সরকারের নানা প্রণোদনা সত্ত্বেও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ছে না। ৮ লাখ ৭৪ হাজারের ওপর জনশক্তি রফতানি হলেও রেমিট্যান্স প্রবাহে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, রেমিট্যান্স কমার প্রধান কারণ মোবাইল ব্যাংকিং ও হুন্ডি। ডলারের বিনিময় হার নিয়ে অস্থিরতার সুযোগে হুন্ডির বাজার জমজমাট হয়ে ওঠায় অভিবাসীরা অবৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত হচ্ছেন। যেখানে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত সবার, সেখানে রেমিট্যান্স প্রবাহের অধোগতি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রবাসী আয়ই বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের দ্বিতীয় প্রধান উৎস। উদ্বেগের বিষয় হলো, আনুষ্ঠানিক খাতে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে সরকারের প্রণোদনা তেমন সুফল দিচ্ছে না। এর কারণ ডলারের দর। বাংলাদেশ ব্যাংক আনুষ্ঠানিক খাতে ডলারের দর নির্ধারণ করে দিয়েছে এবং সেটি একেক খাতের জন্য একেক রকম। অথচ ব্যাংকের বাইরে উচ্চ দরে ডলার লেনদেন হচ্ছে। তাছাড়া হয়রানি ও অধিক ব্যয়ের কারণে মানুষ ব্যাংক খাতে অর্থ পাঠাতে অনুৎসাহিত হচ্ছে। পাশাপাশি রেমিট্যান্স পাঠানোর নানা বিকল্প তৈরি হওয়ার প্রভাব পড়েছে আনুষ্ঠানিক খাতে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্টদের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কোথায় নীতি ও পরিকল্পনাগত ত্রুটি রয়েছে সেগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে সমাধানে মনোযোগী হওয়া একান্ত প্রয়োজন।
মহামারীকালে দেশে টাকা পাঠানোর অবৈধ চ্যানেল বন্ধ থাকায় ব্যাংকগুলো যে সুবিধা পাচ্ছিল, এখন আবার তা কমতে শুরু করেছে। করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় প্রবাসী কর্মীরা এখন আবার সেই অবৈধ চ্যানেলের দিকেই ঝুঁকতে শুরু করেছেন। বিদেশ থেকে দেশে টাকা পাঠাতে এজেন্টরা হাজারে ২০ টাকা চার্জ নেন, যা বাংলাদেশে ১০ থেকে ১৮ টাকা ৫০ পয়সা। বৈধভাবে দেশে টাকা পাঠাতে হাজারে ৩০-৬০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। অল্প খরচে টাকা পাঠানোর সুযোগ পেয়ে প্রবাসী কর্মীরা মোবাইল ব্যাংকিংকে বেছে নেন। বৈধ পথে টাকা পাঠালে ব্যাংকে গিয়ে টাকা তুলতে হয়, কিন্তু মোবাইলে পাঠানো টাকা স্বজনরা বাড়িতে বসেই পান। গ্রামাঞ্চলে থাকা প্রবাসীদের স্বজনকে কষ্ট করে ব্যাংকে যেতে হয় না। এ কারণে প্রবাসীরা অবৈধ জেনেও কিছুটা সাশ্রয়ের জন্য মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা পাঠান। খোলাবাজারে (কার্ব মার্কেট) ডলারের দর ব্যাংকের থেকে বেশি থাকায় হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে তুলনামূলক বেশি সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে অনেকেই এ অবৈধ পথে টাকা পাঠাচ্ছেন। অনেকে বিদেশে অতিরিক্ত সময় কাজ করেন। এ আয়ের বৈধ প্রমাণ তাদের নেই। এ কারণে চাইলেও ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে টাকা পাঠাতে পারেন না। তাই অবৈধ মোবাইল ব্যাংকিং বেছে নেন। তারা জানান, বিদেশে থাকা এজেন্টদের টাকা দিলে তাদের দেশে থাকা সহযোগীরা মোবাইল অ্যাকাউন্ট থেকে প্রবাসীদের স্বজনকে মোবাইল ব্যাংকে টাকা পাঠিয়ে দেন। আরেকটি বিপজ্জনক খবর হলো, দেশের বাইরে থাকা বাংলাদেশী প্রবাসীরা সরকারের বন্ড কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে আগের চেয়ে বন্ডের অর্থ বেশি ভাঙছেন তারা। সরকার বন্ডে সুদহার কমিয়ে দেয়া, বিনিয়োগের সীমা বেঁধে দেয়া, নবায়নের সুবিধা তুলে দেয়া ও উচ্চমূল্যস্ফীতির কারণে বন্ডে প্রবাসীদের বিনিয়োগ কমছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রবাসীদের বন্ডে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার কারণ হচ্ছে সরকার এসব বন্ডের বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। বিনিয়োগে ১ কোটি টাকায় লিমিট দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপ-আমেরিকায় যারা যান, তারা অনেকেই বছরে কয়েক কোটি টাকা আয় করেন। এ অর্থ তারা দেশে বিনিয়োগ করতে চাইলে সরকারের উচিত উৎসাহিত করা। বাংলাদেশ ব্যাংক দুই ধরনের বন্ড বিক্রি করে। প্রিমিয়াম বন্ড ও ডলার বন্ড। প্রিমিয়াম বন্ডে টাকা আর ডলার বন্ডে ডলার দেয়া হয়। এসব বন্ডে বছরে ১ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করা যাবে না। ফলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীরা দেশে বিনিয়োগ করছেন না। পরিণামে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমছে। তা ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক প্রণোদনা দিচ্ছে। অথচ হুন্ডির মাধ্যমে আরো বেশি লাভে প্রবাসীরা টাকা পাঠাতে পারার কারণে রেমিট্যান্সের বড় অংশ দৃশ্যমান হচ্ছে না। এখন দরকার হলো যত মাধ্যমে হোক যত বেশি পারা যায় সব জায়গা থেকে দেশে ডলার নিয়ে আসা। তবে জনপ্রিয় এ বিনিয়োগ মাধ্যমে সরকার নিজেই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে, যা কাম্য নয়।
রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে সরকার জনশক্তি রফতানি বাড়িয়েছে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা করে বাজার উন্মুক্ত ও নতুন বাজার খুঁজছে। এর ফলে করোনা-পরবর্তী বছরে জনশক্তি রফতানি বেড়েছে। বিশ্বের অর্থনীতি সংকটে থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর অর্থনীতি চাঙ্গা রয়েছে। ফলে দেশগুলোয় বিপুল পরিমাণ শ্রমিকের চাহিদা তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে সেখানে মানুষ যাচ্ছেও কিন্তু রেমিট্যান্স প্রবাহে তার প্রতিফলন লক্ষ করা যাচ্ছে না। এ কারণে সরকার রেমিট্যান্সে আড়াই শতাংশ প্রণোদনা দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি মার্কিন ডলারের বিপরীতে ১০৭ টাকা করে রেমিট্যান্স দিতে দেশের সিডিউল ব্যাংকগুলোকে বলেছে। বর্তমানে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রতি ডলারে প্রেরকরা পাচ্ছেন ৯৯ দশমিক ৫০ টাকা। এছাড়া এখন থেকে রেমিট্যান্স সংগ্রহের জন্য ব্যাংকগুলো কোনো প্রকার ফি নেবে না। বৈদেশিক মুদ্রার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স সংগ্রহকে উৎসাহিত করতে দেশের বাইরে এক্সচেঞ্জ হাউজের সংখ্যা বাড়াতে বলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দেরিতে হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের এসব পদক্ষেপ ইতিবাচক। এখান থেকে সুফল পেতে ব্যাংকগুলো নির্দেশনা সঠিকভাবে পরিপালন করছে কিনা তা তদারকিও করতে হবে।
প্রবাসী বাংলাদেশী যারা রেমিট্যান্সের মূল প্রেরক তাদের একটি বড় অংশ স্বল্পশিক্ষিত। এদের অনেকে ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পর্কে অবহিত নন, যে কারণে তারা হুন্ডিতে রেমিট্যান্স পাঠান। বিদেশে বাংলাদেশী অধ্যুষিত এলাকাগুলোয় হুন্ডিবাজদের তত্পরতা বেশি, যে জন্য অনেক প্রবাসী তাদের মাধ্যমেই রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহী হন। আলোচ্য জটিলতা নিরসনে দেরি করা হলে যেসব প্রবাসী নিয়মিত হুন্ডিতে রেমিট্যান্স পাঠান, তারা ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আরো বেশি নিরুৎসাহিত হয়ে পড়তে পারেন। এ সুযোগে হুন্ডিবাজরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে। এমনিতেই বহু প্রবাসী বাংলাদেশী বিভিন্ন দেশে দালাল ও নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নানাভাবে হয়রানির শিকার হন, যা রেমিট্যান্সের গতিতে প্রভাব ফেলছে। এসব বন্ধে কর্তৃপক্ষকে সক্রিয় হতে হবে।
জ্বালানি তেলসহ চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের সুবিধাভোগী হলো সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও এসব দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভালো। উচ্চমূল্যস্ফীতি সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান শ্রমবাজারগুলোয় বাংলাদেশীরা স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করছেন। নতুন করে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশী এসব দেশে অভিবাসীও হয়েছেন। এর পরও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ডলারের দর নির্ধারণ করে দেয়ার কারণেও আনুষ্ঠানিক পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমতে পারে। এক্ষেত্রে দেশে টাকা পাঠানোর পদ্ধতি আরো সহজ করা উচিত। রেমিট্যান্স পাঠানোর ফি হওয়া উচিত নামমাত্র। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স প্রেরণকারীরা যেন সর্বোচ্চ অর্থ পেতে পারেন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্ব দ্রুত পাল্টাচ্ছে। বাজারে নতুন নতুন চাহিদা তৈরি হচ্ছে। কভিড-১৯ পরিস্থিতি আমাদের অর্থনীতিকে নতুন এক পরীক্ষার সম্মুখীন করেছে। প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতির ফলে নতুন নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হচ্ছে আমাদের। এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের দক্ষতা ও সক্ষমতার নতুন পরীক্ষা দিতে হচ্ছে সবাইকে। সরকার ও নীতিনির্দেশকদের এখন তাই আরো দূরদর্শী হতে হবে, আরো দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তার পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।