পর্যালোচনা

অপ্রয়োজনীয় আমদানি বন্ধ ও দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি

টাকার অংকে আমদানির পরিমাণ এবং ওজনে আমদানির পরিমাণ নিয়ে সরকার যে বড় অস্বস্তিতে আছে তা সরকারি কয়েকটি সিদ্ধান্ত এবং সরকারের সংক্ষিপ্ত প্রতিষ্ঠানের সুপারিশমালা দেখেই বোঝা যায়। কিছুদিন আগে সরকারি উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক বিলাসপণ্য আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করে। বিলাসপণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত করতে এসব পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ঋণপত্রে মার্জিনের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে।

টাকার অংকে আমদানির পরিমাণ এবং ওজনে আমদানির পরিমাণ নিয়ে সরকার যে বড় অস্বস্তিতে আছে তা সরকারি কয়েকটি সিদ্ধান্ত এবং সরকারের সংক্ষিপ্ত প্রতিষ্ঠানের সুপারিশমালা দেখেই বোঝা যায়। কিছুদিন আগে সরকারি উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক বিলাসপণ্য আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করে। বিলাসপণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত করতে এসব পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ঋণপত্রে মার্জিনের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। এর অর্থ ব্যবসায়ীদের বিলাসপণ্য আমদানি করতে হলে মার্জিন হিসেবে ঋণপত্রের বিপরীতে এখন অনেক ক্যাশ ব্যাংকে রাখতে হচ্ছে। যত টাকা রাখতে হয়, তা জোগাড় করা অনেক ব্যবসায়ীর পক্ষে প্রায় অসম্ভব। আবার কারো কারো ক্ষেত্রে তা অলাভজনক। শুধু বিলাসপণ্য নয়, আরো নানা ধরনের দ্রব্য আমদানিতে ‘মার্জিন’ বাড়ানো হয়েছে। এর ওপর রয়েছে ডলারের ঊর্ধ্বমুখী মূল্য। এত বেশি মূল্যে ডলার কিনে, এত বেশি মার্জিন দিয়ে ব্যবসা করা খুবই কঠিন। আবার বড় বড় ঋণপত্র (এলসি) এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক যাচাই-বাছাই করে দেখে। বিশেষ করে তারা দেখে ‘ওভার ইনভয়েসিং’ হচ্ছে কিনা যার দ্বারা অতিরিক্ত ডলার খরচের নামে পাচার হয়। যাচাই-বাছাইয়ের কারণে অনেক এলসি এখন আটকে যাচ্ছে। রয়েছে ডলারের সংকট। ব্যাংকগুলো এলসি খুলতে পারছে না ডলারের অভাবে। আন্তঃব্যাংক মার্কেটেও ডলার উচ্চমূল্যে ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে, যা অনভিপ্রেত। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা টের পেয়ে ছয়টি ব্যাংকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বৈদেশিক মুদ্রাবিনিময় বিভাগের প্রধানদের সরানো হয়েছে। এমডিদের শোকজ করা হয়েছে। উদ্দেশ্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ। ডলার বাজারে হানাও দেয়া হচ্ছে। আবার রয়েছে আরেক সমস্যা। বিদেশী ব্যাংকগুলো বাংলাদেশের ব্যাংকের ঋণপত্র (এলসি) গ্রহণ করছে না। বিদেশী ব্যাংকের ‘অ্যাড কনফারমেশন’ চায়। এতে আমদানির খরচ বেড়েছে বিশেষ করে এক ধরনের ঋণপত্রে। এসব কারণে আমদানির বাজারে একটু ভাটা দেখা দিয়েছে। হুট করে এলসি খোলার প্রবণতা বেশকিছুটা হ্রাস পেয়েছে। আজ ডলারের দাম এক রকম, তো কাল আরো বেশি। এতে ব্যবসায়ীরা অনুমান করতে পারেনি, এলসির পণ্য গুদামে ওঠাতে শেষ পর্যন্ত কত ডলার বা ক্যাশ প্রয়োজন হবে। এসবের ফলে আমদানি বাণিজ্য খানিকটা সংবিৎ ফিরে পেয়েছে। বণিক বার্তার খবরের শিরোনাম হচ্ছে, আমদানি কমছে, ইতিবাচক ধারায় বৈদেশিক বাণিজ্য। সংশ্লিষ্ট খবরে প্রকাশ, জুলাইয়ে ২ বিলিয়ন ডলার কমার পর আগস্টেও এলসি খোলা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। তথ্য অনুযায়ী জুনে এলসি খোলার পরিমাণ ছিল ৭ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার। জুলাইয়ে এর পরিমাণ কমে ৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। বণিক বার্তার খবর অনুযায়ী, আগস্টে প্রথম ১১ দিনে এলসি খোলা হয়েছে মাত্র ১৬১ কোটি ডলারের। আশার কথা, আমদানি এলসির পরিমাণ কমলেও রফতানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে বলে খবরে বলা হয়েছে। আশঙ্কার কথা, এ মন্দার মধ্যেও ২০২১-২২ অর্থবছরে রেকর্ড পরিমাণ (৮৯ দশমিক ১৬ বিলিয়ন) আমদানি হয়েছে। ক্রমাবনতিশীল ‘ব্যালান্স অব ট্রেড’ এবং ‘ব্যালান্স অব পেমেন্ট’কে আরো অধোমুখী হতে না দেয়ার উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে/করছে এবং বলাই বাহুল্য তা করাই উচিত। বহুদিন ধরে সন্দেহ করা হচ্ছিল, আমদানি-রফতানির মাধ্যমে দেশ থেকে অর্থ পাচার হচ্ছে। আগে বেশি হতো হুন্ডির মারফত। ইদানীং আমদানি-রফতানির পরিমাণ বেশ বেড়ে যাওয়ায় কিছু ব্যবসায়ী আমদানি-রফতানির এলসির মাধ্যমে অর্থ পাচার বেশি করছে বলে অভিযোগ মিলছে। এ প্রেক্ষাপটে ‘নাটবল্টু’ টাইট করার বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি বেশ উৎসাহব্যঞ্জক।

অবশ্য ‘এলসি’ মার্জিন বৃদ্ধির ফলে এবং সংশ্লিষ্ট অনেক কারণে বাজারে জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়েছে। এখন সরবরাহ সংকট, চাহিদার কমতি সেভাবে নেই। যেমন ফলমূল যথা—আপেল, নাশপাতি, আঙুর ইত্যাদির দাম বাজারে বেশ বেড়েছে। এতে যারা এসব ফল খান তাদের উচ্চমূল্য দিতে হচ্ছে। কিন্তু এখানে কথা আছে। বলতেই হবে, দেশে নানাজাতের ফল উৎপাদন হয়, যা আগে ছিল না। আগে যেসব ফল হতো তার আকার ছিল ছোট। যেমন পেয়ারা। এখন বাজারে বড় বড় পেয়ারা পাওয়া যায়। দামও সস্তা। ‘লটকনে’র সরবরাহ প্রচুর। দাম সহনশীল। আনারস বলা যায় সারা বছরের ফল। দামে বেশ সস্তা। ড্রাগন ফল বলে একটি ফল প্রচুর পাওয়া যায়। অফিস-আদালতেও ড্রাগন ফলের কদর বেশি। কুল-বরই প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। নানা ধরনের কুল-বরই। আমের ফলন ভালো, কাঁঠালের ফলন ভালো। খবরের কাগজে দেখলাম, বাংলাদেশে কয়েক বছরের মধ্যে শতাধিক ধরনের ফল বাজারে এসেছে। এসব ফলের খাদ্যগুণ বেশ। রয়েছে আমড়া, যা প্রচুর পরিমাণে এখন পাওয়া যায়। এ অবস্থায় প্রশ্ন, বিদেশী ফল যা না এলে বা এসবের দাম উচ্চমূল্য হলে দেশীয় বাজারের অবস্থা কী হবে? আমার তো মনে হয়, এর ফল ভবিষ্যতে আমাদের জন্য মঙ্গলজনকই হবে। দুয়েকটি উদাহরণ দিই—আমদানি-রফতানিতে কড়াকড়ি করলে কী ফল হয়। সাম্প্রতিকতম উদাহরণ হচ্ছে গরু আমদানির খরচ। প্রতিবেশী দেশের গরু আমদানি এখন হয় না বললেই চলে। সেখানে গরু চোরদের ধরা হচ্ছে। আমাদের জন্য এর ফল ভালো হয়েছে। সরবরাহ সংকটে পড়ে আমাদের খামারিরা ওই সংকট মোকাবেলায় এগিয়ে এসেছেন। এখন দেশেই প্রচুর গরু-ছাগল উৎপাদন হয়। মাংসের উৎপাদনও বেশি। ‘আমদানিতে টাইট’ দিলে দেশীয় বাজার গড়ে ওঠে, দেশীয় শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠে। এবার একটি উল্টো উদাহরণ দিই। পাকিস্তান আমলের শুরুর দিকে ‘কোরীয় যুদ্ধের’ সময় প্রতিবেশীরা আমাদের কাঁচা পাটের ওপর নির্ভরশীল ছিল। পাটকল ওইদিকে বেশি, কাঁচা পাট আমাদের বেশি। পাকিস্তান সরকার হঠাৎ করে পাট রফতানি বন্ধ করে দেয়। ফল? তারা প্রথম প্রথম সংকটে ভোগে। ১৯৬৪-৬৫ সালের অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে যেসব তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানি প্রতিবেশী দেশে যায়, তাদের মধ্যে পাটচাষীদের তারা পাটচাষে উৎসাহিত করে। ফল? আজকে তারা পাট চাষে আমাদের সমান সমান। আমি বলতে চাই ‘ঠেলায়’ পড়লে বিকল্প বেরিয়ে যায়। রাশিয়ার ওপর মার্কিন ‘স্যাংকশন’ জারি এবং রাশিয়ার বাণিজ্য, তেল বাণিজ্য বিধ্বস্ত হওয়ার পথে—পেমেন্ট মেকানিজমের অনুপস্থিতির কারণে ডলার ব্যবহার করে রাশিয়া তেল রফতানি করতে পারছে না। এখন রুপি-রুবল ট্রেড করে রাশিয়া ও ভারত উভয়ই উপকৃত। আমাদের  সরকারও এ ধরনের বাণিজ্যের পথ বের করার চিন্তা-ভাবনা করছে।

ওপরের ভণিতাটা কেন দিলাম? দিলাম একটি খবর দেখে। খবরটি ‘ট্যারিফ কমিশনের’। এ কমিশন ৩৩০টি পণ্যের আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে বলেছে। কীভাবে তা করা হবে। শুল্ক-কর ও ট্যারিফ বাড়িয়ে। এর অর্থ এই ৩৩০টি পণ্যের দাম বাড়বে। আমদানি কমবে। ডলারের ওপর চাপ হ্রাস পাবে। ডলার সংকট নিয়ন্ত্রণে আসবে। কিন্তু এখানে যে সমস্যাটি লুক্কায়িত, তা হচ্ছে মূল্যবৃদ্ধি। কী কী পণ্যের? ৩৩০টি পণ্যের যে তালিকা দেখলাম, তাতে আছে বিদেশী ফল, স্বর্ণ, মদ-বিয়ার, স্মার্টফোন, গাড়ি ও মসলাজাতীয় পণ্য। তালিকাটি বিরাট। আমি কয়েকটির কথা উল্লেখ করছি। নারিকেল, কাজুবাদাম, বাদাম, সুপারি, খেজুর, আম, কমলা, তরমুজ, চা পাতা. আইসক্রিম, পানি, চামড়ার বেল্ট, প্লাস্টিকের ফুল, কাঠের ফার্নিচার, এয়ারকন্ডিশন, দেয়ালঘড়ি ইত্যাদি। পুরো তালিকাটি কেউ পাঠ করলে বুঝবেন এসব পণ্যের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু। আমি ব্যক্তিগত উদাহরণ দিই। ঘড়ির একটা চামড়ার বেল্ট। তা আছে বাজারে। প্রায় সবই চীনের তৈরি। আমাদের ঘড়ির বেল্টের দাম বেশি। এবার বিষয়টি বোঝা দরকার। পশুর কাঁচা চামড়া আমরা রফতানি করি। আমাদের চামড়ার গুণ ও মান ভালো। তাহলে কেন আমরা ঘড়ির চামড়ার বেল্ট বাইরে থেকে আমদানি করব। প্লাস্টিকের ফুল! কোনো মানে হয় আমদানির? দেশে এখন ফুল চাষ হচ্ছে। ফুলের রীতিমতো বাণিজ্যিক চাষ হচ্ছে। বেশ বড় বড় বাজারও গড়ে উঠেছে। ফুলের ব্যবহার বেড়েছে কয়েক গুণ। কী কারণে বিদেশ থেকে প্লাস্টিকের ফুল আমদানি করা হবে এর যৌক্তিকতা আমি খুঁজে পাই না। আম-কাঁঠাল তাও বিদেশ থেকে আমদানি করে খেতে হবে, যেখানে কাঁঠাল আমাদের জাতীয় ফল। বাজার এখন আম-কাঁঠালে ভর্তি থাকে মৌসুমে। কয়েকদিন আগে গিয়েছিলাম একটা ফুলের টব কিনতে। আমি খুঁজি মাটির টব। দোকানে দোকানে  দেখি প্লাস্টিকের টব। এর অর্থ কী? প্লাস্টিকের উপকরণ বিদেশ থেকে ডলার দিয়ে আমদানি করতে হয়। মাটির টব এখন নানা ধরনের হয়। আমাদের মৃিশল্পীরা সুন্দর সুন্দর ছোট-বড় টব তৈরি করছেন। তাহলে বাজারে কেন প্লাস্টিকের টব। কত উদাহরণ দেব? এখানেই প্রশ্ন, যদি বিলাসপণ্য আমদানিতে নিরুৎসাহিত করা যায়, তাহলে অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আমদানি কেন বন্ধ করা যাবে না? বিলাসপণ্যের তাও যুক্তি থাকলে থাকতেও পারে। ফ্রিজকে কেউ বিলাসপণ্য বলতে পারে, বলতে পারে গাড়িকেও। কিন্তু কারো কারো আছে এগুলো বিলাসপণ্য নাও হতে পারে, হতে পারে প্রয়োজনীয় পণ্য। কিন্তু প্লাস্টিকের ফুল কি?

অপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির দরকার কী? তাও মহামূল্যবান ডলার ব্যয় করে। ডলার যে কত মূল্যবান ২০২২ সালের মাঝামাঝি এসে হাড়ে হাড়ে আমরা টের পাচ্ছি। ৪০-৪৫ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ হওয়ায় আমরা উত্ফুল্ল হয়ে পড়েছিলাম। এখন দেখা যাচ্ছে, এক ধাক্কায় তা নেমে এসেছে ৩০-৩২ বিলিয়ন ডলারে (আইএমএফের সংজ্ঞানুসারে)। আমরা ডলারের আমদানি দেখে ভীষণ আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলাম। এ ডলার পাঠায় গরিব লোকের ছেলেরা। তারা যা রোজগার করে তার থেকে সামান্য কিছু রেখে সবটাই দেশে পাঠায়। তৈরি পোশাকওয়ালারা যা রফতানি আয় করে, তার বিরাট অংশ যায় আমদানির জন্য। গরিব দেশের ছেলের রেমিট্যান্সের টাকায় প্লাস্টিকের ফুল, বরই, আম-কাঁঠাল আমদানি করার কাজটি কতটুকু নৈতিক—এ প্রশ্ন করা যায় না কী?

পরিশেষে ট্যারিফ কমিশনের কিছু সুপারিশ সম্পর্কেও আলোচনা দরকার। আমি তাদের একটি সুপারিশই আজ আলোচনা করব। সেটি হচ্ছে, বন্ডেড ওয়্যারহাউজ—যেখানে রফতানিযোগ্য পণ্য রাখা হয়। ওই সব পণ্যের একটা বড় অংশ খোলাবাজারে বিক্রি হয়। সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়, দেশীয় শিল্পের সর্বনাশ হয়। বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় হয়। অথচ এই ব্যবসাটি চলছে তো চলছেই। কোনো প্রতিকার দেখতে পাচ্ছি না। আরেকটা সমস্যা হচ্ছে ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইনভয়েসিং। এর দ্বারা গরিব কৃষককে ছেলেদের দেশে পাঠানো ডলার হরেদরে বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। ডলারের সুবিধা কৃষক কতটুকু পাচ্ছেন? এ অবস্থায় বিলাসপণ্যের পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আমদানিও নিরুৎসাহিত করা হোক।

 ড. আর এম দেবনাথ: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক

আরও