মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনধারণের সব ধরনের ব্যয় বেড়েছে। বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলছে, বর্তমানে ঢাকা শহরে চার সদস্যের একটি পরিবারের মাছ, মাংসসহ স্বাভাবিক পুষ্টিকর খাদ্যের চাহিদা মেটাতে মাসে ২৩ হাজার ৬৭৬ টাকা প্রয়োজন। তালিকা থেকে মাছ-মাংস বাদ দিলে এ প্রয়োজন দাঁড়ায় ৯ হাজার ৫৫৭ টাকায়। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘দেশের বেশির ভাগ শিল্পের কর্মীদের পক্ষে কেবল বেতনের অর্থ দিয়ে পুষ্টিকর খাদ্যের চাহিদা মেটানো সম্ভব না।’ গতকাল রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে সিপিডি আয়োজিত ‘সংকটে অর্থনীতি: কর্মপরিকল্পনা কী হতে পারে?’ শীর্ষক সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনে এসব তথ্য তুলে ধরেন তিনি।
সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহানের সভাপতিত্বে সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান। এছাড়া অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান হাবিব মনসুর, বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন, বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপালী হক চৌধুরী আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
মূল প্রবন্ধে ফাহমিদা খাতুন প্রায় ২০টি শিল্পের কর্মকর্তা ও শ্রমিকদের খাদ্যের চাহিদা মেটানোর সক্ষমতার চিত্র তুলে ধরেন। সেখানে দেখা যায়, সবগুলো শিল্পের কর্মকর্তা ও শ্রমিকদের চার সদস্যের পরিবারের জন্য রেগুলার ডায়েট বা মাছ ও মাংসসহ খাবারের চাহিদা মেটানোর সক্ষমতা নেই। মাছ-মাংস বাদ দিয়ে কম্প্রোমাইজড ডায়েটের চাহিদা মেটানোর সক্ষমতা আছে আটটি শিল্পের কর্মকর্তাদের এবং ছয়টি শিল্পের শ্রমিকদের।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘প্রত্যেক বছর ৫ শতাংশ বেতন বাড়লেও বেশির ভাগ শিল্পের কর্মীদের পক্ষে পুষ্টিকর খাদ্যের চাহিদা মেটানো সম্ভব না। এজন্য ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো উচিত।’
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, ইউক্রেন যুদ্ধ মূল্যস্ফীতির একটি কারণ হলেও এর আগে থেকেই অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ ছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার কারণে আমদানি পণ্যের দাম বাড়ছে, একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণভাবে যেসব পণ্য উৎপাদন হয় তার দামও বাড়ছে। বিশেষ করে চাল, আটা, চিনি, ভোজ্যতেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কমলেও স্থানীয় বাজারে সেই প্রভাব নেই। অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদিত পণ্যের দামও কারণ ছাড়া ঊর্ধ্বমুখী। এখানে বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা কাজ করছে। দাম বৃদ্ধির কারণে স্বল্প ও নিম্ন আয়ের মানুষরা জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়ছে। লাগামহীন মূল্যস্ফীতির কারণে অনেকেই খাদ্য ব্যয় কমিয়ে আনতে খাবারের তালিকা থেকে বাদ দিচ্ছেন মাছ-মাংসসহ বিভিন্ন আমিষ।
কভিড মহামারী বা ইউরোপে যুদ্ধের কারণে ব্যাংক খাতে সংকট দেখা দেয়নি বলেও উল্লেখ করা হয় মূল প্রবন্ধে। সেখানে বলা হয়, এ খাতের দুর্বলতা দীর্ঘদিনের। খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে, বিভিন্ন সূচকে দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। দুর্বল সুশাসন এবং সংস্কারের অভাবে এ খাত ক্রমান্বয়ে দুর্বল থেকে দুর্বলতর হচ্ছে। খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ব্যাংকগুলোয় মূলধনের ঘাটতি রয়েই যাবে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমে বেড়েই চলছে। বাস্তবে যেটা দেখানো হয়, খেলাপি ঋণের পরিমাণ তার চেয়েও বেশি। এটা অর্থনীতিবিদ ও আইএমএফের ভাষ্য।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় দক্ষতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত স্থিতিশীলতার জন্য অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে সবুজ উদ্যোগ বাড়ানোর বিকল্প নেই।’