সিপিডির সেমিনারে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

দেশে আয়ভিত্তিক বৈষম্যের সঙ্গে সম্পদবৈষম্য বাড়ছে

সিপিডির ডিস্টিংগুইসড ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বলেছেন, ‘বাংলাদেশে আয় বেড়েছে দ্বিগুণ, কিন্তু একই সঙ্গে বৈষম্যও বেড়েছে।

সিপিডির ডিস্টিংগুইসড ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বলেছেন, ‘বাংলাদেশে আয় বেড়েছে দ্বিগুণ, কিন্তু একই সঙ্গে বৈষম্যও বেড়েছে। আয়ভিত্তিক বৈষম্যের সঙ্গে সম্পদবৈষম্য বাড়ছে। আয় বৈষম্য ১ দশমিক ৪ শতাংশ হলে সম্পদবৈষম্য বেড়েছে ৩ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ সম্পদবৈষম্য ক্রমান্বয়ে ঘনীভূত হচ্ছে।’

গতকাল রাজধানীর এক রেস্তোরাঁয় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইউ) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘স্টেট অ্যান্ড স্কোপ অব প্রপার্টি ট্যাক্সেশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। সেমিনারে আরো উপস্থিত ছিলেন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের হেড অব কো-অপারেশন মরিজিও সিয়ান, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান হাবিব মনসুরসহ অন্যরা।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘বাংলাদেশের আদায়কৃত করের দুই-তৃতীয়াংশ পরোক্ষ। বাকি এক-তৃতীয়াংশ আসে প্রত্যক্ষ কর হিসেবে। আমাদের ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও ৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হিসাব করলে বছরে ৬ হাজার কোটি টাকার বাড়তি সম্পদ কর আসার কথা ছিল। তা আমরা পাইনি। অস্ট্রেলিয়ায় শুধু সম্পদ কর মোট জিডিপির ১০ শতাংশ। সেখানে আমাদের শূন্য দশমিক ৩ শতাংশের মতো, যা আফ্রিকার সম্পদ করের সমপরিমাণ। অথচ আমাদের আয় আফ্রিকার দেশগুলোর চেয়ে বেশি।’

বিশিষ্ট এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘বিশেষ প্রকল্পগুলোয় সরকার ট্যাক্স দেয় না। একইভাবে আগে সরকার যখন বিদেশ থেকে কিছু পেত তখন আমদানি শুল্ক দিত না, যা এখন পরিবর্তন হয়ে গেছে। সরকার যখন নিজের প্রকল্পের কর ছাড় দেয় তখন স্বাভাবিকভাবে ব্যক্তি খাতের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘‌পৃথিবীর সব দেশে সম্পদ কর বেড়েছে। সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সিপিডি তিনটি সম্পদ কর নিয়ে আলোচনা করেছে। যথা প্রত্যক্ষ সম্পদ কর, হোল্ডিং কর ও সম্পত্তির উত্তরাধিকারের ওপর কর।’ 

আমরা এখনো অনানুষ্ঠানিক কর রিজিমে আছি বলে মন্তব্য করেছেন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে নতুন পদ্ধতি সার্টিফিকেট অব ল্যান্ড ওনারশিপ (সিএলও)। এই স্মার্ট কার্ড থাকলে কোনো ব্যক্তির মোট কত পরিমাণ জমি আছে সেসব তথ্য সহজেই পাওয়া যাবে। পাশাপাশি ল্যান্ড ক্রাইম অ্যাক্ট নিয়েও আমরা কাজ করছি। তবে আমি মনে করি, আমাদের প্রত্যক্ষ কর নিয়েও কাজ করার সময় এসেছে। তাই ক্যাপিটাল গেইন, শেয়ার ট্রান্সফারসহ আরো কিছু বিষয়ে কাজ করতে হবে।’

ভূমিমন্ত্রী আরো বলেন, ‘ভূমিকর আদায়ে বিপ্লব হয়ে গেছে। ২০১৯-২০ সালে সনাতনী পদ্ধতিতে বার্ষিক ভূমি কর পেয়েছি ৬২১ কোটি টাকা। ২০২০-২১ সালে সনাতনী ও অনলাইন উভয় মাধ্যম মিলিয়ে আদায় হয়েছে ৭৯১ কোটি টাকা। কিন্তু সনাতনী পদ্ধতি বাতিল করে এ বছরের ১৪ এপ্রিল থেকে শতভাগ অনলাইনে কর নিচ্ছি। এতে দেখা গেছে, গত এক মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩২৬ কোটি টাকা। আমি আশা করছি, এ অর্থবছরে সেটি দাঁড়াবে ২ হাজার কোটি টাকায়।’

ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘মানুষের মধ্যে সম্পদের সুষম বণ্টন নেই। আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে, জমি ও বাড়ির ক্ষেত্রে যথাযথভাবে কর আরোপ হচ্ছে না। জমিতে বিনিয়োগ বাড়ছে। কিন্তু এখানে বিনিয়োগে কর দিতে হয় না।’

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসিরুদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের হোল্ডিং ট্যাক্স ও ভূমি রেজিস্ট্রেশন নিয়ে কাজ করতে হবে। আমাদের এখন নতুন কিছু আরোপের চেয়ে পুরনো বিষয়গুলোয় কিভাবে স্বচ্ছতা আনয়নসহ পরিবর্তন, পরিবর্ধন করে সম্পদ কর বাড়ানো যায় সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এরই অংশ হিসেবে কর, বেজ-রেট, মূল্যায়ন এ তিন বিষয়ের উন্নতিতে গুরুত্ব দিতে হবে।’

আরও