কর কমিয়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এড়ানো যেত: সিপিডি

ত্রুটিপূর্ণ তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর অভিযোগ তুলেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সরকার চাইলেই জ্বালানি তেলের কর প্রত্যাহার বা কমিয়ে মূল্যবৃদ্ধি এড়ানো যেত বলে মনে করছে তারা। রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির নিজস্ব কার্যালয়ে গতকাল আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনায় এ

ত্রুটিপূর্ণ তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর অভিযোগ তুলেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সরকার চাইলেই জ্বালানি তেলের কর প্রত্যাহার বা কমিয়ে মূল্যবৃদ্ধি এড়ানো যেত বলে মনে করছে তারা। রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির নিজস্ব কার্যালয়ে গতকাল আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনায় এ কথা জানানো হয়।

সিপিডি জানায়, ভর্তুকি সম্পদের অপচয় করে। এছাড়া এটি ধনী-গরিব সবাই পায়। তাই ভর্তুকি তুলে দিতেই হবে। এটি আইএমএফের শর্তে হোক বা না হোক। এটি অবশ্য ধীরে ধীরে করা যেত। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দুর্নীতি-অপচয় বন্ধ করতে না পেরে জ্বালানি তেলের উচ্চ মূল্যবৃদ্ধি জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লাভ-লোকসানের হিসাব জনগণের সামনে প্রকাশের দাবি জানিয়ে সিপিডি বলছে, গত ছয় বছরে বিপিসি ৪৬ হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে। সেখান থেকে সরকার নিয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ৩৬ হাজার কোটি টাকা কোথায়? বলা হচ্ছে, ওই টাকার মধ্যে ৩৩ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। কিন্তু কোথায় সেই বিনিয়োগ হয়েছে সে তথ্য জনসম্মুখে আনা হোক। তাছাড়া তেল বিক্রি থেকে চলতি বছরও বিপিসি ১ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা লাভ করেছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে জানায় সিপিডি। 

‘জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এখন এড়ানো যেত কি?’ শীর্ষক সংলাপে সিপিডির সিনিয়র গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন সূত্রে যে খতিয়ান দেখতে পাই, তাতে নিজস্ব অর্থায়নে ১১টি প্রকল্পের তথ্য পেয়েছি। সেখানে ব্যয় হবে ৮ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি। এর মধ্যে মাত্র পাঁচটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। বাকিগুলো বন্ধ। তাহলে বিপিসির টাকা কোথায়? আমরা অবশ্য জানতে পেরেছি বিভিন্ন ব্যাংকে বিপিসির ২৫ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা জমা রয়েছে। তাহলে ওই টাকা কোন টাকা? এছাড়া বাকি টাকা কোথায়? আমার ধারণা বাকি টাকাও বিপিসির হিসাবেই রয়েছে। আর তা-ই যদি হয়, তাহলে কেন লোকসান দেখিয়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলো? তিনি আরো বলেন, চলতি অর্থবছরেও ৫ হাজার ৯০৩ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে বিপিসি। আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি, জনগণের মাথায় বোঝা চাপিয়ে বিপিসি কোথায় বিনিয়োগ করবে?

সিপিডির এ গবেষণা পরিচালক বলেন, অবশ্যই জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এড়ানো যেত। বিপিসি যদি তার হিসাবে স্বচ্ছতা রাখত, তাহলে বাড়তি ব্যয়ের হিসাব সমন্বয় করা যেত। বিপিসি কীভাবে তার অর্থের হিসাব রাখছে, আমাদের জানা দরকার। তারা কোনটা লাভ, কোনটা লোকসান বলছে, সে হিসাব জনগণের সামনে আসা দরকার।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তাতে দাম পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে বলা হয়, জ্বালানি তেলের দাম ৪২ থেকে ৫২ শতাংশ বাড়ানোর ঘটনা দেশের ইতিহাসে অবিস্মরণীয়। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ কারণে অর্থনীতি এখন চরম চাপে। ধাপে ধাপে নানাভাবে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এমন সময়ে এ মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে আরো উসকে দেবে। সবচেয়ে বেশি ভুগবে নিম্ন আয়ের ও নির্ধারিত আয়ের মানুষ। বাজারে সব পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। দেশে কৃষি উৎপাদন কমলে আমদানি বাড়বে। শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হলে রফতানি কমবে।

ড. ফাহমিদা বলেন, বর্তমানে জ্বালানি তেলের দাম বাংলাদেশের চেয়ে নেপাল ও পাকিস্তানের বেশি। এখানে মনে রাখতে হবে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী ভিয়েতনাম। নীতিনির্ধারকদের বিষয়টি মাথায় রাখতেই হবে। তিনি বলেন, করোনা মহামারীর প্রভাবে অনেক মানুষ এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে অনেকে। তাদের স্বস্তি না দিয়ে উল্টো চাপ তৈরি করা হচ্ছে।

বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বলেন, ভর্তুকি প্রত্যাহার সমর্থন করি কিন্তু যেভাবে করা হয়েছে, এটাকে সমর্থন করি না। দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে খারাপ সময়ে সরকার জ্বালানি তেলের কর তুলে দিতেই পারে। বরং দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ওপর পরোক্ষ কর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এটা ভয়ংকর বৈষম্যমূলক। ধনীর কিছু হবে না, গরিব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সিপিডির নিবন্ধে বলা হয়, সরকার জ্বালানি তেলে প্রায় ৩৪ শতাংশ বিভিন্ন ধরনের কর নেয়। বিপিসির কাছ থেকে প্রতি বছর লভ্যাংশ নিচ্ছে। উদ্বৃত্ত অর্থ হিসেবে বিপিসির তহবিল থেকে ১০ হাজার কোটি টাকাও নিয়েছে সরকার।

সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে ধান চাষে প্রতি বিঘা জমিতে ১ হাজার টাকা খরচ বাড়বে কৃষকের। এ খাতে ১৫ লাখ কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার হয়, যার ৭৫ শতাংশ ডিজেলচালিত। এখন ধানের উৎপাদন ব্যাহত হলে দেশ বড় বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে। তাই একবারে এত বেশি তেলের দাম বাড়ানোর মতো পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ এখনো আসেনি।

বিকেএমইএ সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, গ্যাস সরবরাহ না থাকায় ডিজেলের ব্যবহার বেড়েছে কারখানায়। তাই উৎপাদন খরচ বাড়ছে। মূল্যস্ফীতির কারণে সামনে শ্রমিকদের বেতন বাড়ানো লাগতে পারে। এদিকে দুই মাস আগেই পোশাকের দাম কমিয়ে দিয়েছে ক্রেতারা। তাই নতুন দামে জ্বালানি তেল কিনে কারখানা চালানো সম্ভব নয়।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর শহরে প্রতি কিলোমিটারে আড়াই টাকা নির্ধারণ করা হলেও ৩-৭ টাকা পর্যন্ত নিচ্ছে বিভিন্ন পরিবহন। এতে দিনে একজনের যাতায়াত খরচ বেড়েছে গড়ে ৭০-২০০ টাকা। আর দূরপাল্লার বাসে খরচ বেড়েছে ১০০-৩০০ টাকা।

আরও