মূল্যস্ফীতি ১০৯%, সুদহার ৯৭%

আর্জেন্টিনার অর্থনীতি ধসে পড়ছে

৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ অনেকটাই উবে গেছে আর্জেন্টাইনদের। ব্যয় বাড়তে বাড়তে কঠিন হয়ে পড়েছে জীবনযাপন। আর্জেন্টিনার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে গত এপ্রিলেও মূল্যস্ফীতির হার ছিল আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০৯ শতাংশ। ক্রমাগত সুদহার বাড়িয়েও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেন্ট্রাল ব্যাংক অব আর্জেন্টিনা (সিবিআরএ)। সর্বশেষ গত সপ্তাহে আরেক দফা বাড়ানোর পর সুদহার দাঁড়িয়েছে ৯৭ শতাংশে।

৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ অনেকটাই উবে গেছে আর্জেন্টাইনদের। ব্যয় বাড়তে বাড়তে কঠিন হয়ে পড়েছে জীবনযাপন। আর্জেন্টিনার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে গত এপ্রিলেও মূল্যস্ফীতির হার ছিল আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০৯ শতাংশ। ক্রমাগত সুদহার বাড়িয়েও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেন্ট্রাল ব্যাংক অব আর্জেন্টিনা (সিবিআরএ)। সর্বশেষ গত সপ্তাহে আরেক দফা বাড়ানোর পর সুদহার দাঁড়িয়েছে ৯৭ শতাংশে। 

পরিস্থিতি মোকাবেলায় একগুচ্ছ পদক্ষেপ গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে দেশটির সরকার। চলতি সপ্তাহেই এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। ঘোষিত এসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে বিনিময় হারে হস্তক্ষেপ, অর্থনীতির সবচেয়ে নাজুক খাতগুলোকে ভর্তুকি দিয়ে চাঙ্গা করা ও বাজারে খাদ্যদ্রব্যের দাম কমাতে আমদানি বাড়ানো ইত্যাদি। কিন্তু এসব পদক্ষেপ আদতে দেশটির অর্থনীতির ধস ঠেকাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে কিনা সে বিষয়ে সন্দিহান অর্থনীতিবিদরা। 

তাদের ভাষ্যমতে, চরম বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে আর্জেন্টাইন অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাত। গত মাসের মাঝামাঝি এক সপ্তাহের মধ্যেই দেশটির মুদ্রা পেসোর অবমূল্যায়ন ঘটে। খোলাবাজারে ডলারের বিনিময় হার দাঁড়ায় আনুষ্ঠানিক বিনিময় হারের দ্বিগুণে। কিছু সময়ের জন্য ৫০০ পেসোয় গিয়ে ঠেকে প্রতি ডলারের মূল্যমান। শেষ পর্যন্ত এখন তা স্থির হয়েছে ৪৭০ পেসোয়। খোলাবাজারে প্রায় দ্বিগুণ হলেও দেশটিতে ডলারের আনুষ্ঠানিকভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘোষিত বিনিময় হার ২৩৮ পেসো। 

মুদ্রা পরিস্থিতি এক প্রকার অকার্যকর হয়ে পড়ায় আর্জেন্টাইনদের মধ্যে এখন পণ্য বিনিময়ের (বার্টার) প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। প্রায়ই স্থানীয় অনেক বাসিন্দাকে খোলা আকাশের নিচে পসরা সাজিয়ে বসতে দেখা যায় পণ্য বিনিময়ের তাগিদে। 

আর্জেন্টিনা ২০২২ সালে তিন দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির দেখা পায়। গোটা বছরজুড়ে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ২০২১ সালের তুলনায় প্রায় ৯৫ শতাংশ। ক্রমেই বাড়তে বাড়তে সর্বশেষ গত এপ্রিলে আর্জেন্টিনায় মূল্যস্ফীতির হার উঠে দাঁড়িয়েছে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০৯ শতাংশে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সিবিআরএর তথ্য পর্যালোচনার ভিত্তিতে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত আর্জেন্টিনায় মূল্যস্ফীতি বা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির হার ৩১ শতাংশ। 

অর্থনীতির এ দৈন্যদশায় লাতিন আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ কৃষিপণ্য রফতানিকারক দেশটিতে দারিদ্র্যের হারও এখন বেড়ে চলছে। আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, দেশটিতে এখন দারিদ্র্যের হার ৩৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সামনের দিনগুলোয় তা আরো বাড়তির দিকে থাকবে। 

আর্জেন্টিনার অর্থনীতির জন্য এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বোঝা দেশটির ক্রমবর্ধমান ঋণ। বর্তমানে দেশটির মোট জিডিপির আকার ৬১ হাজার কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে বলে বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে উঠে এসেছে। সিইআইসি ডাটার হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালের শেষে দেশটির মোট সরকারি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৯ হাজার ৬৬০ কোটি ডলার। সে অনুযায়ী, দেশটির ঋণ-জিডিপি অনুপাত এখন ৬৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। 

যদিও নমিনাল জিডিপির হিসাবে তা ৭৯ শতাংশের বেশি বলে সিইআইসি ডাটার তথ্যে দাবি করা হয়েছে। 

দেশটির বর্তমান পরিস্থিতির জন্য আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারকদেরই সবচেয়ে বেশি দায়ী করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত কয়েক বছরে ক্রমাগত মুদ্রা ছাপিয়ে গেছে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে বাজারে মুদ্রার সরবরাহ বেড়ে মূল্যস্ফীতি চলে গেছে নিয়ন্ত্রণের ঊর্ধ্বে। এ পরিমাণ নোট ছাপা হয়েছে যে সুদহার ১০০ শতাংশের কাছাকাছি আনা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মূল্যস্ফীতিকে ১০০ শতাংশের বেঞ্চমার্কের নিচে নামানো সম্ভব হয়নি।

আবার বর্তমানে আর্জেন্টিনার কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সরকারের পক্ষে এখন চাইলেও ইচ্ছামাফিক অর্থনৈতিক সংস্কার করা সম্ভব না। বর্তমানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সবচেয়ে বড় ঋণগ্রহীতা দেশ আর্জেন্টিনা। দেশটির সরকার অনেক পদক্ষেপই বাস্তবায়ন করতে পারেনি শুধু আইএমএফের শর্ত পালন করতে গিয়ে।

শুধু আইএমএফ নয়, চীনের কাছ থেকে ঋণগ্রহণের দিক থেকেও এ মুহূর্তে আর্জেন্টিনা শীর্ষে। ২০০৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে গোটা লাতিন আমেরিকা অঞ্চলে ৬২টি ঋণের অর্থ বিতরণ করেছে চীনা ব্যাংকগুলো। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাংক ইন্টার-আমেরিকান ডায়লগের তথ্য অনুযায়ী, এর অর্ধেকেরও বেশি গেছে আর্জেন্টিনায়।

এছাড়া চীনের উচ্চাভিলাষী বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগেরও (বিআরআই) বড় অংশীদার আর্জেন্টিনা। গত কয়েক বছরে দেশটিতে চীনা ঋণে বেশ কিছু বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব ঋণও আর্জেন্টিনার অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।

আর্জেন্টিনার বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস কৃষিপণ্য রফতানি। কভিড মহামারীর অভিঘাতে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে আঘাত হানলে দেশটিও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু গত কয়েক বছরের টানা খরায় দেশটিতে কৃষিপণ্যের উৎপাদনও হ্রাস পেয়েছে। ফলে রফতানি আয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আগামী অক্টোবরে আর্জেন্টিনার সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ধারণে সবচেয়ে বড় প্রভাবক হবে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। দেশটির সাধারণ নাগরিকরা প্রায়ই রাস্তায় নেমে আসছেন বিক্ষোভে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জন্য নীতিনির্ধারকদেরই সবচেয়ে বেশি দায়ী করছেন সাধারণ নাগরিকরা। 

আরও