ফাইবার অপটিক কেবলের বৈশ্বিক স্বল্পতার কারণে টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণ ব্যাহত হচ্ছে। এতে অনেক দেশের ডিজিটাইজেশন পিছিয়ে যাচ্ছে। অপটিক কেবলস্বল্পতায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে ইউরোপ, ভারত ও চীন। সম্প্রতি ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
করোনা মহামারীর কারণে বৃহৎ অনেক প্রযুক্তি ও টেলিকম কোম্পানি তাদের মূলধন বিনিয়োগ কমিয়ে দিলেও অনেক ওয়েব ও ইনফরমেশন কোম্পানির চাহিদা বেড়েছে। বিশাল চাহিদা পূরণে ইনফরমেশন সেন্টারের সংখ্যা বাড়াচ্ছে অ্যামাজন, গুগল, মাইক্রোসফট ও ফেসবুকের মতো কোম্পানি। তারা সমুদ্রতলে ফাইবার নেটওয়ার্ক বিস্তারে একসঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। এদিকে অনেক দেশের সরকার দ্রুতগতির ব্রডব্যান্ড ও ফাইভজি আনার ক্ষেত্রেও তোড়জোড় চালাচ্ছে। উচ্চাভিলাষী সেসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রচুর ফাইবার অপটিক কেবল প্রয়োজন।
মাইকেল ফিঞ্চ নামে এক বিশ্লেষক বলেন, ফাইবার অপটিক কেবল স্থাপন ব্যয় সম্প্রতি দ্বিগুণ বেড়েছে। এজন্য বিভিন্ন দেশের সরকার ডিজিটাইজেশন নিয়ে যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা হাতে নিয়েছে তা বাস্তবায়ন সম্ভব কিনা সে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এতে বৈশ্বিক কানেক্টিভিটিই হুমকিতে পড়তে পারে বলে শঙ্কা জেগেছে।
ফাইবার অপটিক কেবলস্বল্পতায় আরো উদ্বেগের কারণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপকরণস্বল্পতা। ফাইবার অপটিক গ্লাস তৈরির প্রধান উপাদান হিলিয়ামের ব্যাপক স্বল্পতা রয়েছে। রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধের কারণে গত দুই বছরের চেয়ে হিলিয়ামের দাম ১৩৫ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া সিলিকন টেট্রাক্লোরাইড নামে অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের দামও ৫০ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম ফাইবার অপটিক কেবল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কর্নিংয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা ওয়েন্ডেল উইকস বলেন, আমার পেশাগত জীবনে এ খাতে এমনতর মূল্যস্ফীতি দেখিনি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সরকার, টেলিকম প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ব্যাপক চাহিদার কথা মাথায় রেখে ফাইবার অপটিক কেবল নির্মাণ বাড়ানোর চেষ্টা করছে উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো।
ফাইবারের দাম ২০১৯ সালের জুলাইয়ের পর রেকর্ড সর্বোচ্চে দাঁড়িয়েছে। তবে ইউরোপ, চীন ও ভারতে যে ধাক্কা লেগেছে তেমনটা লাগেনি উত্তর আমেরিকার। উইকস জানান, ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ফাইবার অপটিক কেবলের দাম ২ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে কিছুটা সংকট গেলেও সহসাই যুক্তরাষ্ট্র তা কাটিয়ে উঠবে বলে আশাবাদী তিনি।
এক্সা ইনফ্রাস্ট্রাকচার নামে এক বৈশ্বিক ডিজিটাল অবকাঠামো প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা মার্টিন ব্ল্যানকেন জানান, গত ছয় মাসে ফাইবার অপটিকের দাম অন্তত ২০ শতাংশ বেড়েছে। গ্রাহকদের সঙ্গে চুক্তি থাকায় দাম বৃদ্ধির সঙ্গে আমরা জড়িত নই।
ফাইবার অপটিক বা অপটিক্যাল ফাইবার হলো অত্যন্ত সূক্ষ্ম এক ধরনের কাচের তন্তু। ডাই-ইলেকট্রনিক অন্তরক পদার্থ দিয়ে তৈরি কাচের তন্তুর মধ্য দিয়ে আলোর গতিতে ডাটা আদান প্রদান করা যায়। ফাইবার অপটিক্যাল কেবল অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ডাটা আদান প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যবহূত হয়। অর্থাৎ এতে গিগাবাইট রেঞ্জ বা তার থেকে বেশি দ্রুতগতিতে ডাটা চলাচল করতে পারে। পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে অপটিক্যাল ফাইবার কাজ করে।
এ কেবলের একটি বিশেষ গুণ হলো একটি ইলেকট্রনিক্যাল সিগন্যালের পরিবর্তে আলোক বা লাইট সিগন্যাল ট্রান্সমিট করে। এ কাজের জন্য ফাইবারের অভ্যন্তরে গ্লাস বা প্লাস্টিক কেবল ব্যবহূত হয়। এর মাধ্যমে ডাটা আদান প্রদানের জন্য লেজার রশ্মি ব্যবহার করা হয়। পৃথিবীর সব দেশেই এখন অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। বিপুল পরিমাণ ডাটা পরিবহনে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে আন্তঃমহাদেশীয় ফাইবার অপটিক্যাল স্থাপিত হয়েছে। এ ধরনের ফাইবারকে বলা হয় সাবমেরিন কেবল।
ফাইবার অপটিক যেভাবে কাজ করে: সবার প্রথমে এটিকে অ্যানালগ অথবা ডিজিটাল ডাটা ভোল্টেজে ট্রান্সফার করা হয়। ট্রান্সফার করার পর সেখান থেকে কারেন্টে বা বিদ্যুত্শক্তিতে রূপান্তর করা হয়। পরে ওই কারেন্টের মধ্যমে লাইট সোর্স থেকে আলো অপটিক্যাল ফাইবারের মধ্য দিয়ে পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের মাধ্যমে পাঠানো হয়। এটুকু হলো প্রেরক যন্ত্রের কাজ। এরপর আলো অপটিক ফাইবার কেবলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। কিন্তু এ আলো অনেক দূর পাঠালে আলোকশক্তি দুর্বল হয়ে যায়। দুর্বল যাতে না হয়ে যায় সেজন্য সিগন্যাল রিজেনারেটর ব্যবহার করা হয়। গ্রাহক যন্ত্রেও ঠিক বিপরীত কাজটা করা হয়। অপটিক্যাল ফাইবার সাধারণত টেলিযোগাযোগের ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহূত হচ্ছে। এছাড়া আলোকসজ্জা, সেন্সর ও ছবি সম্পাদনার কাজেও বর্তমানে ব্যবহূত হচ্ছে।