দেশের অন্যতম বৃহৎ কনগ্লোমারেট স্কয়ার গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা স্যামসন এইচ চৌধুরী। তার মৃত্যুর ১১ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। তার প্রয়াণের সময় ২০১২ হিসাব বছরে স্কয়ারের তালিকাভুক্ত দুই কোম্পানি স্কয়ার ফার্মা ও স্কয়ার টেক্সটাইলসের নিট বার্ষিক আয়ের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ১৪৮ কোটি টাকার বেশি। এরপর প্রায় এক যুগে গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শুধু তালিকাভুক্ত দুই কোম্পানির আয় বেড়েছে ২৪০ শতাংশের বেশি। বর্তমানে গোটা গ্রুপের আয় ছাড়িয়েছে ১১ হাজার কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠান-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রয়াত বাবার মূল্যবোধ সঙ্গে নিয়েই গ্রুপটিকে এগিয়ে নিচ্ছেন স্যামসন এইচ চৌধুরীর সন্তানরা। তাদের নিজস্ব কৌশলের পাশাপাশি পিতার মূল্যবোধের ভিত্তিতেই বড় হচ্ছে স্কয়ার গ্রুপ।
গোপালগঞ্জের অরুণাকান্দিতে ১৯২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন স্যামসন এইচ চৌধুরী। হাইস্কুল জীবন শুরু হয় ১৯৩৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিষ্ণুপুরে শিক্ষা সংঘে। ১৯৩৩ সালে উন্নততর শিক্ষা অর্জনের জন্য স্যামসন এইচ চৌধুরী ময়মনসিংহ ভিক্টোরিয়া মিশন স্কুলে ভর্তি হন চতুর্থ শ্রেণীতে। ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ১৯৪৩ সালে।
বিভিন্ন মাধ্যমে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৩ সালেই রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভিতে যোগ দেন স্যামসন এইচ চৌধুরী। ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে নৌ-বিদ্রোহে অংশ নেন ১৯৪৫ সালে। একপর্যায়ে চাকরি জীবন শুরু করেন ডাক বিভাগে। ১৯৫২ সালে ডাক বিভাগের চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। বাবার পরামর্শে চালু করেন ইসন্স (ইয়াকুব অ্যান্ড সন্স) নামে একটি ওষুধের দোকান। ১৯৫৮ সালে তিন সহযাত্রী ডা. কাজী হারুনর রশিদ, ডা. পরিতোষ কুমার সাহা ও রাধিকামোহন রায়সহ চারজন মিলে পাবনা শহরের শালগাড়িয়া মৌজায় স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস নামে ছোট আকারে স্থাপন করেন একটি ওষুধ প্রস্তুত কারখানা। সেখান থেকে ব্যবসা ও ব্যবসার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হতে হতে বর্তমান আকার নিয়েছে স্কয়ার গ্রুপ।
স্কয়ার গ্রুপের অনেক কর্মীই আছেন, যাদের পেশাগত জীবনের শুরু ও বিকাশ ঘটেছে স্যামসন এইচ চৌধুরীর সান্নিধ্যে। গ্রুপটির এমন কয়েকজন প্রাক্তন ও বর্তমান কর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বণিক বার্তা। তারা বলেছেন, স্যামসান এইচ চৌধুরী ছিলেন প্রকৃত অর্থেই একজন উদ্যোক্তা। ব্যবসা জীবনের পথযাত্রায় অনেক বিষয়ে তার ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবে ধরা দিয়েছে। এর একটি উদাহরণ হলো বাংলাদেশে তরল ওষুধ বাজারজাতে পিইটি (প্লাস্টিক) বোতলের ব্যবহার। স্যামসন এইচ চৌধুরীর হাত ধরে এ ধারণার বাস্তবায়ন দেশের ওষুধ শিল্পে নতুন যুগের সূচনা করে। ওই সময় কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অনেকেই পিইটি বোতলের ব্যবহারের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার আগে আপত্তি জানিয়েছিলেন। কিন্তু পরে তারাই পিইটি বোতল ব্যবহারের সফল বাস্তবায়নের গর্বিত অংশীদার হয়েছেন।
সাবেক কর্মীরা স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, ব্যবসাসংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রচুর বই পড়ার চর্চা নিজের মধ্যে গড়ে তুলেছিলেন স্যামসন এইচ চৌধুরী। বিশ্বের কোথায় কোন ওষুধ বেশি চলছে, কোন চিকিৎসকদের কাছে কী ধরনের প্রডাক্ট বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে—এ বিষয়গুলো সম্পর্কে গভীর ধারণা রাখতেন তিনি। নিজের পড়ার পাশাপাশি কর্মীদেরও পড়তে বাধ্য করতেন স্যামসন এইচ চৌধুরী। ওষুধ সম্পর্কে হালনাগাদ পরিস্থিতি ও ধারণা উন্নয়নে বিভিন্ন জার্নাল নিজে কিনে কর্মীদের দিতেন। পণ্যের বিষয়ে এত গভীর পর্যায়ে উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ততা কমই দেখা যায় বাংলাদেশে। এভাবে নিজে পড়া ও কর্মীদের পড়ানো স্যামসন এইচ চৌধুরীর আবেগের জায়গা ছিল।
স্যামসন এইচ চৌধুরীর একটা প্যাশনের জায়গা ছিল পণ্যের ব্র্যান্ড নেম বা নাম—জানিয়ে সাবেক এক কর্মী বলেছেন, এ বিষয়ে তিনি অনেক বেশি মাথা ঘামাতেন। স্কয়ারের অনেক ওষুধ পণ্যের ব্র্যান্ড নেম স্যামসন এইচ চৌধুরীর দেয়া। এ বিষয়ে তার দখল ও চর্চা শেষ পর্যন্ত ধরে রেখেছিলেন। বাজারে ওই ব্র্যান্ডের গ্রহণযোগ্যতাও ভালো ছিল। এভাবে অনেক সূক্ষ্মভাবে কর্মকর্তাদের গাইড করতেন স্যামসন এইচ চৌধুরী। কর্মীদের কাজ করার সুযোগ ও স্বাধীনতা দিতেন তিনি। তার সুদূরপ্রসারী মনোভাবের প্রতিফলন পাওয়া যায় সন্তানদের কর্মকাণ্ডে। তপন চৌধুরী সন্তান বলেই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পাবেন, এমন ধারণার বিমুখ ছিলেন তিনি। ফলে মাঠ পর্যায়ে দীর্ঘদিন সন্তানকে কাজ করিয়ে গোটা বিষয়টি আয়ত্তে আসার পরই দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। সন্তানদের তিনি বাধ্য করতেন হাতে-কলমে ব্যবসা বুঝে নিতে।
স্যামসন এইচ চৌধুরীর দর্শন সবসময়ই স্কয়ারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ থাকত উল্লেখ করে বর্তমান এক কর্মী বণিক বার্তাকে বলেন, প্রয়াণের পরও নতুন যত কিছুই হোক না কেন, সেক্ষেত্রে স্যামসন এইচ চৌধুরী বিষয়টি কেমন ভাবতেন এ বিবেচনা সন্তানদের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে। তারা সচেতনভাবে বিষয়টি এত বছর পরও ধরে রেখেছেন। বিভিন্ন সময়ে স্যামসন এইচ চৌধুরীর বলা কথা যেমন ‘তুমি যদি কখনো থেমে যাও, পেছনের কেউ না কেউ তোমাকে অতিক্রম করবেই’—এ ধরনের বিভিন্ন কথা তার উক্তি হিসেবে সম্মেলনসহ প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে দর্শন হিসেবে অনুসরণ করা হয়। বলা যায়, বাবার মূল্যবোধ সঙ্গে নিয়েই স্কয়ার গ্রুপ বড় হচ্ছে।
বাবার মূল্যবোধ সঙ্গে বহন করে প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি প্রায়ই উল্লেখ করেন স্কয়ারের কর্ণধারদের অন্যতম তপন চৌধুরী। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিমত্তার জায়গাগুলো ধরে রাখার বিষয়টি আমাদের দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এ চর্চা আমরা করে আসছি। এ চর্চা আমাদের বাবার সময় থেকেই। দিন শেষে দেনার মধ্যে না থাকার চেষ্টা করে যাওয়াই তিনি আমাদের শিখিয়েছেন। এ চর্চা ধরে রাখতে পারার কারণেই ব্যাংক আমাদের নয়, বরং আমরাই ব্যাংককে ডিক্টেট করার সক্ষমতা রাখি। এটা আমাদের অনেক বড় স্ট্রেনথ। এ শক্তি আমাদের আরো বড় প্রবৃদ্ধি অর্জনেও সহায়তা করছে।’
স্যামসন এইচ চৌধুরীর সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তপন চৌধুরী বলেন, ‘পড়ালেখা শেষ করে যখন ব্যবসায় আসি তখন বয়স কম ছিল। অনেক ব্যাপারেই মনে হতো উনি পুরনো দিনের মানুষ...ফ্রম দ্য ওল্ড স্কুল অব থটস...এজন্য ভ্যালুজ নিয়ে অনেক বেশি কথাবার্তা বলেন, আইনকানুন নিয়েও বিভিন্ন কথা বলেন। অথচ আমি দেখতাম, ওই সময় যারা আমাদের কম্পিটিটর ছিল তারা অনেক ক্ষেত্রে কম্প্রোমাইজ করছে। ব্যবসার প্রফিট, লয়্যালটি এ বিষয়গুলোতে উনি ছিলেন কঠোর।’
তপন চৌধুরী বলেন, ‘বাবা বলতেন, তোমার সত্ভাবে কাজ করা উচিত, তুমি সফল হবেই। তোমাকে ধৈর্য ধরতে হবে, সত্ভাবে পরিশ্রম করে যাবে। বাবার ওই বিষয়গুলো ধমনিতে রয়ে গেছে। সবসময় চিন্তা করতেন কোন উপায়ে ব্যবসায় নিরাপদ থাকা যাবে? দিনে অনেকবার দেখতেন আয় কেমন হচ্ছে, ওওএস (আউট অব স্পেসিফিকেশন) কোন জায়গাগুলোয় হচ্ছে, কিন্তু মানে কোনো ধরনের আপস করতেন না। যে পণ্যটি কেনা হচ্ছে সেটি সর্বোচ্চ কম্পিটিটিভ প্রাইসে কেনা হচ্ছে কিনা, ওল্ড মার্কেটে কী ধরনের প্রাইস আছে—এ বিষয়গুলোতে সচেতন থাকতে বলতেন। ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্য খুবই সেনসিটিভ পণ্য। সস্তায় তো অনেক কিছুই পাওয়া যায়, তাই সোর্সগুলো আবার অডিট করতে হয়। এ বিষয়গুলো সবসময় মাথার মধ্যে ছিল। ইচ্ছা করলেই নীতি বিসর্জন দেয়া যায় না বা কম্প্রোমাইজ করা যায় না। এই বিষয়গুলো রক্তে রয়ে গেছে, কখনো বদলাতে পারব না।’
পিতার মূল্যবোধ বহন করে সেই আদর্শে কোম্পানি পরিচালনার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে স্কয়ারের তালিকাভুক্ত কোম্পানির আয় ও মুনাফার চিত্রে। ২০১১-১২ অর্থবছরে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের নিট টার্নওভার বা আয়ের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৬০৫ কোটি ৪৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা। গত ২০২১-২২ অর্থবছরে আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৭৫৯ কোটি ৭৯ লাখ ৪১ হাজার টাকায়। এ হিসাবে গত ১১ বছরে কোম্পানিটির আয় ২৫৮ শতাংশ বেড়েছে।
২০১১-১২ অর্থবছরে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের কর-পরবর্তী নিট মুনাফার পরিমাণ ছিল ২৮৯ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ হাজার ৬৪১ কোটি ৭৪ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। এ হিসেবে স্কয়ার ফার্মার আয় গত ১১ বছরে বেড়েছে ৪৬৬ শতাংশ।
তালিকাভুক্ত আরেক কোম্পানি বস্ত্র খাতের স্কয়ার টেক্সটাইলের আয় বা টার্নওভার ২০১২ সালে ছিল ৫৪৩ কোটি ১৪ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে আয় হয়েছে ১ হাজার ৫৬২ কোটি ৪৩ লাখ ২ হাজার টাকা। এ হিসাবে ১১ বছরে আয় বেড়েছে ১৮৭ শতাংশের বেশি।
২০১২ সালে স্কয়ার টেক্সটাইলসের কর-পরবর্তী মুনাফার পরিমাণ ছিল ৫৮ কোটি ৮৭ লাখ ১৫ হাজার টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে কর-পরবর্তী মুনাফা হয়েছে ১৮০ কোটি ৬৩ লাখ ৫ হাজার টাকা। এ হিসাবে কর-পরবর্তী মুনাফা বেড়েছে ২০৬ শতাংশের বেশি।
পঞ্চাশের দশকের শেষ ভাগে স্যামসন এইচ চৌধুরীর উদ্যোগে যাত্রা করা ছোট উদ্যোগ আজ বিরাট প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। ওষুধ, বস্ত্র খাত, টয়লেট্রিজ পণ্য উৎপাদন, গণমাধ্যমসহ স্কয়ারের বিনিয়োগের গণ্ডি এখন দেশের সীমানা ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশের বাইরে আফ্রিকার দেশ কেনিয়ায় ওষুধ উৎপাদনকারী কারখানা প্রতিষ্ঠা করেছে স্কয়ার। ২০১২ সালে প্রয়াণ হয় স্যামসন এইচ চৌধুরীর। এরপর গত এক দশকে স্কয়ার গ্রুপের ব্যবসার আকার বেড়েছে বহুগুণ। বর্তমানে স্কয়ার গ্রুপের বার্ষিক টার্নওভার ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি। দ্বিতীয় প্রজন্মের এ দক্ষতা প্রদর্শনের পর প্রতিষ্ঠানটিতে এখন যুক্ত হয়েছে তৃতীয় প্রজন্ম। কর্মী সংখ্যা ২৮ হাজারেরও বেশি।