আইএমএফের কাছে পলিসি সার্বভৌমত্বে আংশিক ‘আত্মসমর্পণ’ করে বাংলাদেশ ঋণ নিতে সম্মত হয়েছে বলে জানিয়েছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। সিপিডি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ট্যাক্সিং দ্য ডিজিটাল ইকোনমি: ট্রেড-অফস অ্যান্ড অপরচুনিটিজ শীর্ষক সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন। গতকাল রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
সংলাপে বক্তারা জানান, ডিজিটাল ইকোনমি কর ব্যবস্থাপনায় আসলে রাজস্ব আয়বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অভ্যন্তরীণ সম্পদের ঘাটতি কমবে। তবে ক্রমবর্ধমান এ খাত যাতে ট্যাক্সের চাপে অঙ্কুরেই বিনষ্ট না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। আরো বক্তব্য রাখেন কাজী নাবিল আহমেদ এমপি, আহসান আদেলুর রহমান এমপি, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) পরিচালক হাবিবুল্লাহ নেয়ামুল করিম, ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সহসভাপতি মোহাম্মদ শাহাব উদ্দিন, বাংলাদেশ ফ্রিল্যান্সার ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান তানজিবা রহমান প্রমুখ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।
সিপিডির বিশেষ ফেলো ও অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনে বলেন, ‘বাংলাদেশের ডিজিটাল ইকোনমিকে একেবারেই ট্যাক্সেশন করা হয় না এমন নয়। কিন্তু এখানে ঘাটতি ও অস্পষ্টতা রয়েছে। ডিজিটাল ইকোনমিকে ট্যাক্সেশনের আওতায় আনার জন্য তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত সম্প্রসারণ ডিজিটাল ইকোনমি খাত ট্যাক্সের চাপে যাতে অঙ্কুরেই নষ্ট হয়ে না যায়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।’
তিনি জানান, কর অব্যাহতি ও প্রণোদনা দেয়ার মাধ্যমে যে কাজের সুযোগ ও উপার্জনের ক্ষেত্র তৈরি হবে, সেখান থেকে ট্যাক্স বাড়ানোর ক্ষেত্রও সৃষ্টি হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কোনো প্রতিষ্ঠানে ১ টাকা বিনিয়োগ করলেও তা কোনো না কোনোভাবে রাজস্ব আয় বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। তিনি বলেন, ‘আইটি এন্যাবল সার্ভিসের ২৮টি ক্ষেত্রে আয়কর দেয়া লাগছে না। ২০২৩-২৪ সাল পর্যন্ত এ সুবিধা দেয়া আছে। কিন্তু এরপর কী হবে তা নিয়ে সংশয় আছে। এছাড়া মেটা, অ্যালফাবেটের মতো অনাবাসিক টেক জায়ান্টদের ইনকাম টাক্সের আওতায় আনতে হবে।’
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের স্মার্ট বাংলাদেশ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের ভোক্তারা বিশ্ব অর্থনীতিতে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য ডিজিটাল মাধ্যমে করছে। এর প্রসারও ঘটছে। এ বাণিজ্যকে কীভাবে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির এবং কর ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনা যায় তা গবেষণার মাধ্যমে তুলে আনা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তির মাধ্যমে কর ব্যবস্থাপনাকে উন্নত করা যায়। আর কর-জিডিপি বাড়াতে হলেও এ প্রযুক্তিগত সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। দরকার অটোমেশন। এছাড়া ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল ইকোনমিকে কর ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনলে অভ্যন্তরীণ সম্পদের ঘাটতি মেটানো সম্ভব হবে। মেটা, অ্যালফাবেটের মতো বৃহৎ প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান কর ব্যবস্থাপনার বাইরে থাকার কারণে এখানকার রাজস্ব থেকে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি।’
সিপিডির বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘ডিজিটাল ইকোনমির যে বিজনেস মডেল হবে সেটা গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় দেখা যায় খুব অল্প পরিমাণ টাকার আদান-প্রদান হয় এখানে। তাই এ খাতের প্রতিটি জায়গায় যদি ট্যাক্স বসানো হয় তাহলে জটিলতা তৈরি হবে। এজন্য এর বিজনেস মডেলটা পরিষ্কার করা দরকার যে এটা বি-টু-বি না বি-টু-সি। এছাড়া স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা, সাম্য, দক্ষতা ও সহজের মতো পাঁচটি নীতির মাধ্যমে এ বিজনেস মডেল হতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের নির্দিষ্ট আর্থসামাজিক রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতেই আজকের আলোচনা। অন্য সবকিছু বাদ দিলেও বোঝা যায়, দেশটি আইএমএফ প্রোগ্রামের আওতাধীন। যে সমাধানের কথা বলা হচ্ছে, এর মধ্যে তিনটি আইএমএফের সঙ্গে সম্পূর্ণ পরিপূরক। প্রথমত, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হবে। প্রতি বছর জিডিপির দশমিক ৫ শতাংশ হারে অতিরিক্ত কর আহরণ করতে হবে। কিন্তু কীভাবে বাড়বে আমরা তা জানি না। দ্বিতীয়ত, করছাড় যৌক্তিক করা। এটাও বের করার বিষয় রয়েছে। এ দুটি শর্ত আদেশ দিয়ে করা যাবে। তৃতীয় শর্তটি হলো কর আহরণে প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি। এটা আদেশ দিয়ে হবে না। এটা বিদ্যুতের দাম নয়, এটি সারের দাম নয় যে আদেশ দিলাম আর বেড়ে গেল। এটা করতে হলে প্রতিষ্ঠানের অনেক পরিশ্রমের ব্যাপার আছে।’
সিপিডির এ বিশেষ ফেলো বলেন, ‘এসব শর্ত পূরণ করতে প্রতিষ্ঠানকে অনেক পরিশ্রম করতে হবে। এ কাজগুলো আগে করা উচিত ছিল। কিন্তু আমরা পারিনি। দেশের অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীরা চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এখন করতে হবে, এটাই বাস্তবতা। এখন আইএমএফের প্রোগ্রামের আওতায় এটা করতে হবে।’
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমরা পলিসি সার্বভৌমত্ব আংশিকভাবে আইএমএফের কাছে আত্মসমর্পণ করেছি এবং অর্থ নিতে সম্মত হয়েছি ও অর্থ নিয়েছি। এজন্য আমাদের কাজও ডেলিভারি দিতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আইএমএফের ঋণ নেয়ার বিষয়টি সরকার অনুমোদন দিল। কিন্তু এ নিয়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে আলোচনা হলো না। এমনকি মন্ত্রিসভার অর্থনীতিবিষয়ক উপকমিটিতেও আলোচনা হয়নি। স্থায়ী কমিটি কিংবা কেবিনেট সম্পৃক্ত ছিল না। জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তারা সই করলেন। বিদ্যুৎ-সারের দাম বেড়েছে, এর দায়িত্ব কে নেবে? জনপ্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ ছাড়া এ ধরনের সংস্কার কীভাবে এগিয়ে যাবে?’
সিপিডির বিশেষ এ ফেলো আরো বলেন, ‘মাঝে মাঝে বিদেশীরা এসে আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। আমরা অবিন্যস্তভাবে হয়তো সংস্কার করব, কিন্তু তা সুষ্ঠু হবে না। অংশীজনদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে পরিকল্পনা দরকার, যাকে আগামী দিনে রাজনৈতিক উত্তরণের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। যারা নির্বাচনে যেতে চান, নির্বাচনী ইশতেহারে তাদের সংস্কারমূলক কাজের প্রতিফলন থাকতে হবে।’