বৈশ্বিক আর্থিক খাতে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) অবস্থান দিনে দিনে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। বাড়ছে গুরুত্ব ও অবদান। যদিও বিপরীত অবস্থা বাংলাদেশে। ক্রমেই ক্ষয়িষ্ণু হয়ে উঠছে এনবিএফআই খাত। বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত ৩৫ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অর্ধেকই এখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে। মরণাপন্ন দশায় অন্তত ১০টি। পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অর্থ লুণ্ঠনের অভিযোগ উঠেছে বারবার। ঋণের নামে বের করে নেয়া অর্থ ফিরছে না আর্থিক প্রতিষ্ঠানে। এখন আমানতকারীদের অর্থও ফেরত দিতে পারছে না এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান।
দুর্বল হয়ে পড়া এনবিএফআইগুলো বিরূপ প্রভাব ফেলছে সবল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপরও। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যাংকের চেয়েও ভালো অবস্থানে থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠানও এখন ভাবমূর্তি সংকটে রয়েছে। ভালো প্রতিষ্ঠান থেকেও আমানত তুলে নিচ্ছেন গ্রাহকরা। আবার গ্রাহকদের কাছ থেকে নতুন করে আমানত সংগ্রহ করাও প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় মরণাপন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে জোর করে টিকিয়ে রাখার কারণ সম্পর্কে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান লুটের ঘটনায় গত কয়েক বছর সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পিকে হালদারের নাম। পরিচালনা পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একাই চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান লুণ্ঠনের অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। এগুলো হলো পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স করপোরেশন লিমিটেড (বিআইএফসি), ইন্টারন্যাশনাল
লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড ও এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড। আবার কিছু এনবিএফআই পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের অনিয়ম-দুর্নীতিতে দুর্বল হয়ে পড়ারও অভিযোগ আছে। এগুলো হলো প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেড, প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, ফার্স্ট ফাইন্যান্স লিমিটেড, ইউনিয়ন ক্যাপিটাল লিমিটেড। কয়েক বছর ধরেই প্রতিষ্ঠানগুলো ধারাবাহিকভাবে লোকসান দিয়ে যাচ্ছে। বিতরণকৃত ঋণের বড় অংশ খেলাপি হয়ে যাওয়ায় এনবিএফআইগুলোর সম্পদের চেয়ে দায়ের পরিমাণ বেড়ে গেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের পুঞ্জীভূত লোকসান মূলধনেরও তিন-চার গুণ বেশি। এ অবস্থায় কর্মীদের বেতন-ভাতা আর ভবনের ভাড়া পরিশোধ করতে গিয়ে দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসানের পাল্লা আরো ভারী হচ্ছে।
অর্থনীতিতে দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানগুলো
থাকা না-থাকার মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। অনেক আগেই এগুলোকে একীভূতকরণ বা অবসায়ন করে দেয়ার দরকার ছিল।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ
ব্যাংক থেকে উদ্যোগ নিয়ে দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উন্নতির সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উন্নতি করতে না পারলে এসব প্রতিষ্ঠানকে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করে দেয়া যায়। একীভূত করা সম্ভব না হলে অবসায়নের দিকে যেতে হবে। আর অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে যে প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে, সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে নেয়া দরকার।’
দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে ৩৫টি এনবিএফআই। এর মধ্যে ১৩টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানই বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ র্যাংকিংয়ে ‘রেড’
জোনে বা বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল। বর্তমানে এনবিএফআইগুলোকে আর্থিক স্বাস্থ্যের ভিত্তিতে রেড, ইয়োলো ও গ্রিন র্যাংকিংয়ে বিভাজন করছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, রেড জোনে পড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম প্রকাশ হলে গ্রাহকরা সেখান থেকে আমানত তুলে নেন। এ কারণে শ্রেণী বিভাজন করা থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিরত থাকছে।
তবে সর্বশেষ র্যাংকিংয়ের রেড জোনে থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো গ্রাহকদের আমানতের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্দশার চিত্র উঠে এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনেও। বাংলাদেশ সিস্টেমিক রিস্ক ড্যাশবোর্ডের (বিএসআরডি) জুন-২০২২ সংখ্যায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে সেটি ভয়াবহ। এতে দেখা যায়, গত বছরের জুনে এসে খাতটির ইকুইটির বিপরীতে আয় (আরওই) ঋণাত্মক ১০ শতাংশ এবং সম্পদের বিপরীতে আয় (আরওএ) ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ। এনবিএফআইগুলোর গড় খেলাপি ঋণের হারও ২৩ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। মূলত দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কারণেই খাতটির সামগ্রিক পরিসংখ্যান এতটা নেতিবাচক দেখাচ্ছে। যদিও দেশের প্রথম সারির এনবিএফআইগুলোর আরওই ও আরওএ ব্যাংক খাতের চেয়েও ভালো। ভালো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণের হারও ৫ শতাংশের নিচে। দেশের সবক’টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত সম্পদের পরিমাণ ৯৪ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা।
আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে না পারায় ২০১৯ সালের জুলাইয়ে পিপলস লিজিংকে অবসায়নের (লিকুইডেশন) ঘোষণা দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। আদালতের নির্দেশে ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. আসাদুজ্জামান খানকে অবসায়ক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠানটির অবসায়ন হয়নি। পরে পিপলস লিজিংয়ের পুনর্গঠিত পর্ষদের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে বাঁচিয়ে রাখার ঘোষণা দেয়া হয়। যদিও এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির আমানতকারীরা অর্থ ফেরত পাননি।
মো. আসাদুজ্জামান খান গতকাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কেউ
তার সন্তানের মৃত্যু দেখতে চান না। পিপলস লিজিংকে পুনর্গঠন করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালকও নিয়োগ দেয়া হয়েছে।’
মন্দ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের কারণে ভালো প্রতিষ্ঠানগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানান বাংলাদেশ ফাইন্যান্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. কায়সার হামিদ। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলএফসিএ) ভাইস চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন তিনি। বণিক বার্তাকে কায়সার হামিদ বলেন, ‘৮-১০টি দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কারণে পুরো এনবিএফআই খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সাধারণ মানুষ ভালো ও মন্দকে আলাদা করতে পারছে না। এ কারণে ভালো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনেক বেশি প্রচার-প্রচারণা চালাতে হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘যেসব
প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে গেছে, সেগুলোর পেছনে গুটিকয়েক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান জড়িত। এখন দুর্বল হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে সবল করতে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম নেয়া দরকার। এক্ষেত্রে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোক্তারা মূলধন জোগান দিতে পারেন। মালিকপক্ষ যদি ১০০-২০০ কোটি টাকা মূলধন জোগান দেয়, তাহলে আমানতকারীরাও আস্থা পাবে। আর যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের সম্পদ বিক্রি করে হলেও খেলাপি ঋণ আদায় করতে হবে। পাশাপাশি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী হলে দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।’
পিকে হালদারের লুটপাটের শিকার আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের সম্পদের চেয়ে দায়ের পরিমাণ বেশি। প্রতিষ্ঠানটির ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ওই সময় পর্যন্ত এফএএস ফাইন্যান্সের মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ১৫২ কোটি টাকা। বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটির দায় ছিল ২ হাজার ৯১৮ কোটি টাকারও বেশি। এফএএস ফাইন্যান্সের শেয়ারহোল্ডার ইকুইটি ঋণাত্মক ৭৬২ কোটি টাকা। রিটেইনড আর্নিংসের পরিমাণও ঋণাত্মক ৯৪৬ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।
২০২১ সালের জুনে এফএএস ফাইন্যান্সের পর্ষদ পুনর্গঠন করে দেয় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। প্রতিষ্ঠানটির পুনর্গঠিত পর্ষদের চেয়ারম্যান মো. নুরুল আমিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দায়িত্ব
নেয়ার পর এফএএস ফাইন্যান্সের প্রকৃত অবস্থা বের করার চেষ্টা করেছি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে সেসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। পিকে হালদার এফএএস ফাইন্যান্স থেকে যেসব অর্থ নিয়েছে, তার মধ্যে ৩০০-৪০০ কোটি টাকা উদ্ধার করা সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থাসহ সব পক্ষের সহযোগিতা লাগবে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও প্রতিষ্ঠানটিকে ফাংশনাল করা সম্ভব হলে বাঁচানো সম্ভব।’
পিকে হালদারের লুট করা আরেক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের পর্ষদও পুনর্গঠিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন সাবেক সচিব এনআই খান। বর্তমান অবস্থায় প্রতিষ্ঠানটিকে রক্ষা করার সম্ভাব্যতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাঁচানো
সম্ভব, তবে সময় লাগবে। প্রতিষ্ঠানটিকে আমানতকারীদের স্বার্থেই বাঁচিয়ে রাখতে হবে। যেসব আমানতকারী ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে টাকা রেখেছেন, তাদের কেউ কেউ মারা গেছেন। কেউ তার জীবনের শেষ সম্বল এ প্রতিষ্ঠানে আমানত রেখেছেন। আমানতকারীদের প্রত্যেকের টাকা ফেরত দিতে হবে। এরই মধ্যে কিছু আমানতকারীর অর্থ ফেরত দেয়া হয়েছে। যেসব অপরাধীর কারণে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের এ পরিণতি হয়েছে, তাদেরও শাস্তির আওতায় আনতে হবে।’
বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স করপোরেশন লিমিটেডের (বিআইএফসি) অবস্থা আরো খারাপ। ২০১৯ সালের পর প্রতিষ্ঠানটির কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ওই সময় পর্যন্ত বিআইএফসির মোট সম্পদ ছিল ৯০৯ কোটি টাকা। বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারহোল্ডার ইকুইটিও ছিল ঋণাত্মক ৯৪৯ কোটি টাকা। ২০১৯ সালে ১২২ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি।
ফার্স্ট ফাইন্যান্স লিমিটেডের সম্পদের চেয়ে দায় বেশি। গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির মোট সম্পদ ছিল ১ হাজার ৫০ কোটি টাকা। বিপরীতে দায়ের পরিমাণ ১ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ফার্স্ট ফাইন্যান্সের শেয়ারহোল্ডার ইকুইটিও ঋণাত্মক ২৩৭ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির ক্রমপুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ ৩৯২ কোটি টাকারও বেশি।
শেয়ারহোল্ডার ইকুইটি ঋণাত্মক ধারায় চলে গেছে প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেডের। গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে প্রতিষ্ঠানটির ইকুইটি ছিল ঋণাত্মক ১১৪ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির মোট সম্পদ ও দায়ের পরিমাণ ১ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। ২০২১ সালে ২৪০ কোটি টাকা নিট লোকসান দিয়েছিল প্রিমিয়ার লিজিং। গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্তই প্রতিষ্ঠানটি ৮৫ কোটি টাকা লোকসানে ছিল।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরের পর নিজেদের ওয়েবসাইটে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড। ওই সময় পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির পুঞ্জীভূত লোকসান (রিটেইনড আর্নিংস) ছিল ২১৭ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির মোট দায় ছিল ১ হাজার ১৭২ কোটি টাকা। একই সময়ের পর কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডও। ওই সময় পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির মোট সম্পদ ছিল ১ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা। প্রাইম ফাইন্যান্সের পুঞ্জীভূত লোকসান ছিল ১৩৭ কোটি টাকা।
দিনে দিনে লোকসানের পাল্লা ভারী হচ্ছে ইউনিয়ন ক্যাপিটাল লিমিটেডের। ২০২০ সালে ৫৩ কোটি টাকা নিট লোকসান গোনার পর ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠানটি লোকসান দিয়েছে ১৩৮ কোটি টাকা। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্তই ইউনিয়ন ক্যাপিটাল ৯৪ কোটি টাকা নিট লোকসান দিয়েছে। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ ৩৭৯ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। ইউনিয়ন ক্যাপিটালের ইকুইটিও ঋণাত্মক ১৬১ কোটি টাকা। ১ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা সম্পদের প্রতিষ্ঠানটির দায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮১৮ কোটি টাকা। কিছুটা ভালো অবস্থানে থাকলেও গত কয়েক বছরে ক্রমেই খারাপ হচ্ছে বে লিজিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ও ফিনিক্স ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের অবস্থাও।
ধুঁকতে থাকা একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বলেন, ‘প্রতি
মাসে আমানতকারীদের কাছ থেকে ৫-৭ কোটি টাকা জমা হচ্ছে। এ অর্থ থেকেই আমরা কর্মীদের বেতন-ভাতা ও ভবনের ভাড়া পরিশোধ করছি। বিনিয়োগ করে আয় করার মতো কোনো পরিস্থিতি আমাদের নেই। আবার আগে বিনিয়োগ করা অর্থও আদায় হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসানের পাল্লাই ভারী হবে।’
যদিও দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়ার মধ্যে কোনো সমাধান দেখছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক মনে করেন, দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দিলে অর্থ আত্মসাত্কারীরাই বেশি উপকৃত হবে। তারচেয়ে এসব প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রেখে খেলাপি হওয়া ঋণ আদায়ে জোর দিলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
মেজবাউল হক বলেন, ‘বাংলাদেশ
ব্যাংক পুরো এনবিএফআই খাতকে শক্তিশালী করে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সবল করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা ও পর্ষদে সুশাসন ফেরাতে দিকনির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। পিকে হালদারসহ অর্থ আত্মসাত্কারীদের সম্পদ বিক্রি করে অর্থ আদায় একটি দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক এক্ষেত্রে কোনো শিথিলতা দেখাবে না। আমানতকারীদের উদ্দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বার্তা হলো আপনারা বেশি সুদ বা মুনাফার পেছনে না ছুটে বুঝেশুনে টাকা রাখুন। ভালো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে টাকা রাখলে সেটি কখনো হারাবে না।’