ভাবনা

স্বপ্ন থেকে বাস্তবতার নাগালে ডিজিটাল ব্যাংক

একটা স্বপ্ন নিয়ে ঘুরছি অনেক দিন থেকে, ‘‌চাহিবা মাত্রই’ যেন আমরা মানুষকে পরিপূর্ণ ব্যাংকিং সেবা দিতে পারি।

তানভীর এ মিশুক  

প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নগদ

একটা স্বপ্ন নিয়ে ঘুরছি অনেক দিন থেকে, ‘‌চাহিবা মাত্রই’ যেন আমরা মানুষকে পরিপূর্ণ ব্যাংকিং সেবা দিতে পারি। কয়েক বছর ধরে নানাভাবে চেষ্টা করেছি স্বপ্নটাকে যতটা সম্ভব অন্যদের মধ্যে বুনে দিতে। ভালো লাগার যে স্বপ্ন বোনা, সে বীজটা এখন ফুলে ফলে শোভিত হওয়ার খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। 

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল তার বাজেট বক্তৃতায় দেশে প্রথমবারের মতো ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিলেন। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকও একটা নীতিমালা তৈরি করে ফেলেছে বলে জেনেছি। ফলে প্রত্যাশার সলতেটা জ্বলজ্বল করছে। 

অনেক দিন থেকে নানা রকম ডিজিটাল সেবা নিয়ে কাজ করছি। কাজ করতে করতে একটা পর্যায়ে বুঝেছি, যতই ডিজিটাল ডিজিটাল করি না কেন সত্যিকার অর্থে কাজের সুফল আসবে না, যদি আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে সার্বজনীন রূপ দিতে না পারি। কারণ সত্যিকার অর্থে ডিজিটাল সেবার সুফল ঘরে তুলতে হলে সবার আগে আর্থিক সেবাকে ডিজিটাল প্লাটফর্মে তুলে আনতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে সবার অংশগ্রহণ। সে লক্ষ্য নিয়েই চার বছর আগে মোবাইল আর্থিক সেবায় অভিনব কিছু উদ্ভাবন গ্রাহকদের সামনে হাজির করেছিলাম। ডাক বিভাগের সঙ্গে মিলে চালু করেছিলাম ‘নগদ’। আমাদের সেবার বিস্তারের মাধ্যমে সত্যিকার অর্থে গ্রাহকরা কতটা উপকৃত হয়েছেন, বাজারে প্রতিযোগিতা কতটা নিশ্চিত হয়েছে অথবা আমরা ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে কতটা সফল বা ব্যর্থ হয়েছি, সেটা গ্রাহকরা বিবেচনা করবেন। 

তবে একটা এমএফএস নিয়ে সামনে এগোতে গিয়ে আমার যে ক্ষতিটা হয়েছে, সেটা হলো অল্প দিনেই আমার মাথায় ঢুকে গিয়েছিল ডিজিটাল ব্যাংক। শুরুতেই আসলে আমি বুঝে গিয়েছিলাম যে সাধারণ মানুষের জন্য সত্যিকার অর্থে কিছু করতে গেলে মোবাইল আর্থিক সেবা দিয়ে পুরো লক্ষ্য পূরণ হবে না। বরং সেবার কলেবর বিস্তৃত করতে হবে। কারণ মোবাইল আর্থিক সেবা যেটি সাধারণদের মাঝে মোবাইল ব্যাংকিং নামে পরিচিত, সেটি তো আসলে ব্যাংকিংয়ের সব সেবা দিতে পারে না। সেটা পারে কেবল ব্যাংক। আবার ব্যাংকেরও এত সীমাবদ্ধতা, যেটি হোক প্রযুক্তিগত বা অন্য কিছু, তারাও তাৎক্ষণিকভাবে ‘টুয়েন্টি ফোর সেভেন’ সেবা দিতে পারে না। 

এখানেই ডিজিটাল ব্যাংকের সম্ভাবনার উন্মুক্ত প্রান্তর। প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দক্ষতা, সেবার বিস্তৃতির ক্ষেত্রে প্রচলিত ব্যাংকের কলেবর আর সঙ্গে তাৎক্ষণিকতার মিশেল হবে ডিজিটাল ব্যাংক। থাকবে না ব্যাংকের শাখা, তবে ব্যাংক থাকবে হাতে হাতে। এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে গ্রাহকের ক্রেডিটের স্কোরিং করা হবে। ব্যবহার করা হবে মেশিন লার্নিংয়ের মতো প্রযুক্তি। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে ঋণ দেয়া যেমন সম্ভব হবে, তেমনি ভুয়া ও বেনামি ঋণগ্রহীতাদের কোনো সুযোগ থাকবে না। তাতে করে যেটা হবে, প্রকৃত ঋণগ্রহীতারা সুবিধা পাবেন। ছোট বা বড় যেকোনো ঋণগ্রহীতাই সমান সুযোগ পাবেন। নিশ্চিত করে বলা যায়, ব্যাংক খাতের এ ডিজিটালাইজেশন অর্থনীতির পালে নতুন হাওয়া দেবে। 

এ প্রক্রিয়ায় ঋণগ্রহীতার পরিচয় নিশ্চিত করবে প্রযুক্তি। নিজেকে আড়ালে রেখে ঋণ নেয়ার সুযোগ চলে যাবে জাদুঘরে। ফলে এখন যেমন ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বেরিয়ে যাওয়ার কথা বিভিন্ন খবর মাধ্যমে আসে, তখন এমন খবরও আর থাকবে না, সেটা নিশ্চিত করে বলা যায়। প্রযুক্তিই যে স্বচ্ছতার সর্বোচ্চ নিশ্চয়তা দিতে পারে! 

তবে সবচেয়ে বড় অগ্রগতি হবে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে। এমনিতে শুধু ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির হার কম বেশি ২০ শতাংশ। আমরা মোবাইল আর্থিক সেবা কোম্পানিগুলো এত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সব মিলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ৫০ শতাংশের ওপরে নিতে পারিনি। খুব স্বাভাবিকভাবেই বলা যায়, মোবাইলের লেনদেন দিয়ে অনেক প্রয়োজনই মেটানো যায়, কিন্তু লেনদেনের সব প্রয়োজন মেটে না। এমন সব বাধার কারণেই মোবাইল আর্থিক খাতের সব লেনদেন মিলিয়েও মাসে এক লাখ কোটি টাকার অংক পেরোচ্ছে না। তাও নগদ বাজারে আসার পর উদ্ভাবন আর সেবার চমৎকারিত্ব মিলে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করার ফলে কিছুটা হলেও এ খাতে গতির সঞ্চার হয়। 

ভেতর থেকে পরিস্থিতি দেখার অভিজ্ঞতায় বলছি, ডিজিটাল বাংলাদেশে বাস করা মানুষের আরো অনেক বেশি ডিজিটাল লেনদেনের সেবা প্রাপ্য। কিন্তু সেটি দেয়া যাচ্ছে না কেবল ডিজিটাল ব্যাংক না থাকার কারণে। অথচ পাশের দেশ ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, হংকং এমনকি পাকিস্তানেও আছে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা। ওরা যদি পারে, তাহলে আমরা কেন নয়? 

আজকের দিনে ব্যাংক থাকবে মানুষের হাতে হাতে। ব্যাংকিংয়ের জন্য ব্যাংক শাখা কেন দরকার হবে? সব কাজই যদি মোবাইলে করা সম্ভব হয়, তবে ব্যাংকিং কেন নয়? নেতিবাচক এ প্রশ্নগুলো এত দিনে আমাদের সামনে থেকে সরানোর একটা সুযোগ পাচ্ছি। সে কারণে নীতিনির্ধারকরা অবশ্যই বাড়তি ধন্যবাদের দাবিদার। কারণ এই একটা ছোট্ট নীতিসহায়তাই বহু কিছুকে বদলে দেবে। 

যেহেতু ডিজিটাল ব্যাংক রূপরেখা প্রণয়ন হয়েই গেছে এবং সরকারও যেহেতু এটিকে খুবই ইতিবাচকভাবে দেখছে, আগামী অর্থবছরেই চালু হবে এ ডিজিটাল ব্যাংক। হতে পারে ক্যালেন্ডার বর্ষের শেষ ভাগে। বাংলাদেশের আর্থিক খাতের জন্য এর চেয়ে বড় খবর মনে হয় এখনকার সময়ে হতে পারে না। বর্তমানে দেশে ৬১টি ব্যাংক আছে। তবে আমি হলফ করে বলছি, সব ব্যাংক মিলে যা করতে পারেনি, একটা ডিজিটাল ব্যাংকই তার চেয়ে অনেক বেশি অবদান অর্থনীতিতে রাখতে পারবে, যদি সেটি ঠিকমতো সেবার কলেবর সাজিয়ে বসতে পারে। 

আমি তো সেই সময়ের স্বপ্ন দেখি, যখন একজন কৃষক তার জমিতে সেচ দেয়ার জন্য মাত্র কয়েক হাজার টাকা ঋণের আবেদন করবেন মোবাইল ফোনের কয়েকটা বাটন চেপে। আর সেটি পেয়েও যাবেন মুহূর্তেই। পরে ফসল বিক্রি করে সে ঋণও মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই পরিশোধ করবেন তিনি। এমন স্বপ্নও দেখি, বিছানায় শুয়ে শুয়েও ইউরোপ বা আমেরিকায় কোনো পণ্যের কাঁচামালের দাম কমার খবর দেখে সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ঋণপত্র খুলতে পারেন কোনো এক শিল্প গ্রুপের মালিক। 

আমার স্বপ্নটাকে বিশ্বাসের সীমায় নিয়ে এসেছেন অর্থমন্ত্রীর ঘোষণা ও তৎপরবর্তী বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যক্রম। তবে তারো আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৭ সালের মধ্যে ৭৫ শতাংশ লেনদেনকে ক্যাশলেস করার ঘোষণা স্বপ্নটাকে প্রসারিত করেছিল। স্বপ্ন আর বিশ্বাসের এ মিশেলের মাধ্যমে স্মার্ট বাংলাদেশ এখন স্বতঃস্ফূর্ত এক বাস্তবতার লক্ষ্য, যেখানে ডিজিটাল ব্যাংক হবে সাফল্যের তরণী।

আরও