রাশিয়ার প্রতি বৈরী যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে বিরত থাকছে ভারত। ইউক্রেনে রুশ সামরিক অভিযানের নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘে আনা প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে চলেছে দেশটি। আবার রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি বাড়িয়ে চলেছে মার্কিন বিধিনিষেধ উপেক্ষা করেই। এ নিয়ে গত সপ্তাহেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দরকষাকষিতে লিপ্ত হয়েছেন ভারতীয় কূটনীতিকরা। আবার রাশিয়া থেকে ব্যাপক মাত্রায় আমদানির কারণে জ্বালানি তেলের বাজারে ডলারের আধিপত্যও এখন কমতে শুরু করেছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্কে এখন বড় ধরনের দূরত্বের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
দেশটির পররাষ্ট্রনীতির কর্তাব্যক্তিরাও এখন পর্যন্ত খোলাখুলিভাবেই রাশিয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়ে চলেছেন। কিছুদিন আগেও মস্কো সফরের সময় ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামনিয়াম জয়শংকর বলেন, ‘আমাদের কাছে রাশিয়া হলো স্থিতিশীল ও দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধু। আমাদের সম্পর্কটিকে যদি বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করা হয়; দেখা যাবে দশকের পর দশক ধরে তা আমাদের দুই দেশকেই লাভবান করেছে।’
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রকে পরস্পরের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে ইন্দোপ্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব। বিশেষ করে ২০২০ সালে চীনের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত সংঘর্ষ ইন্দো-মার্কিন ঘনিষ্ঠতাকে আরো বাড়িয়ে তোলে। জাপান ও অস্ট্রেলিয়াকে সঙ্গে করে প্রায় বিস্মৃত কোয়াড জোটের পুনরুত্থান ঘটায় ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র। তবে এখন চীনের সঙ্গেও ভারতের বৈরিতার মাত্রা বেশ প্রশমিত হয়ে আসতে দেখা যাচ্ছে। গত সপ্তাহেই চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী চিন গাংয়ের সঙ্গে সুব্রামনিয়াম জয়শংকরের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তারা পরস্পরের প্রতি চীন-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তাদের বক্তব্যের বাস্তবায়নও সামনের দিনগুলোয় যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে ব্যবধান আরো বাড়িয়ে তুলবে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে একে অন্যের কাছে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। কভিডের প্রাদুর্ভাবের পর নয়াদিল্লির কাছে আঞ্চলিক ভূরাজনীতির বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল ভারতীয় কোম্পানি সেরাম ইনস্টিটিউটের উৎপাদিত টিকা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সে সময় আকস্মিকভাবেই টিকার কাঁচামাল রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এতে বিভিন্ন দেশে প্রতিশ্রুত টিকা সরবরাহ করা দূরের কথা, নিজ দেশে কভিডের প্রাদুর্ভাব বাড়া সত্ত্বেও স্থানীয় চাহিদা পূরণই মুশকিল হয়ে ওঠে ভারতের জন্য। অন্যদিকে এর ফলে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোয় টিকার সরবরাহ বাড়িয়ে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে নিজের প্রভাব আরো শক্ত করে তোলার সুযোগ পায় চীন।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবেলায় সেখানে ইসরায়েলের সঙ্গে অঞ্চলভুক্ত অন্যান্য দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করে আনার উদ্যোগ নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে সেখানে জ্বালানি তেলের বড় ক্রেতা হিসেবে চীনকে প্রতিস্থাপনের জন্য বৃহৎ কোনো অর্থনীতির দেশকে প্রয়োজন ছিল ওয়াশিংটনের। আবার ভারতের নেইবারস ফার্স্ট (সবার আগে প্রতিবেশী) উদ্যোগ দক্ষিণ এশিয়ায় বেইজিংয়ের উচ্চাভিলাষী বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের (বিআরআই) সফল বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে বলেও প্রত্যাশা ছিল হোয়াইট হাউজের। ভারত নিয়ে দেশটির যাবতীয় প্রত্যাশাকে আরো জোরালো করে তোলে ২০২০ সালে গালওয়ানে চীন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষ এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রাক্কলন। এতে বলা হয়, আগামী দুই দশকে বৈশ্বিক জ্বালানি চাহিদা বৃদ্ধিতে ভারতের অবদানই হবে সবচেয়ে বেশি—২৫ শতাংশ।
তবে ২০২১ সালের শেষদিকে পরপর তিনটি ঘটনা ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে ওঠে। ওই সময়ে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সংযুক্ত আরব আমিরাতের খলিফা বন্দর ও এর আশপাশে চীনের গোপন সামরিক ফ্যাসিলিটির অবস্থান চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়। একই সময়ে আবার সৌদি আরবে চীনের সহায়তায় ব্যালিস্টিক মিসাইল নির্মাণের তথ্যও প্রকাশ হয়। কাছাকাছি সময়ের মধ্যে ভারত সফরে আসেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। সেখানে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আলোচনাকালে দুই দেশের মধ্যে ২৮টি বিনিয়োগ চুক্তির আয়োজন করেন তিনি। জ্বালানি তেল, প্রাকৃতিক গ্যাসসহ পেট্রোলিয়াম পণ্য ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রফতানি সংক্রান্ত এসব চুক্তির আওতায় ভারতে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সরবরাহে অঙ্গীকারবদ্ধ হয় রাশিয়া। আগে থেকেই ভারতের রুশ এস-৪০০ এয়ার ডিফেন্স মিসাইল সিস্টেম ক্রয় নিয়ে আপত্তি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। এর মধ্যেই আবার রাশিয়া থেকে অস্ত্র আমদানিতে নতুন করে চুক্তিবদ্ধ হয় ভারত। সে সময় ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা দেন, ‘আমরা ২০২৫ সালের মধ্যে (রাশিয়ার সঙ্গে) বাণিজ্যের আকার ৩ হাজার কোটি ডলার এবং বিনিয়োগের আকার ৫ হাজার কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য হাতে নিয়েছি।’
রুশ-ভারত মৈত্রী মার্কিন নীতিনির্ধারকদের জন্য আরো বড় অস্বস্তি তৈরি করে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা শুরুর পর। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার পর্যবেক্ষক সাইমন ওয়াটকিন্স চলতি সপ্তাহেই অয়েলপ্রাইসডটকমে প্রকাশিত এক পর্যবেক্ষণে এ প্রসঙ্গে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও মার্কিন মিত্ররা চেয়েছিল বিধিনিষেধের মাত্রা বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনৈতিক বিপর্যয় তৈরি করে ভ্লাদিমির পুতিনকে নিঃসঙ্গ করে ফেলতে। কিন্তু শিল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত বলছে, ২০২২ সালের শেষে রাশিয়া থেকে ভারতের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি বেড়েছে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় সাত গুণে—দৈনিক সাত লাখ ব্যারেলে। এক মাস আগেই রুশ এলএনজি জায়ান্ট নোভাটেক জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি ভারতীয় গ্যাস কোম্পানিগুলোর সঙ্গে এলএনজিসংশ্লিষ্ট যেকোনো মেয়াদি চুক্তিতে দাম হিসেবে রুপি গ্রহণ করতে প্রস্তুত। নোভাটেক চেয়ারম্যান লিওনিদ মিখেলসন জানিয়েছেন, তার কোম্পানি ভারতীয় গ্যাস খাতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান গেইলসহ অন্যান্য কোম্পানির সঙ্গে এরই মধ্যে এ-সংক্রান্ত আলোচনাও শুরু করেছে।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ভারত এখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে সরে যাচ্ছে কিনা বলে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন সাইমন ওয়াটকিন্স।