সরকারের বাজার ব্যবস্থাপনায় বেশ দুর্বলতা রয়েছে। এ সুযোগে কিছু নির্দিষ্টসংখ্যক মানুষ পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কমলেও তার সুফল মিলছে না দেশে। শুধু আমদানি পণ্যই নয়, দেশীয় পণ্যের দামও বেড়েছে লাগামহীনভাবে। এগুলোর কোনোটি যৌক্তিক আবার কোনোটি যৌক্তিক নয়। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল সিপিডি সেন্টারে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৩-২৪ সিপিডির সুপারিশমালা’ শীর্ষক এক সংলাপে তা তুলে ধরেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।
আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের সময় কিছু পণ্যের ওপর করারোপের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নেয়া উচিত জানিয়ে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘কর কমানোর প্রশ্ন এলেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আহরণের ওপর চাপ তৈরি হয়। কিন্তু আমরা দেখেছি, অনেক পণ্যের দাম কমিয়ে মানুষকে স্বস্তিতে রাখা যায়। আমাদের আমদানি ও রফতানিযোগ্য কয়েকটি পণ্যের সঙ্গে যদি আন্তর্জাতিক দামের তুলনা করি, তাহলে দেখব যে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের তুলনায় আমাদের এখানে পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী।’
ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘ঢাকায় চার সদস্যের একটি পরিবারের খাবারের পেছনে প্রতি মাসে ব্যয় হচ্ছে ২২ হাজার ৬৬৪ টাকা। খাবারের এ তালিকা থেকে মাছ-মাংস বাদ দিলে ব্যয় দাঁড়ায় ৭ হাজার ১৩১ টাকা। অথচ গত বছর এ খাবারের দাম ছিল ১৮ হাজার ১১৫ টাকা আর মাছ-মাংস ছাড়া ৫ হাজার ৬৮৮ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে চার সদস্যবিশিষ্ট একটি পরিবারের খাবারের ব্যয় বেড়েছে সাড়ে ৪ হাজার টাকা। এ দামের বিপরীতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের যে আয় তা দিয়ে খাদ্যপণ্য কিনে টিকে থাকা কঠিন।’
সিপিডি জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে যে হারে পণ্যের দাম বাড়ছে, তার চেয়েও বেশি হারে বাড়ছে স্থানীয় বাজারে। বিশেষ করে চাল, আটা, চিনি, ভোজ্যতেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কমলেও স্থানীয় বাজারে এর প্রভাব নেই। অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদিত পণ্যের দামও কারণ ছাড়া ঊর্ধ্বমুখী। এক্ষেত্রে বাজার ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি রয়েছে। লাগামহীন মূল্যস্ফীতির কারণে অনেকেই খাদ্য ব্যয় কমিয়ে আনতে খাবারের তালিকা থেকে বাদ দিচ্ছে মাছ-মাংসসহ বিভিন্ন আমিষ।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘আমরা সবসময় বিশ্ববাজারের ওপর দায় চাপাব, দোষারোপ করব এমন নয়। আমাদের নিজস্ব বাজার ব্যবস্থাপনা, কিছু কিছু কর ব্যবস্থাপনার কারণে এখানে দামের ঊর্ধ্বগতি লাগামহীন থাকে। আর সেই বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার সুযোগ নেয় গুটিকয়েক আমদানিকারক। আমরা দেখছি বাজারে ৯ বা ৮ শতাংশ মূল্যস্ফীতি থাকে। এ পরিমাণ মূল্যস্ফীতির বিপরীতে কোনো কোনো পণ্যের দাম ২০-৩০ শতাংশ বাড়ছে। গড় মূল্যস্ফীতি পণ্য ও দাম অনুযায়ী কিন্তু পরিবর্তিত হয় না। ২০২২-২৩ অর্থবছরে মাছ-মাংস থেকে খাবারের খাতে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়েছে।’
সামনে যে বাজেট প্রণয়ন হবে সেটি বর্তমান সরকারের চলতি মেয়াদের সর্বশেষ বাজেট। এদিকে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে অর্থনীতিতে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। তাই আগামী বাজেটে ছয়টি বিষয়ের ওপর জোর দিতে হবে উল্লেখ করে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব কাঠামো, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য ও মূল্যস্ফীতি, সামাজিক বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত আগামী বাজেটে বড় বিবেচ্য বিষয়। আবার জাতীয় উন্নয়ন ব্যয় অনেকখানি কমছে। রিজার্ভ সংরক্ষিত রাখতে আমদানি সীমিত রাখা হয়েছে। ফলে অর্থনৈতিক চলকগুলোর অনেকটা শ্লথ গতি দেখা যাচ্ছে। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে জুলাই-ডিসেম্বর ছয় মাসে রাজস্ব আহরণ মোটেই স্বস্তিদায়ক নয়। এ সময়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক সূচকে আনা ও আগামী ছয় মাসে কীভাবে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে সেটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।’
সিপিডির এ নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘প্রতি বছর এনবিআরকে বড় ধরনের লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়, কিন্তু সেটা কখনই পূরণ করতে পারে না। ভ্যাট ও আমদানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও প্রত্যাশা অনুযায়ী হচ্ছে না। সরকারের আমদানিনির্ভরতায় শুল্ক খাত থেকে বড় ধরনের রাজস্ব এলেও আমদানি সীমাবদ্ধতায় সেটাও কমে গেছে। যার প্রতিফলন রাজস্ব আহরণে দেখছি। এ ধারা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে রাজস্ব আয় ৭৫ হাজার কোটি টাকা কম হবে।’