সেচ, গৃহস্থালি কাজ ও শিল্প ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার ক্রমে বাড়ছে। মাটির নিচে পানির আধার সুরক্ষায়, গুণাগুণ বজায় রাখতে এবং ভূগর্ভস্থ পানি সংরক্ষণে প্রয়োজন সুষ্ঠু ও উন্নত পানি ব্যবস্থাপনা।
বিশুদ্ধ পানির বিশাল আধার ভূগর্ভস্থ পানি। বিশ্বের ৯৭ শতাংশ বিশুদ্ধ পানির উৎস এ ভূগর্ভস্থ পানি। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন কাজ, যেমন—খাওয়ার পানি, রান্না, ধোয়ামোছা, গোসলের কাজে আমরা বাসার কল খুললেই যে পানি পাই তার উৎস ভূগর্ভস্থ পানি।
ভূগর্ভস্থ পানি বলতে বোঝানো হয় মাটির নিচে অবস্থিত পানিকে। বৃষ্টির পানি মাটির স্তর ভেদ করে মাটির নিচে অবস্থিত পাথর ও শিলাখণ্ডের মাঝে জমা হয়ে তা ভূগর্ভস্থ পানি রূপে জমা হয়। এ ভূগর্ভস্থ পানি আমরা কুয়া বা পাম্পের সাহায্যে উত্তোলন করে ব্যবহার করি। কেবল দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন কাজেই নয়, সেচ ও শিল্প ক্ষেত্রে ব্যবহূত অধিকাংশ পানির জোগান আসে ভূগর্ভস্থ পানি থেকে। টেক্সটাইল ও চামড়া খাত উৎপাদন ক্ষেত্রে তাদের পানির চাহিদা মেটাতে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করে বেশি।
বিশ্বে সেচের জন্য ৪০ শতাংশ পানি ভূগর্ভস্থ থেকে ব্যবহার করা হলেও বাংলাদেশে ব্যবহূত হয় ৬০-৭০ শতাংশ। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশের বড় বড় নগরীগুলো বিশুদ্ধ পানির জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খাওয়ার পানি সরবরাহ করে ভূগর্ভস্থ পানি। আবার এ ভূগর্ভস্থ পানির ২৫ শতাংশ শিল্প খাতে ব্যবহার করা হয়, কিন্তু তা সত্ত্বেও আমাদের মধ্যে খুব অল্পসংখ্যক লোক মিলবে যারা এ ভূগর্ভস্থ পানি সম্পর্কে জানে।
এবারের বিশ্ব পানি দিবস ২০২২-এর প্রতিপাদ্য ছিল ‘ভূগর্ভস্থ পানি: অদৃশ্যকে দৃশ্যমান করো, যার মূল উদ্দেশ্য ভূগর্ভস্থ পানি সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করে একে টেকসই উন্নয়ন নীতির অন্তর্ভুক্ত করা।
এ অদেখা অথচ প্রয়োজনীয় ভূগর্ভস্থ পানির গুরুত্ব উপলব্ধি করার জন্য জানা প্রয়োজন আমাদের প্রতিদিনের কাজে এবং ব্যবহার্য জিনিসে কী পরিমাণ পানির ব্যবহার হয়। ওয়াটার ফুটপ্রিন্টের সাহায্যে তা সহজেই বোঝা যায়।
ওয়াটার ফুটপ্রিন্ট হলো একজন ব্যক্তি তার দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে যে পরিমাণ পানি ব্যবহার কিংবা দূষণ করে থাকে তার পরিমাপ। যেমন একটি টি-শার্ট তৈরি করতে প্রয়োজন পড়ে ৪ হাজার ৫১০ লিটার পানি কিংবা এক জোড়া জিন্স তৈরি করতে প্রয়োজন পড়ে ৯ হাজার ৫০৬ লিটার পানি। এ টি-শার্ট কিংবা জিন্স তৈরিতে যে পরিমাণ পানি ব্যবহার করা হয়েছে এবং যে পরিমাণ পানি ব্যবহার কিংবা দূষিত হয়েছে তার পরিমাপই হলো তাদের ওয়াটার ফুটপ্রিন্ট।
বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী তৈরি পোশাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানিকারক। মোট রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশই এ খাত থেকে আসে। গত সাত বছরে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প তার বার্ষিক আয় ১৯ বিলিয়ন থেকে ৩৪ বিলিয়ন বাড়িয়েছে, যা মোট আয় বৃদ্ধির ৭৯ শতাংশ [সূত্র: সেফটি ফার্স্ট: বাংলাদেশ গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রি রিবাউন্ডস (ifc.org)]।
যদিও বাংলাদেশ তার টেক্সটাইল শিল্পের
সঙ্গে অর্থনৈতিক
সমৃদ্ধির আলো দেখছে, কিন্তু
এ শিল্প
তার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতিদিন ব্যাপক
পরিমাণে ভূগর্ভস্থ
পানি উত্তোলন
করছে উৎপাদন
চাহিদা মেটাতে,
কিন্তু অধিকাংশ
ক্ষেত্রেই এ শিল্প খাতগুলো
অপরিকল্পিতভাবে এ ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করে। ‘বিনামূল্যে প্রচুর
পানি সরবরাহ
করা সম্ভব’,
শিল্প খাতগুলো
তাদের উৎপাদনের
চাহিদা মেটানোর
ক্ষেত্রে এ ধারা অনুসরণ
করে। ফলে আজ ভূগর্ভস্থ
পানির অস্তিত্ব
হুমকির মুখে।
দেখা দিচ্ছে
ভূগর্ভস্থ পানির
ব্যাপক সংকট।
সারা দেশেই
কমবেশি পানির
স্তর নিচে নামছে। তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ
করে দেখা যায়, ঢাকায়
প্রতি বছর ভূগর্ভস্থ পানির
স্তর ১০ ফুট করে নিচে নেমে যাচ্ছে। তাই ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার সময়ের
দাবি। ভূগর্ভস্থ
পানির রিজার্ভ
এবং একে টেকসই উন্নয়ন
নীতির অন্তর্ভুক্ত করা বর্তমানে একটি নতুন চ্যালেঞ্জ।
ভূগর্ভস্থ পানির রিজার্ভের সংরক্ষণ এবং দূষণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে ওয়াটার ফুটপ্রিন্টিং একটি দুর্দান্ত হাতিয়ার, কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন যথাযথ মনিটরিং এবং ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ওয়াটার ফুটপ্রিন্টং সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা।
যেকোনো শিল্পে ওয়াটার ফুটপ্রিন্ট প্রকৃতপক্ষে একটি সুপরিচিত করপোরেট পানি ব্যবস্থাপনা কৌশল বিকাশে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি সরবরাহ করে। শিল্প খাতগুলো শুরু থেকেই তাদের উৎপাদনে পানির ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করে আসছে, কিন্তু পানির সরবরাহ শৃঙ্খল বরাবরই তাদের কাছে অবহেলিত। বিশ্বব্যাপী নেতৃস্থানীয় সংস্থাগুলো ভূগর্ভস্থ পানিসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে আরবান ফুটপ্রিন্টের মতো ওয়াটার ফুটপ্রিন্টকে বিবেচনায় আনার প্রয়োজন অনুভব করছে।
বাংলাদেশ উচ্চাভিলাষী রফতানি আয়ের লক্ষ্য পূরণের পাশাপাশি দেশের সবার জন্য পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়। সেক্ষেত্রে শিল্প খাতে অবশ্যই উন্নত পানি ব্যবস্থাপনা এবং ক্লিনার উৎপাদন কৌশলের জন্য সক্ষমতা জোরদার করা চাই।
পরিশেষে পরিবেশবিদ কর্তৃক উল্লিখিত চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় প্রয়োজন ব্যাপক সমন্বয়। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির লাইসেন্সিং পদ্ধতির পরিবর্তন এবং বর্তমান পরিবেশগত আইন মেনে চলতে শিল্পের জন্য প্রণোদনা অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
আদরিন সারওয়ার ও ফারহানা হক: হাউজ অব ভলান্টিয়ার্স, বাংলাদেশ