রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, পোশাক খাতে ২০২০ সালের চেয়ে ২০২১ সালে ৪৫ শতাংশ রফতানি বেড়েছে এবং ২০২২ সালের প্রথমার্ধে রফতানি বেড়েছে ৪৩ শতাংশ। তবে এর সঙ্গে গত বছরের মে মাস-পরবর্তী নয় মাসে অন্তত ৬০টি শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনাও ঘটেছে। কাজের চাপ বৃদ্ধি ও সে তুলনায় বেতন না বাড়ায় এবং বেতন-ভাতা ঠিকমতো না পাওয়াসহ কয়েকটি কারণে এ ধরনের অসন্তোষ বাড়ছে বলে জরিপে উঠে এসেছে।
রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে গতকাল সিপিডি ও ক্রিশ্চিয়ান এইডের যৌথ আয়োজিত এক সংলাপে জরিপের এ তথ্য তুলে ধরেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। ‘তৈরি পোশাক খাতে প্রবৃদ্ধি ও শোভন কর্মসংস্থান সম্পর্কে আমরা কি জানতে পারছি’ শীর্ষক ওই সংলাপের সভাপতি ছিলেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিতি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক খালেদ মামুন চৌধুরী, বিকেএমইএর এক্সিকিউটিভ প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ হাতেম, বিজিএমইএর ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. শহিদুল্লাহ আজিম, গার্মেন্টস ওয়ার্কার ট্রেড ইউনিয়ন সেন্টারের সভাপতি মন্টু ঘোষ, বিআইজিডির সিনিয়র ফেলো মাহীন সুলতান, বিসিডব্লিউএসের নির্বাহী পরিচালক ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য কল্পনা আক্তার, ক্রিশ্চিয়ান এইড বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ম্যানেজার নুজহাত জেবিন প্রমুখ।
জরিপে আরো উঠে এসেছে, রফতানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কারখানাগুলোয় কাজের চাপও বেড়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে কারখানা মালিকরা শ্রমিকদের অতিরিক্ত কাজ করতে বাধ্য করছেন। সে তুলনায় শ্রমিকদের মজুরি বাড়াননি কারখানা মালিকরা। আবার ওভারটাইমের টাকা ও বেতন দেয়ার পদ্ধতিরও তেমন কোনো উন্নতি করা হয়নি। অনেক সময় বেতন দেরিতে দেয়া হচ্ছে। আর এসব কারণে শ্রমিক অসন্তোষ বেড়েছে বলে মনে করছেন সংলাপে যোগ দেয়া বিশেষজ্ঞরা।
বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, মালিক ও শ্রমিককে সমন্বিতভাবেই তৈরি পোশাক খাত টিকিয়ে রাখতে হবে। এছাড়া সব গার্মেন্টসেই ট্রেড ইউনিয়ন হওয়া উচিত। তবে আমার পরামর্শ শ্রমিক নেতারা যাতে শিক্ষিত হন। ট্রেড ইউনিয়নে এমনভাবে নেতা বাছাই করতে হবে যে মালিকপক্ষের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে দরকষাকষি করতে পারেন। গার্মেন্টস শ্রমিকদের টিসিবির পণ্যপ্রাপ্তির তালিকায় আনার চেষ্টা করবেন বলেও জানান বাণিজ্যমন্ত্রী।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন সূচনা বক্তব্যে বলেন, দেশের অর্থনীতির উন্নয়নে তৈরি পোশাক খাত অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কভিড-পরবর্তী সময়ে সামগ্রিক রফতানি প্রবৃদ্ধিতেও এ খাতের বিশেষ ভূমিকা ছিল। এ খাত দেশের কর্মসংস্থানেরও গুরুত্বপূর্ণ উৎস, বিশেষ করে নারীদের। তবে রফতানি ও উন্নয়ন খাতে বিশ্বপরিসরে আমাদের অনেক কমপ্লায়েন্স মেনে চলতে হবে। উন্নত দেশ হলে সেগুলো আরো বেশি মেনে চলতে হবে। এ কমপ্লায়েন্সের মধ্যে রয়েছে শোভন কর্মসংস্থান, শ্রম অধিকার, মানবাধিকার, নারীর অধিকার, শিশুশ্রম বন্ধ ইত্যাদি।
বিজিএমইএর ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. শহিদুল্লাহ আজিম বলেন, গার্মেন্টসের মেশিন অটোমেশন হয়ে যাচ্ছে, তাই শ্রমিকের পরিমাণ কমছে। তাই নারী শ্রমিকদের গার্মেন্টসের বিভিন্ন বিভাগ অনুযায়ী দক্ষতা বাড়াতে হবে। আমাদের দক্ষ শ্রমিকের অভাব রয়েছে। তিনি অবশ্য প্রশ্ন রেখে বলেন, দেশের ১ হাজার ১৩৪টি কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন আছে। এতে শ্রমিকদের কতটা ভাগ্য উন্নয়ন হচ্ছে? অনেক ট্রেড ইউনিয়ন তো অযৌক্তিক দাবিতে শ্রমিকদের ইন্ধন দিয়ে গার্মেন্টসই বন্ধ করে দেয়। মালিকপক্ষের এ প্রতিনিধি আরো বলেন, শিল্পের জন্য সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। বায়ারদের পোশাকের দাম বাড়াতে হবে। এ বিষয়ে অবশ্য আমরা চেষ্টা করছি।
গার্মেন্টস ওয়ার্কার ট্রেড ইউনিয়ন সেন্টারের সভাপতি মন্টু ঘোষ বলেন, সর্বশেষ চার বছর আগে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানো হয়েছে। দেশে সবকিছুরই দাম বেড়েছে। আমরা কয়েকটি সংগঠন বারবার নতুন করে মজুরি বৃদ্ধির জন্য বলছি কিন্তু সরকার এতে নজর দিচ্ছে না। সরকারের ওপর গার্মেন্টস মালিকদের অনেক প্রভাব। কারণ জাতীয় সংসদেও অনেক গার্মেন্টস মালিক রয়েছেন। শ্রমিক নেতা মন্টু ঘোষ আরো বলেন, যেকোনো সময় শ্রমিকরা অনাকাঙ্ক্ষিত মুভমেন্ট করে ফেলতে পারেন।