সাধারণ অর্থে নীতিহীনতাকে দুর্নীতি হিসেবে অভিহিত করা হলেও রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে সুশাসনের অভাবকে দুর্নীতি বোঝায়। এক্ষেত্রে আর্থিক অনিয়ম, অপচয়, সরকারি অফিসে ঘুসের বিনিময়ে সেবা প্রাপ্তি ইত্যাদি অভিযোগের পাশাপাশি স্বজনপ্রীতি, আইন প্রয়োগে ঘাটতি এবং নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতে জবাবদিহির ঘাটতি থাকলে তা দুর্নীতির আওতায় পড়ে। তবে দুর্নীতি সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লেও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্নীতির জন্য বেশি দায়ী করা হয়। কেননা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের প্রদত্ত করের টাকায় পরিচালিত হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে জনগণের কাছে দায়বদ্ধতার বিষয়টি থাকায় আন্তর্জাতিকভাবেও রাষ্ট্রগুলোর সরকারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনাসংক্রান্ত স্বচ্ছতার বিষয়ে জোর দেয়া হয়।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, জার্মানির বার্লিনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) করা দুর্নীতি ধারণা সূচকে এক ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ। উল্লেখ্য, দুর্নীতি সূচকে এক ধাপ অবনতি হয়ে বাংলাদেশ ২০২১ সালে বিশ্বে ১৩তম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ থেকে ২০২২ সালে নিম্নক্রম অনুযায়ী ১২তম অবস্থানে আসে। ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২-এ ১ পয়েন্ট কম স্কোর করে ১০০-তে বাংলাদেশের স্কোর ২৫। ৩১ জানুয়ারি সংস্থাটি একযোগে বিশ্বের ১৮০টি দেশের দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) প্রকাশ করে। সিপিআইয়ে বাংলাদেশের এ অবস্থান উঠে আসে।
এক্ষেত্রে সিপিআই অনুযায়ী শূন্য থেকে ১০০ স্কেলে টানা চার বছর স্কোর অপরিবর্তিত ২৬ থাকার পর ২০২২-এর সূচকে আরো ১ পয়েন্ট কমে ১২তম সর্বনিম্ন ২৫ স্কোর করেছে বাংলাদেশ। ২০১২ সাল থেকে দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে এবারো বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। টিআইয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবির) আশঙ্কা, ২০১২-২২ মেয়াদের দৃশ্যমান ধারা অব্যাহত থাকলেও বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার সর্বনিম্ন অবস্থানে অবনমনের সম্ভাবনার সম্মুখীন। দক্ষিণ এশিয়ায় আটটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ দ্বিতীয় সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে।
আমরা অতীতে টিআইয়ের দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশকে শীর্ষ অবস্থানে দেখতে পেয়েছি। তার পর থেকে এক্ষেত্রে সূচকগত অবস্থানের উন্নতি হলেও দুর্নীতির অবস্থান অপরিবর্তনীয় রয়েছে এমন পর্যবেক্ষণ সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল। যখন টিআইয়ের জরিপে বারবার বাংলাদেশ শীর্ষে অবস্থান করেছে, সে সময়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম যাচাই করে অস্বচ্ছতার প্রমাণ মেলেনি। যদিও সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাদের সূচকগুলো তৈরি করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছিল, কিন্তু রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যম সঠিক দায়িত্ব পালন করলে সেটিকে যে অবজ্ঞা করা যায় না তা আরেকবার প্রমাণ হয়েছে।
তবে শীর্ষস্থান থেকে ১২তম অবস্থানে আসাকে কি সত্যিকার অর্থে উন্নতি বলা যাবে? এর আগে এক ধাপ উন্নতির ক্ষেত্রেও এ কথাটি বলা হয়েছে। বস্তুত সূচকের ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী (ভালো থেকে খারাপ) বাংলাদেশের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। সামগ্রিকভাবে টিআইয়ের তিন সূচকেই বাংলাদেশে দুর্নীতি কমেনি। করোনাকালীন স্বাস্থ্য খাতসহ বিভিন্ন জরুরি সেবায় যে দুর্নীতি হয়েছে, এ সূচকে তার প্রতিফলন রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয় দুর্নীতি কমানোর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা সবচেয়ে জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা মত দেন। কারণ ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করলে তখন দুর্নীতি করা অপেক্ষাকৃত সহজ হয় বলে অভিযোগ ওঠে, যা ক্ষমতার বলয়ের বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে সম্ভবপর নয় বলে ধরে নেয়া হয়। তবে ‘সুযোগের অভাবে সৎ’ বাক্যটি দুর্নীতিপ্রবণ মানুষের বেলায় গণ্য করা হয়। এক্ষেত্রে মানুষ মাত্রই দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়তে পারে এমন প্রবণতাকে অস্বীকার করার উপায় থাকে না। যে কারণে ধর্ম এবং সামাজিক অনুশাসনে মানুষকে সৎ পথে চলার তাগিদ দেয়া হয়েছে। আর অর্থের লোভেই মূলত মানুষ দুর্নীতির পথে পা বাড়ায়। তাই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কাঠামোতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
এজন্য আইনের প্রয়োগ যথাযথ না হওয়ার অভিযোগ তুলেছে টিআইবি। সেই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টিও তুলে আনা হয়েছে। তাছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালিত না হওয়া এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ভূমিকা পালনকারী কর্মকর্তাদের নাজেহাল হওয়ার প্রেক্ষাপট টিআইবি উল্লেখ করেছে। শুধু তা-ই নয়, দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পদোন্নতির ফলে দুর্নীতির সহায়ক পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে টিআইবি মত দিয়েছে।
সামগ্রিক বিচারে টিআইবির অভিযোগগুলো অস্বীকার করার উপায় নেই। কারণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয় জবাবদিহির অভাব এবং আর্থিক খাতে একের পর এক কেলেঙ্কারি ও জালিয়াতির ঘটনা ঘটলেও বিচারের আওতায় আনার উদাহরণ না থাকার অভিযোগ সমাজচিন্তকরা এরই মধ্যে তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে গত তিন বছরে দুর্নীতির প্রতি শূন্য সহনশীলতা চর্চার জন্য যে সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল, সে সময়টিতে দুর্নীতিবিরোধী ঘোষণাকে চর্চায় রূপ দেয়ার যথাযথ কার্যক্রম দৃশ্যমান হয়নি। উপরন্তু সে মেয়াদে দুর্নীতির ব্যাপকতা আরো বিস্তৃত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে এ ঘোষণা বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্তদের দুর্নীতির সঙ্গে যোগসাজশ ও সহায়তার প্রমাণ পাওয়া যায়। এছাড়া দুর্নীতির সুবিধাভোগীরা অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়ার ফলে বিচারহীনতার বিষয়টিও দৃশ্যমান।
এভাবে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি প্রবেশ করায় জাতিগতভাবে আমরা একটি অনিশ্চয়তার মধ্যে উপনীত হয়েছি। কারণ ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ ব্যবস্থার জন্য দুর্নীতিমুক্ত স্বচ্ছ সমাজ বিনির্মাণ প্রয়োজন। সেজন্য সমাজের ভেতর থেকেই সামগ্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। এজন্য দুর্নীতিবিরোধী স্বচ্ছ মানসিকতা তৈরিতে পরিবার থেকেই শিশুকে শিক্ষা দিতে হবে। আর রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে দুর্নীতিকে পৃষ্ঠপোষকতা যেন না করা হয়, সেদিকে লক্ষ রাখা প্রয়োজন। দুর্নীতি প্রতিরোধে টিআই যে সুপারিশগুলো করেছে তা আমলে নিলে রাষ্ট্র লাভবান হবে বলে আমরা মনে করি। এজন্য দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দুদককে আরো স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া এবং মতপ্রকাশে গণমাধ্যমকে অবাধ সুযোগ প্রদান ও সক্রিয় নাগরিক সমাজ বিকাশে উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকা জরুরি। আমরা প্রত্যাশা করব, নীতি-নির্ধারকদের সদিচ্ছার বদৌলতে দুর্নীতি ভবিষ্যতে কমবে। এজন্য জনগণের প্রতি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তরিক দায়বদ্ধতার বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে দুর্নীতিকে ‘না’ বলতে সর্বস্তরের নাগরিকদেরও স্বতঃস্ফূর্ত উদার মানসিকতা জরুরি। রাষ্ট্র ও জনগণের সম্মিলিত প্রয়াসে দেশে দুর্নীতির পরিমাণ কমে আসবে সেটিই আমাদের প্রত্যাশা। বস্তুত দুর্নীতিপ্রবণ পরিবেশ থেকে উত্তরণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিমূলক ভূমিকা এবং জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের পারস্পরিক ন্যায্য অধিকার সম্পর্কে স্বচ্ছতা নিশ্চিত একান্ত অপরিহার্য।