ডলার সংকট

এলসি খুলছে না ব্যাংক, উড়োজাহাজের বিজনেস ক্লাসও ফাঁকা নেই

ডলার সংকটে আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে দেশের অনেক ব্যাংক। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতেও এলসি খুলতে অপারগতা প্রকাশ করছে ব্যাংকগুলো। ২-৩ লাখ ডলারের এলসি খুলতেও ভয় পাচ্ছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা। ডলার নিয়ে ব্যাংকারদের আতঙ্কের মধ্যেও বাংলাদেশীদের বিদেশ যাত্রা বেড়েই চলছে। এমনকি বিদেশগামী উড়োজাহাজগুলোর ব্যয়বহুল বিজনেস ক্লাসেও আসন ফাঁকা থাকছে না।

ডলার সংকটে আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে দেশের অনেক ব্যাংক। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতেও এলসি খুলতে অপারগতা প্রকাশ করছে ব্যাংকগুলো। ২-৩ লাখ ডলারের এলসি খুলতেও ভয় পাচ্ছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা। ডলার নিয়ে ব্যাংকারদের আতঙ্কের মধ্যেও বাংলাদেশীদের বিদেশ যাত্রা বেড়েই চলছে। এমনকি বিদেশগামী উড়োজাহাজগুলোর ব্যয়বহুল বিজনেস ক্লাসেও আসন ফাঁকা থাকছে না।

গত এক বছরে বাংলাদেশীদের বিদেশ যাত্রা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। দেশী-বিদেশী প্রায় ৩০টি এয়ারলাইনস প্রতিষ্ঠান বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। এসব ফ্লাইটের কোনোটিতেই আসন ফাঁকা থাকছে না। টিকিটের দাম প্রায় দ্বিগুণ হলেও বাংলাদেশীদের বিদেশ যাত্রা কমছে না। উল্টো বাংলাদেশী ধনীদের জন্য সম্প্রতি উচ্চমূল্যের ‘প্রথম শ্রেণী’র আসন চালু করেছে অভিজাত তিন এয়ারলাইনস। এর মধ্যে দুবাইভিত্তিক এমিরেটস দিনে দুটি ফ্লাইটে প্রথম শ্রেণীর সেবা দিচ্ছে। আর প্রতিদিন একটি ফ্লাইটে প্রথম শ্রেণীর সেবা দিচ্ছে কুয়েত এয়ারলাইনস। সম্প্রতি বাংলাদেশীদের জন্য প্রথম শ্রেণীর চেয়েও বিলাসবহুল ‘কিউ সুইট’ সেবা চালু করেছে কাতার এয়ারওয়েজ। অভিজাত এ বিমান চলাচল সংস্থাটির কিউ সুইটেও কোনো আসন ফাঁকা থাকছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের ভাষ্যমতে, বাংলাদেশ থেকে বিদেশগামীদের বড় একটি অংশ যাচ্ছে পর্যটন বা চিকিৎসার উদ্দেশ্যে। আগে বাংলাদেশী পর্যটকদের বৃহদংশের কাছে ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে পছন্দের জায়গা ছিল দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টাচ্ছে। এখন ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বিদেশগামী বাংলাদেশীদের উল্লেখযোগ্য অংশ যাচ্ছে ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে। সঙ্গে নিচ্ছে ডলারসহ বিদেশী বিভিন্ন মুদ্রা, যার চাপ পড়ছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে।

ইউরোপ-আমেরিকাগামী ভ্রমণ ভিসার আবেদনের চাপ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বলে জানালেন অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি (ওটিএ) শেয়ার ট্রিপের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা সোহেল মাজিদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, করোনার কারণে উড়োজাহাজ চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে ছিল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর থেকেই বিদেশগামী যাত্রীদের চাপ বাড়ছে। গত বছর দেশ থেকে রেকর্ডসংখ্যক যাত্রী স্টুডেন্ট ভিসায় যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্যে গিয়েছেন। এখন এসব দেশে ট্যুরিস্ট ভিসার চাপ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের ভ্রমণ ভিসার আবেদন করলে দূতাবাসগুলো সাক্ষাত্সূচি দিচ্ছে অন্তত ছয় মাস পর। আবার বিদেশে বাংলাদেশীদের প্রধান শ্রমবাজারগুলোয় নতুন করে শ্রমিক যাওয়া শুরু হয়েছে। নতুন নতুন শ্রমবাজারও সৃষ্টি হচ্ছে। এসব কারণে এয়ারলাইনসগুলোয় যাত্রীর চাপ বেড়েছে।

শেয়ার ট্রিপের ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে, ২১ অক্টোবর এমিরেটস এয়ারওয়েজের ইকোনমি ক্লাসে ঢাকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে যেতে ভাড়া লাগবে সর্বনিম্ন ৮০ হাজার টাকা। একই ট্রিপে বিজনেস ক্লাসে যেতে হলে গুনতে হবে সর্বনিম্ন ৪ লাখ ১৮ হাজার টাকা। ফার্স্ট ক্লাস বা প্রথম শ্রেণীতে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে ভাড়া লাগবে কমপক্ষে ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা। যাত্রীর বাড়তি চাপের কারণে বিদেশী এয়ারলাইনসগুলো বাংলাদেশে তাদের ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়াচ্ছে। স্বনামধন্য এয়ারলাইনসগুলো এরই মধ্যে নিজেদের আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ করেছে। আর বাংলাদেশী ধনীদের চাহিদার কারণে অভিজাত বিদেশী এয়ারলাইনসগুলো বিজনেস ক্লাসের আসন সংখ্যাও বাড়িয়েছে। পাশাপাশি চালু করছে বিলাসবহুল প্রথম শ্রেণীও।

ভ্রমণ ও চিকিৎসার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশীদের বিদেশ যাত্রা বেড়ে যাওয়ার বিরূপ প্রভাব দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে পড়ছে বলে মনে করছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা। একাধিক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন, বিদেশগামীদের একটি অংশ সঙ্গে ক্রেডিট কার্ড নিয়ে যাচ্ছেন। তবে বেশির ভাগই নগদ ডলারসহ বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে যান। এ কারণে দেশ থেকে কী পরিমাণ ডলার প্রতিদিন চলে যাচ্ছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া সম্ভব নয়। দেশের খুচরা বাজারে (কার্ব মার্কেট) ডলারের চাহিদা কোনোভাবেই কমছে না। ব্যাংক খাতে ডলারের সর্বোচ্চ বিনিময় মূল্য ১০৮ টাকা হলেও খুচরা বাজারে ১১৫ টাকার বেশি। দরের এ তারতম্যের কারণে অবৈধ হুন্ডির বাজার চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের একটি অংশ হুন্ডিতে চলে যাওয়ায় বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গিয়েছে।

দেশের প্রথম সারির একটি বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বলেন, এয়ারলাইনসগুলোর বিজনেস ক্লাস বা প্রথম শ্রেণীতে যারা ভ্রমণ করছেন, তাদের অনেকেরই বিদেশে সম্পদ জমা করা আছে। এ কারণে দেশ থেকে তাদের নগদ ডলার নিতে হচ্ছে না। বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে বড় অংকের অর্থ একসঙ্গে তারা পাচার করে দিচ্ছেন। বিদেশে গিয়ে তারা লাগামহীন ব্যয়ও করছেন।

ডলার সংকটের কারণে এলসি খোলা অনেকটাই কমিয়ে এনেছেন বলে জানান মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুুবুর রহমান। তিনি বলেন, আমাদের ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার ৭০ শতাংশই রেমিট্যান্স থেকে আসে। সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ অস্বাভাবিক হারে কমে গিয়েছে। এ কারণে আমদানির এলসি খুলতে বাড়তি সতর্কতা নেয়া হয়েছে। এলসির আকার ২ লাখ ডলারের বেশি হলে ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের ছাড়পত্র নেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

দেশের প্রায় এক ডজন ব্যাংকের আমদানির এলসি খোলার তথ্য নিয়েছে বণিক বার্তা। তাতে দেখা যাচ্ছে, প্রায় সব ব্যাংকই সাধারণ গ্রাহকদের আমদানির এলসি খোলা বন্ধ করে দিয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির এলসি খুলতেও ব্যাংকগুলো অপারগতা প্রকাশ করছে। এলসি খুলতে গ্রাহকরা এখন ব্যাংকের চেয়ারম্যান-এমডিদের কাছে তদবিরও করছেন। যদিও বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালক ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী এলসি খুলতে পারছেন।

দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই দেশে আসে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের মাধ্যমে। দেশ থেকে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রেও ব্যাংকটির অবস্থান সবার শীর্ষে। শুধু ২০২১ সালেই ব্যাংকটির মাধ্যমে রফতানি হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকার পণ্য। ব্যাংকটি রফতানি ও রেমিট্যান্স থেকে প্রাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে নিজেদের আমদানি ব্যয় নির্বাহ করতে সক্ষম বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

রিজার্ভ সংকট শুরু হওয়ার আগে নিজেদের আমদানি দায় পরিশোধের পরও ইসলামী ব্যাংক দেশের অন্য ব্যাংকগুলোকে ডলার সহায়তা দিতে পারত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার পর আমদানির নতুন এলসি খোলা কমিয়ে এনেছে ব্যাংকটি। এর পরও নিজেদের আমদানি দায় পরিশোধে ব্যাংকটিকে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ মুনিরুল মওলা বণিক বার্তাকে বলেন, দেশের সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমেই আসে। আবার বেসরকারি খাতের আমদানিতেও আমাদের ব্যাংকের অবস্থান সবার শীর্ষে। বাংলাদেশ ব্যাংক চেয়েছে আমদানির এলসি খোলা কমিয়ে আনতে। নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা নতুন এলসি খোলা কমিয়ে এনেছি। তবে নিজেদের আমদানি দায় পরিশোধের ক্ষেত্রে আমরা এখনো স্বনির্ভর।

নতুন আমদানির এলসি খোলা প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনার তথ্য দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকও। চলতি বছরের মার্চে দেশের ব্যাংকগুলোয় এলসি খোলা হয়েছিল ৯৮০ কোটি ডলারের। সেপ্টেম্বরে নতুন এলসি খোলার পরিমাণ ৫৭০ কোটি ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে। মূলত ব্যাংকগুলোর অপারগতার কারণেই আমদানির এলসি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।

গত মাসে ডলারের বিনিময় হার বাজার পরিস্থিতির ওপর ছেড়ে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের দাম ঘোষণা করছে বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন (বাফেদা)। সংগঠনটির ঘোষণা অনুযায়ী গতকাল ব্যাংক খাতে ডলারের সর্বনিম্ন দর ছিল ১০০ টাকা। আর সর্বোচ্চ ১০৩ টাকা ৩৪ পয়সা দরে ডলার বিক্রি করেছে ব্যাংকগুলো। বাফেদার ওয়েবসাইটে ঘোষিত দর অনুযায়ী, গতকাল দেশের ৫৭টি ব্যাংকের কেনা ডলারের গড় বিনিময় হার ছিল ১০২ টাকা ২৫ পয়সা। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০৭ টাকা ১০ পয়সা দরে ডলার কিনেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড।

বাফেদা চেয়ারম্যান ও সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আফজাল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, বাফেদার ঘোষণা অনুযায়ী ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ১০৭ টাকা ৫০ পয়সা দরে রেমিট্যান্সের ডলার কিনতে পারবে। নির্ধারিত এ দরে আমরা রেমিট্যান্স কিনতে পারছি। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আমদানি এলসির বড় অংশ সোনালী ব্যাংকে খোলা হয়। এসব এলসির দায় মেটাতে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ডলার সহায়তা পাচ্ছি। বেসরকারি খাতের এলসি দায় আমাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় মেটানো হচ্ছে।

আরও