্ষ, দক্ষ ও পেশাদারত্বপূর্ণ ছিল। আমাদের বিশ্বাস, এর ধারাবাহিকতা আগামী সংসদ নির্বাচনেও অব্যাহত থাকবে। তবে নির্বাচনে প্রধানতম দলগুলোর অংশগ্রহণ ও কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রয়োজন। নির্বাচনের কাঙ্ক্ষিত সফলতার জন্য সার্বিক অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন হবে।

আরপিও সংশোধনে একটি আইন জাতীয় সংসদে প্রস্তাব করা হয়েছে। ওই সংশোধনী পাস হলে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা সীমিত হতে পারে বলে বলা হচ্ছে। এ বিষয়ে কমিশন কী ভাবছে?

প্রকৃত তথ্য সঠিকভাবে উপস্থাপন না হওয়ার কারণে এমন ভ্রান্ত অনুমান হতে পারে। কমিশনের যে ক্ষমতা বিদ্যমান আরপিওতে রয়েছে, সেখানে পরিবর্তনের কোনো প্রস্তাব কমিশন করেনি। কেবিনেটও তা করেনি। নির্বাচনের সরকারি ফলাফল রিটার্নিং কর্মকর্তা কর্তৃক ঘোষিত হওয়ার পর প্রচলিত বিধানমতে কমিশন ফলাফল সরাসরি গেজেট করে। প্রস্তাব করা হয়েছিল, কমিশন বিশেষ ক্ষেত্রে আবশ্যক মনে করলে কোনো একটি সংসদীয় এলাকার যেকোনো কেন্দ্রের বা পুরো সংসদীয় এলাকার নির্বাচনের ফলাফল গেজেট স্থগিত রেখে তদন্ত করে গুরুতর অনিয়মের কারণে নির্বাচন ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে মনে করলে কোনো একটি কেন্দ্রে বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পুরো সংসদীয় এলাকায় পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ দিতে পারবে। গুরুতর অনিয়ম না পেলে ফলাফল যথারীতি প্রকাশ করা হবে। সরকার এ প্রস্তাবের আংশিক গ্রহণ করে বলেছে, পুরো সংসদীয় এলাকার নয়, কেবল যে কেন্দ্র বা কেন্দ্রগুলোর ফলাফল গুরুতরভাবে প্রভাবিত হয়েছে বলে কমিশন মনে করবে কেবল সেই কেন্দ্র বা কেন্দ্রগুলোর ফলাফল বাতিল করে পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ দিতে পারবে। কমিশনের নতুন অতিরিক্ত এ প্রস্তাবের আংশিক গ্রহণ করা হয়েছে। এতে কমিশনের বিদ্যমান ক্ষমতা সীমিত হওয়ার কোনো অবকাশই ঘটেনি। বরং কমিশনের ক্ষমতা বিদ্যমান অবস্থা থেকে নতুন করে খানিকটা বাড়বে বা বিস্তৃত হবে। তবে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সংসদ কর্তৃক চূড়ান্ত হবে।

একযোগে ৩০০ আসনে নির্বাচন না দিয়ে পর্যায়ক্রমে দেয়ার বিষয়ে বলছে বিভিন্ন মহল। এমনটা করা যায় কি?

আগামী নির্বাচনের জন্য না হলেও ভবিষ্যতের জন্য এটি ভাবা প্রয়োজন। এটি সম্ভব। ভারতে নির্বাচন পর্যায়ক্রমে হচ্ছে। নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় এটি বিভিন্নভাবে সহায়ক হতে পারে।

সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকায় সরকারি কর্মকর্তা যারা রিটার্নিং কর্মকর্তা থাকছেন তাদের ওপরই ইসিকে নির্ভর করতে হবে। এতে স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে কি?

স্বচ্ছতার বিষয়টিও আপেক্ষিক। স্বচ্ছতা বর্ধিত করার জন্য বিভিন্ন বিকল্প মাধ্যমের যতদূর সম্ভব অন্বেষণ করা যেতে পারে। যেমন মিডিয়ার মাধ্যমে ভোট কার্যক্রমের দৃশ্যমানতা বাড়ানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।

মার্কিন নির্বাচনের মতো আমাদের এখানে ইলেক্টোরাল কলেজ পদ্ধতি প্রয়োগ করা কি সম্ভব অথবা তুরস্কের নির্বাচনের আদলে কোনো পদ্ধতি?

ইলেক্টোরাল কলেজ পদ্ধতি কিংবা তুরস্কের নির্বাচনের আদল একটি মৌলিক রাজনৈতিক বিষয়। আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি নিয়েও চিন্তাভাবনা হতে পারে। দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এসব মৌলিক রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে ভাবতে পারেন। এসব বিষয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হবে। এ মুহূর্তে এসব বিষয়ে আমার নিজস্ব কোনো মতামত নেই।

আরও