জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে বৈশ্বিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমেই ঝুঁকছে বৈদ্যুতিক যানবাহনের (ইভি) দিকে। কিন্তু চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতাসহ বৈশ্বিক নানা প্রেক্ষিত বাদ সাধছে সে উদ্যোগে। এ কারণেই শীর্ষস্থানীয় গাড়ি নির্মাতা ও চিপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সতর্ক করে দিয়ে বলছে, আগামী বছর ইভিতে রূপান্তর প্রক্রিয়া চিপ বা সেমিকন্ডাক্টর ঘাটতির কারণে বাধাগ্রস্ত হবে। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিপমেকার ওনসেমির প্রধান নির্বাহী হাসান আল-খৌরি বলেছেন, সিলিকন কার্বাইড (এসআইসি) চিপ ও বৈদ্যুতিক গাড়িতে বহুল ব্যবহূত উন্নত পাওয়ার সেমিকন্ডাক্টরের ব্যাপক ও শক্তিশালী চাহিদার কারণে ২০২৩ সালের শেষ পর্যন্ত সব সোলড আউট বা বিক্রি হয়ে গেছে।
এদিকে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গাড়ির চিপ নির্মাতাদের একজন বলেন, ২০২৩ সাল শেষ হওয়ার আগে আপনি এখন আর কিছুই করতে পারবেন না। তবে আমরা আমাদের গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে ২০২৩ সালজুড়ে তিন মাস অন্তর নতুন সক্ষমতা যোগ করব।
একইভাবে গাড়ির চিপ প্রস্তুতকারক ইনফিনিওনের প্রধান নির্বাহী ইহান হ্যানেবেক জানান, আমি বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতির আশঙ্কা করছি।
গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোও সমস্যা মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। আয়ের দিক থেকে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম নির্মাতা স্টেলান্টিসের প্রধান নির্বাহী কার্লোস টাভারেস বলেছেন, চিপবিষয়ক বিধিনিষেধ আগামী বছর গাড়ি নির্মাণ শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
তবে জার্মান চিপমেকার প্রতিষ্ঠানটি ৫০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। এদিকে ওনসেমির প্রধান নির্বাহী হাসান আল-খৌরি আরো জানান, তাদের প্রতিষ্ঠান চেক প্রজাতন্ত্রের রোজনভ, দক্ষিণ কোরিয়ার বুসান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ারের প্লান্টে উৎপাদন সম্প্রসারণ করছে। এতে আগামী বছর তাদের উৎপাদন ৩০ শতাংশ বাড়বে। তিনি আরো বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির অধীনে আমাদের অনেক গ্রাহক অপেক্ষা করে আছে। আমরা প্রথমে তাদের সহযোগিতা করার সক্ষমতা তৈরি করছি।’
জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত গাড়িগুলোকে বৈদ্যুতিক গাড়িতে রূপান্তরের কারণে গাড়ির চিপের চাহিদা প্রাথমিকভাবে বেড়েছে কয়েক ধাপ। তাছাড়া আগামীতে জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত ইঞ্জিনগুলো পর্যায়ক্রমে বন্ধ হওয়ার প্রক্রিয়াও ত্বরান্বিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ অবস্থায় চিপের চাহিদা ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে।
সিলিকন কার্বাইড চিপ তৈরির অন্যতম উপকরণ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান উল্ফস্পিড। এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক গ্রেগ লো বলেছেন, ‘জীবাশ্ম জ্বালানি ইঞ্জিন থেকে বৈদ্যুতিক যানবাহনে স্থানান্তর প্রক্রিয়াটি অপ্রতিরোধ্য, এটিকে আর কোনোভাবেই থামানো যাবে না।’
এদিকে গাড়ির চিপ উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়টি ঘিরে আরো একটি অস্পষ্টতা বিদ্যমান। চাইলেই খাতটি উৎপাদন বাড়াতে পারবে কিনা, তা নিয়েও চিন্তার খানিকটা অবকাশ রয়েছে। কেননা স্মার্টফোন ও পিসির জন্যও সেমিকন্ডাক্টরের চাহিদা বিদ্যমান। এ অবস্থান চিপ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিক কোনদিকে গুরুত্ব দেবে বা প্রয়োজনীয় কাঁচামালের বন্দোবস্ত করতে সক্ষম হবে, তা ঘিরেও তৈরি হয়েছে এক ধরনের অনিশ্চয়তা বা বৈপরীত্য।
তাইওয়ানভিত্তিক সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি (টিএসএমসি), ইন্টেল
ও স্যামসাং—যারা স্মার্টফোন ও পিসির জন্যও চিপ সরবরাহ করে—এরই মধ্যেই চাহিদা পতনের মুখোমুখি।
বিশ্বের বৃহত্তম চুক্তিভিক্তিক চিপমেকার টিএসএমসি—যারা অ্যাপল, গুগল ও অ্যামাজনের মতো সংস্থাগুলোক চিফ সরবরাহ করে—চলতি বছর পরিকল্পিত বিনিয়োগ থেকে ১০ শতাংশ কমিয়ে ৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলার করেছে।