মানুষের আমিষের চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণ হয় ডালের মাধ্যমে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাবে, একজন মানুষকে দৈনিক অন্তত ৪৫ গ্রাম ডালশস্য খেতে হয়। তবে দেশে বর্তমানে ডালশস্যের প্রাপ্যতা রয়েছে মাথাপিছু গড়ে মাত্র ২৮ গ্রাম। সে হিসাবে এখনো ডালশস্যের প্রাপ্যতায় প্রায় ৩৮ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। গতকাল বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল মিলনায়তনে বিশ্ব ডাল দিবসের সেমিনারে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) থেকে উত্থাপিত এক প্রতিবেদনে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে ৭ লাখ ৯১ হাজার হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের ডালশস্য আবাদ করা হয়। এসব জমিতে ডাল উৎপাদন হয় প্রায় ৯ লাখ ৩১ হাজার টন। আর জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার পরিসংখ্যানে, মাথাপিছু ৪৫ গ্রাম অনুযায়ী দেশে ডালের চাহিদা রয়েছে ২৮ লাখ টন। কিন্তু দেশে বর্তমানে ডালশস্যের প্রাপ্যতায় মাথাপিছু গড়ে ১৭ গ্রামের ঘাটতি রয়েছে। ডালে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে হলে আরো অন্তত ১৯ লাখ টন ডাল উৎপাদন বাড়াতে হবে বলে বারির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
দেশে ডালশস্যের মোট চাহিদার ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে ডালজাতীয় শস্য আমদানি করা হয়েছে ১৭ লাখ ৬৬ হাজার ২৩৮ টন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৮১ হাজার ১৬৭ টন। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে ডালশস্য আমদানি প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। আমদানি ডালশস্যের অর্ধেকই মসুর ডাল ও ছোলা। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪ লাখ ৩৬ হাজার ৬৩০ টন মসুর ডাল এবং ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৮০৫ টন ছোলা আমদানি করতে হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ডালশস্য আমদানিতে শুধু ২০২০-২১ অর্থবছরেই ৫ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। আবার ২০১৭-১৮ অর্থবছরে খরচ হয় ৩ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬ হাজার ১৮৫ কোটি টাকার ডালশস্য আমদানির প্রক্ষেপণ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্রমাগতভাবে দেশে আবাদি জমির পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। ফলে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার পুষ্টিনিরাপত্তার জন্য উচ্চফলনশীল জাতের ডালশস্য উদ্ভাবন, সম্প্রসারণ ও ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। এ শস্যবিন্যাসে ডাল ফসলের আবাদ সম্প্রসারণের সুযোগ সীমিত। তবে বৃহত্তর বরেন্দ্র অঞ্চল, চরাঞ্চল, পাহাড়ি অঞ্চল, উপকূলীয় অঞ্চল, রেলসড়ক ও রাস্তার ধারে এবং বসতবাড়িতে উপযুক্ততা বিবেচনায় ডাল ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি ও সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন মাঠশস্য ও ফল বাগানে ডাল ফসলকে মিশ্র ফসল ও আন্তঃফসল হিসেবে চাষের মাধ্যমে ডালের উৎপাদন বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক দেবাশীষ সরকার বলেন, ‘বর্তমানে জাতীয়ভাবে গড় উৎপাদন প্রতি হেক্টরে ১ দশমিক ২ টন। আধুনিক জাত ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ২ থেকে ২ দশমিক ৫ টন হেক্টরপ্রতি ডালের ফলন নিশ্চিত করা সম্ভব। তাহলে স্বল্প জমি থেকেই বেশি ডাল উৎপাদিত হবে। খরিপ-১ ও খরিপ-২-এ যদি কোনো জাত উদ্ভাবন করা যায় এবং লোকাল জাতগুলো তুলে নিয়ে আধুনিক জাতগুলো মানুষের হাতে তুলে দিতে পারলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব হবে।’
কৃষি সচিব ওয়াহিদা আক্তার বলেন, ‘বর্তমান সরকারের কৃষিবান্ধব নীতির কারণে গত ১৪ বছরে ডালের উৎপাদন প্রায় চারগুণ বেড়েছে। দেশে বর্তমানে ডাল উৎপাদন হয় প্রায় ১০ লাখ টন। কিন্তু ডালের চাহিদা বছরে প্রায় ২৬ লাখ টন। ফলে প্রতি বছর প্রায় ১৩-১৪ লাখ টন ডাল আমদানি করতে হয়। এতে ৬-৭ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়। ভাত আমাদের প্রধান খাদ্য, এটি উৎপাদনে গুরুত্ব বেশি দিতে হয়। ধানের সঙ্গে ডালসহ অন্যান্য ফসল প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। সেজন্য আমরা ধানের উৎপাদন না কমিয়ে ডালের উৎপাদন বাড়াতে গুরুত্ব দিচ্ছি।’
তেলশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধির উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘এ বছর যেমন আমরা ধানের উৎপাদন না কমিয়েই ২ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর বেশি জমিতে সরিষা আবাদ বাড়াতে পেরেছি, তেমনি ডালের উৎপাদন বাড়াতেও সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। যাতে বছরে ১৩-১৪ লাখ টন ডাল উৎপাদন করতে পারি, তাতে আমদানিনির্ভরতা অনেকটা হ্রাস পাবে।’