ঋণ আদায় ত্বরান্বিত করতে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো (এনবিএফআই) নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট আইনের অধীনে চেক ডিজঅনার মামলা করে। সেই মামলায় আবার গ্রাহককে পাঠানো হয় কারাগারে। উচ্চ আদালত এক পর্যবেক্ষণে বলেছেন, চেক ডিজঅনার মামলায় কোনো ব্যক্তিকে কারাগারে পাঠানো সংবিধান পরিপন্থী। এটি সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। ঋণের অর্থ আদায়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থঋণ আদালতে মামলা করতে পারে। এজন্য চেক ডিজঅনারের মামলার সুযোগ নেই। চেক ডিজঅনার সংক্রান্ত কয়েকটি মামলা নিষ্পত্তি করে গতকাল বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন।
আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেছেন, নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট আইনের চেক ডিজঅনার সংক্রান্ত মামলায় কোনো ব্যক্তিকে জেলে বন্দি রাখা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা হরণের নামান্তর। তাই গ্রাহকদের বিরুদ্ধে চেক ডিজঅনারের মামলা করা যাবে না। যেসব মামলা বর্তমানে চলমান রয়েছে, সেগুলোও স্থগিত থাকবে। গ্রাহকদের দেয়া ঋণের বিপরীতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বীমা সুবিধা থাকতে হবে। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণের আলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে এ বিষয়ে নির্দেশনা জারি করতেও বলা হয়েছে।
আদালতের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আশেক মোমেন। আদালতের পর্যবেক্ষণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, গ্রাহকদের কাছ থেকে ঋণ আদায়ের জন্য অর্থঋণ আদালত হলো উপযুক্ত জায়গা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থঋণ আদালতে মামলা করার পরও চেক ডিজঅনার মামলা করে। এতে একজন ঋণগ্রহীতাকে অনেক বেশি হয়রানি হওয়ার পাশাপাশি কারাভোগও করতে হয়। এ বিষয়টিকে নির্দেশ করেই আদালতের পক্ষ থেকে বেশকিছু নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
আশেক মোমেন বলেন, আদালত বলেছেন—ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণের টাকা আদায়ে কেবল অর্থঋণ আদালতে মামলা করতে পারবে। চেক ডিজঅনার দেখিয়ে গ্রাহকদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা যাবে না। যেসব মামলা এরই মধ্যে দায়ের করা হয়েছে এবং চলমান আছে, সেগুলো স্থগিত থাকবে। এছাড়া ঋণের ইন্স্যুরেন্স কাভারেজ নিশ্চিত করাসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি বেশকিছু নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তবে আদালতের এ আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে বলে আশেক মোমেন নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ব্র্যাক ব্যাংকের মামলা নিষ্পত্তি করে দিয়ে উচ্চ আদালত এ নির্দেশনা দিয়েছেন। ব্যাংকটির পক্ষ থেকেও আপিল করা হবে বলে আমাদের জানানো হয়েছে। জানতে চাইলে ব্র্যাক ব্যাংকের আইনজীবী সাইফুজ্জামান তুহিন বলেন, হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে।
আদালত বলেছেন, ব্যাংকঋণের বিপরীতে যে চেক নিচ্ছে সেটা জামানত। বিনিময়যোগ্য দলিল নয়। জামানত হিসেবে রাখা সেই চেক দিয়ে চেক ডিজঅনার মামলা করা যাবে না। তাছাড়া ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ একটি চুক্তির মাধ্যমে নেয়া হয়ে থাকে। ব্যাংকের কিছু দুর্নীতিবাজ, অসাধু কর্মকর্তা নিজেদের স্বার্থে ও গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়নে চেকের অপব্যবহার করে মামলা করে। তাদের এ ব্যবহার দাদন ব্যবসায়ীদের মতো। ঋণের বিপরীতে ব্ল্যাংক চেক নেয়াটাই বেআইনি বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন উচ্চ আদালত। আদালত বলেছেন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে এ বেআইনি কাজ করে আসছে।
নিম্ন আদালতের প্রতি নির্দেশনা দিয়ে হাইকোর্ট বলেছেন, কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান যদি চেক ডিজঅনার মামলা করে, তাহলে আদালত তা সরাসরি খারিজ করে দেবেন। একই সঙ্গে তাদেরকে ঋণ আদায়ের জন্য অর্থঋণ আদালতে পাঠিয়ে দেবেন। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি হাইকোর্টের রায়ের আলোকে নির্দেশনা জারি করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এছাড়া সব ধরনের ঋণের বিপরীতে ইন্স্যুরেন্স কাভারেজ দিতেও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।