নগরীর সৌন্দর্য বাড়াতে একটি উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এর আওতায় ধানমন্ডির সাতমসজিদ সড়কে বিভাজক ভেঙে নতুন করে নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। কেটে ফেলা হয় সড়ক বিভাজকে থাকা ৫৬৩টি গাছ। এ নিয়ে চলতি মাসের শুরু থেকেই আন্দোলনে নেমেছেন ধানমন্ডিবাসী ও পরিবেশ আন্দোলনকর্মীরা। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ডিএসসিসি সূত্রে জানা গেছে, উন্নয়ন প্রকল্পের প্রয়োজনে অন্তত আরো আট এলাকায় কাটা পড়বে ছোট-বড় নানা প্রজাতির গাছ। যদিও সেখানে নতুন করে গাছ লাগানোর আশ্বাস দিয়েছে সংস্থাটি।
জানা গেছে, বেশ কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে ডিএসসিসি। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রজেক্টের (ডিসিএনইউপি) অধীনে সদরঘাটের লালকুঠি, নারিন্দা, খিলগাঁও ও ধোলাইখাল এলাকায় উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলমান। প্রকল্পটির মাধ্যমে দুটি খেলার মাঠ, দুটি কমিউনিটি সেন্টার ও একটি পুকুর আধুনিকায়নে কাজ করা হচ্ছে, যেখানে নির্মাণ হবে বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো। এজন্য ওইসব এলাকায় থাকা বড় অনেক গাছ কাটা পড়বে বলে জানিয়েছে ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষ।
ডিএসসিসির ৮৯৮ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে আরেকটি প্রকল্পের মাধ্যমে কালুনগর, জিরানী, মান্দা ও শ্যামপুর খাল উন্নয়নের কাজও এগোচ্ছে। খালগুলোর মোট দৈর্ঘ্য ১৯ দশমিক ৭৮ কিলোমিটার। এর মধ্যে কালুনগর খাল ২ দশমিক ৪ কিলোমিটার, জিরানী খাল ৩ দশমিক ৯, মান্দা খাল ৮ দশমিক ৭ ও শ্যামপুর খাল ৪ দশমিক ৭৮ কিলোমিটার। প্রকল্পের আওতায় ৩৮ দশমিক শূন্য ৬ কিলোমিটার সীমানাপ্রাচীর, ৩৬টি পথচারী সেতু, যানবাহন চলাচলের জন্য ১৯টি সেতু, ১০টি পাবলিক টয়লেট, ৩২ দশমিক ৪৪ কিলোমিটার হাঁটার পথ, চারটি প্লাজা, সাইকেল লেন ও ৭৭১টি লাইট স্থাপন করা হবে। চার খালের এ সংস্কারকাজ করতে গিয়েও আশপাশের গাছ কাটতে হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএসসিসির তিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে জানান, ডিসিএনইউপির প্রকল্পের আওতায় রাজধানীর চারটি এলাকার গাছ কাটার পরিকল্পনা রয়েছে ডিএসসিসির। এছাড়া যেসব সড়ক বিভাজকে বড় বড় গাছ আছে সেগুলো কেটে ছোট ফুলগাছ লাগানো হবে। তবে এখন যেহেতু ধানমন্ডির গাছ কাটা নিয়ে পরিবেশবাদীরা আন্দোলন করছেন তাই একটু কৌশলী হয়েছে সংস্থাটি। আপাতত কোনো বড় গাছ কাটা হবে না। ধীরে ধীরে সব শান্ত হয়ে গেলে ওই আট এলাকার বাইরেও সড়ক বিভাজকের গাছ কাটা হবে। মূলত উন্নয়নের প্রয়োজনেই গাছগুলো কাটা হবে। পরিবেশের ক্ষতি ও নগরবাসীর ভোগান্তির কোনো উদ্দেশ্য ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষের নেই। তাই গাছ কাটলেও নতুন করে আবার লাগানো হবে।
ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী সালেহ আহম্মেদ অবশ্য বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের কোনো প্রকল্পে গাছ কাটা পড়বে না। বরং আমরা পরিকল্পনা নিয়েছি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বেশি বেশি গাছ লাগানোর। ধানমন্ডির সাতসমজিদ সড়ক বিভাজকেও আমরা এরই মধ্যে এক হাজারের মতো গাছ লাগিয়ে ফেলেছি। আরো গাছ লাগাব। সড়ক বিভাজকে বড় গাছ থাকলে নানা দুর্ঘটনা ঘটে, বড় বাস চলতে অসুবিধা হয়। তাই সেখানে বড় গাছ কেটে ছোট গাছ লাগানো হয়েছে।’
পরিবেশবিদরা যদিও বলছেন, উন্নয়নের কথা বলে রাজধানীর গাছ কাটা অযৌক্তিক। যেখানে প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেক গাছও নেই সেখানে ছোট ছোট প্রকল্পের নামে গাছ কাটা একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ধরনের ভুল চর্চা থেকে বেরিয়ে আসার দাবি জানিয়েছেন তারা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকা শহরের যে অবস্থা সেখানে নতুন করে গাছ লাগানোর কথা। কিন্তু সেটা না করে দক্ষিণ সিটি উল্টো কাটছে। বড় বড় গাছ কেটে ছোট ছোট গাছ লাগাচ্ছে। এতে পরিবেশের ওপর কী বিরূপ প্রভাব পড়বে সেটা কি সিটি করপোরেশন সমীক্ষা করেছে? সিটি করপোরেশন যেসব প্রকল্পের আওতায় গাছ কাটছে সেসব প্রকল্পের জন্য কি এলাকাবাসীর মতামত নিয়েছে? পরিবেশকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছে? নিজেরা নিজেরা ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে উন্নয়নের নামে গাছ কাটবে, এটা কেমন কথা? জনগণের টাকায় গাছ কেটে জনগণকেই তাপপ্রবাহ ও দুর্যোগের সঙ্গে বসবাস করতে বাধ্য করা হবে, এটা তো সিটি করপোরেশনের কাজ নয়। গাছ রেখেও কীভাবে উন্নয়ন করা যায় সিটি করপোরেশনকে সে উদাহরণ দেখাতে হবে।’
পরিবেশ কর্মীরা বলছেন, ঢাকা দক্ষিণের অংশে এমনিতেই সবুজের পরিমাণ কম। এর মধ্যে আবার ছোটখাটো উন্নয়ন প্রকল্পে বড় বড় গাছ কাটার চর্চা থেকে ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষ বেরিয়ে না এলে সামনের দিনগুলোয় তাপপ্রবাহসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হবে নগরবাসীকে। তাছাড়া প্রাণ-প্রকৃতির জীবনকে বিপন্ন করার অধিকার এ সংস্থার নেই বলেও মন্তব্য করেছেন তারা।
ঢাকার মতো জটিল সমস্যায় জর্জরিত একটি শহরে হুটহাট করে গাছ কাটার সিদ্ধান্ত মোটেও ভালো কিছু নয় বলে মন্তব্য করেছেন ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘খুব প্রয়োজন না হলে বড় বড় গাছ কেটে ছোট গাছ লাগানো একটা নগরের জন্য ভালো সিদ্ধান্ত নয়। একটি বড় গাছ কাটার পর নতুন যে চারা লাগানো হয়, সেটি বড় হতে যে সময় লাগবে ওই সময় পর্যন্ত তো ব্যাপক ভোগান্তি পোহাতে হয় নগরবাসীকে। শুধু যে মানুষ কষ্ট পায় তা নয়, প্রাণবৈচিত্র্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতি হয়। বড় গাছে যে পাখিগুলো বসত ছোট গাছে তো এরা আসবে না। বিশ্বের বড় বড় শহরে গাছ রক্ষা করেই নগর পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু আমাদের নগর কর্তৃপক্ষের মধ্যে সে ইচ্ছাটা দেখি না। প্রয়োজন হলে গাছ কাটা যেতে পারে। কিন্তু গাছ রক্ষার ইচ্ছাই যদি না থাকে—এ মনোভাব কীভাবে মেনে নেয়া যায়?’