ওষুধ সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা নেই সিংহভাগ ফার্মেসিতে

ফার্মেসি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা পরিপালনে তদারকি বাড়াক ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর

নিছক সংরক্ষণের গাফিলতিতে রোগ নিরাময়ের ওষুধও যে কখনো কখনো বিষবৎ হয়ে ওঠে, তার প্রমাণ মিলছে হরহামেশাই। তার মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ রোগীদের। সরবরাহ করা ওষুধের মান নিয়ে আগে নানা অভিযোগ উঠেছে, কিন্তু মান তো অনেক পরের কথা, দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন ফার্মেসিতে যেভাবে ওষুধ সংরক্ষণ করা হয়, সে প্রক্রিয়াতেই নানা গোলমাল। কোন

নিছক সংরক্ষণের গাফিলতিতে রোগ নিরাময়ের ওষুধও যে কখনো কখনো বিষবৎ হয়ে ওঠে, তার প্রমাণ মিলছে হরহামেশাই। তার মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ রোগীদের। সরবরাহ করা ওষুধের মান নিয়ে আগে নানা অভিযোগ উঠেছে, কিন্তু মান তো অনেক পরের কথা, দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন ফার্মেসিতে যেভাবে ওষুধ সংরক্ষণ করা হয়, সে প্রক্রিয়াতেই নানা গোলমাল। কোন ওষুধ কত তাপমাত্রায় কীভাবে রাখতে হবে, সেটুকু নিয়ম মেনে চলারও তোয়াক্কা করা হচ্ছে না বহু ক্ষেত্রে। সেই উদাসীনতা আর অবহেলায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ওষুধের দ্রব্যগুণ। কখনো তা ফেলে দেয়া হচ্ছে। সেটা তবু মন্দের ভালো। কারণ, ওইসব ক্ষেত্রে তবু টাকার ওপর দিয়ে ব্যাপারটা মিটে যায়। কিন্তু বিপজ্জনক ব্যাপার হলো, কখনো কখনো সেই নষ্ট হয়ে যাওয়া ওষুধই  বিক্রি করা হচ্ছে রোগীদের কাছে। অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে দেখা দিচ্ছে নানা বিপত্তি। প্রতিষেধক টিকার ক্ষেত্রেও একই অভিযোগ। শুধু গ্রাম বা জেলা শহরে নয়, বিভাগীয় শহরের ফার্মেসিতে কোল্ড চেইন ঠিকমতো কাজ করে না, নেই তাপমাত্রা পরিমাপক কোনো যন্ত্র। এসি নেই, থাকলেও তা চালানো হয় না ব্যয় সাশ্রয়ের অজুহাতে। ওষুধ সংরক্ষণে দীর্ঘদিন চলে আসা সমস্যা সমাধানে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকেই সক্রিয় হতে হবে।

সব ওষুধের বক্স, কার্টন বা স্ট্রিপের গায়ে বাংলা ইংরেজিতে সংরক্ষণের নির্দেশনা লেখা থাকে। এক্ষেত্রে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতাও রয়েছে, যা ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানি, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের জন্যও একইভাবে প্রযোজ্য। এমনকি ভোক্তা বা ব্যবহারকারীরা যাতে ওষুধ সংরক্ষণে নির্দেশনা মেনে চলতে পারে, সেজন্য ওষুধের সব ধরনের মোড়কের গায়ে সতর্কতামূলক নির্দেশনা দেয়া থাকে। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো নির্দেশনাই যথাযথ পালন করা হয় না। দেশে ওষুধের কোল্ড চেইন মানা হচ্ছে না। একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় ওষুধগুলো রাখতে হয়। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ কক্ষে ওষুধ রাখা জরুরি। কিন্তু দেশের ৯৯ ভাগ ফার্মেসিতে নেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। এতে ওষুধের গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে। রাজধানী বিভাগীয় শহরে কিছুসংখ্যক ফার্মেসিতে কোল্ড চেইন মানা হলেও অধিকাংশ ফার্মেসিতে তা মানা হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ওষুধ একটি কেমিক্যাল সংমিশ্রণে তৈরি। কারণে নির্ধারিত তাপমাত্রায় ওষুধ রাখতে হয়। না হলে ওষুধ নষ্ট হয়ে যাবে। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না রেখেই ওষুধ সংরক্ষণ বিক্রি করা হচ্ছে। এতে নষ্ট হচ্ছে ওষুধের গুণাগুণ। ওষুধ সংরক্ষণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকলেও বাংলাদেশে তা মানা হচ্ছে না। নীতিমালায় সংরক্ষণ কক্ষের আর্দ্রতা ৬০ শতাংশের নিচে রাখার কথা বলা হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে সংরক্ষণ কক্ষে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র থাকার কথাও বলা হয়েছে নীতিমালায়। তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে আছে কিনা, সেজন্য কক্ষের একাধিক স্থানে থার্মোমিটার রাখার কথা বলা হয়েছে। সর্বোপরি কক্ষের আয়তনভেদে রাখতে হবে এক বা একাধিক রেফ্রিজারেটর ফ্রিজার। থেকে উৎপাদিত তাপ বের করে দেয়ার জন্য ব্যবস্থা করতে হবে একাধিক এগজস্ট ফ্যানের। কিন্তু রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোর অনেক ফার্মেসিরও ওষুধ সংরক্ষণে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেই। ফ্রিজার ছাড়াই ওষুধ বিক্রি করছে এসব এলাকার অধিকাংশ ফার্মেসি। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। অনেকে টিনের ঘরে ওষুধ বিক্রি করছে। দেশের বেশির ভাগ ফার্মেসিতেই উপযুক্ত ফার্মাসিস্ট থাকেন না। ক্রেতাদের ওষুধ সম্পর্কে কোনো রকম ব্রিফ করেন না। ফলে ওষুধ সেবনে রোগীরা বিভ্রান্তিতে থাকেন। এছাড়া বেশির ভাগ ফার্মেসিতে ওষুধের তাপমাত্রা সঠিকভাবে সংরক্ষিত হয় না। অনেক ওষুধ নষ্ট হয়ে যায়।

ফার্মেসি ব্যবস্থাপনা নীতিমালায় বলা হয়েছে, সংবেদনশীল ওষুধ ফ্রিজে রাখতে হবে। ফ্রিজ ২৪ ঘণ্টা চালু রাখতে হবে। নির্ধারিত শেলফে ওষুধ সংরক্ষণ করতে হবে। ওষুধ ছাড়া অন্যান্য পণ্য আলাদা শেলফে রাখতে হবে। ওষুধ ক্রয়-বিক্রয়ের রেকর্ড সংরক্ষণ করতে হবে। সেবনবিধি সম্পর্কে ক্রেতাকে বুঝিয়ে দিতে হবে। পূর্ণ কোর্সে ব্যবস্থাপত্রে নির্দেশিত নিয়মে অ্যান্টিবায়োটিক সেবনে পরামর্শ দিতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়মানুযায়ী, ফার্মাসিস্টদের ৫৫ শতাংশ কমিউনিটি ফার্মাসিতে, ৩০ শতাংশ হসপিটাল ফার্মাসি, শতাংশ ম্যানুফ্যাকচারিং, শতাংশ সরকারি সংস্থায়, শতাংশ একাডেমিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে কমিউনিটি কিংবা হসপিটাল ফার্মাসিতে কোনো গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নেই। কারণ, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট ফার্মেসিতে কাজ করতে আগ্রহী হন না বলে অভিযোগ।

ওষুধ সাধারণত তিন ধরনের তাপমাত্রায় সংরক্ষণের নিয়ম। বায়োলজিক্যাল বা ভ্যাকসিন-জাতীয় ওষুধ - ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখতে হয়। অ্যান্টিবায়োটিক জাতীয় ওষুধ রাখতে হয় ১২-২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়। কিছু ওষুধ স্বাভাবিক তাপমাত্রা, ২৫-৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা যায়। এর ব্যতিক্রম হলেই সমস্যা। কারখানায় মানসম্পন্ন ওষুধ উৎপাদন হলেও তাপমাত্রা অনিয়ন্ত্রিত ফার্মেসি থেকে এসব ওষুধ সংগ্রহ করে রোগীরা মানসম্পন্ন ওষুধ গ্রহণ করতে পারছেন না। ফলে রোগীর সুচিকিৎসা নিশ্চিত হচ্ছে কিনা, তা নিয়ে গভীর সন্দেহ থেকেই যায়। রোগ নিরাময়ে ওষুধ কতটুকু কাজ করবে, সেটা নির্ভর করবে রোগীকে মানসম্পন্ন ওষুধ নিশ্চিত করা যাচ্ছে কিনা, এর ওপর। কিন্তু আমাদের দেশে যে পরিবেশে ওষুধ সংরক্ষণ করে রোগীর হাতে দেয়া হচ্ছে, সেক্ষেত্রে প্রশ্ন থেকেই যায়। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে ফার্মেসিতে এসি থাকতে হয়। বায়োলজিক্যাল ওষুধের জন্য আলাদা ফ্রিজের ব্যবস্থা করতে হয়। কিন্তু আমাদের শহর গ্রামের অধিকাংশ ফার্মেসি এসব নিয়ম মেনে চলার মতো সামর্থ্য রাখে না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিস্থিতি এতটাই ভয়ানক হয়ে উঠেছে যে, দেশের ১০ শতাংশেরও কম ওষুধের দোকানে সঠিকভাবে তাপমাত্রা ব্যবস্থাপনা কার্যকর আছে, বাকি সব চলছে বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্য দিয়ে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরও চেষ্টা চালাচ্ছে। চালু করেছে মডেল ফার্মেসি ব্যবস্থা। কিন্তু প্রক্রিয়াও এগোচ্ছে ধীরগতিতে। বেশির ভাগ ওষুধের কার্যকারিতার সঙ্গে তাপমাত্রার সম্পর্ক রয়েছে। যদি সঠিক তাপমাত্রায় এসব ওষুধ সংরক্ষণ করা না হয়, তবে ওই ওষুধের ওপরের মোড়ক, স্ট্রিপ কিংবা বোতল যতই চকচকে থাকুক না কেন, মেয়াদ যত দিনই থাকুক না কেন, ভেতরের গুণাগুণ নষ্ট হওয়া স্বাভাবিক। কিছু ওষুধ গলে যেতে পারে কিংবা রঙ বদলে যেতেও দেখা যায়। বাকি ওষুধের গুণাগুণ সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব হয় না। এসব ওষুধ সেবনে কাজের কাজ কিছুই হয় না। এর মাধ্যমে রোগীরা আসলে এক রকম প্রতারিত হয়ে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে নষ্ট ওষুধের কারণে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার শিকার হন অনেকে।

ফার্মাসিস্টদের প্রশিক্ষণের নামে তিনদিন বা এক সপ্তাহের নামমাত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের সি ক্যাটাগরির ফার্মাসিস্ট হিসেবে চালিয়ে দেয়া হয়। এসব বিক্রেতা ওষুধের তাপমাত্রা বা অন্য নিয়ম-কানুন সম্পর্কে ভালোভাবে নিজেরাও যেমন জানেন না, ক্রেতাদেরও জানাতে পারেন না। যদিও আগের তুলনায় এখন ফার্মেসিগুলোর ওপর ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নজরদারি অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে নিয়মিত পরিদর্শন করা হচ্ছে এবং ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আর লাইসেন্স দেয়া নবায়নের ক্ষেত্রেও আগের তুলনায় অনেক কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। অনেক ওষুধ একসঙ্গে একই তাপমাত্রার পরিবহনে বহন করা হয়। কিন্তু এসব ওষুধের ভেতর অনেকগুলোরই ভিন্ন ভিন্ন তাপমাত্রা অপরিহার্য। সেদিকে খেয়াল রাখা হয় না। ওষুধের দোকানগুলোয় একই তাপমাত্রায় অনেক ওষুধ রাখা হয়। এসব দোকানে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির ওপর গেলেও যেখানে যেভাবে ওষুধ রাখা হয়, তাপমাত্রা নিচে থাকলেও একইভাবে তা সংরক্ষণ করা হয়, যা খুবই বিপজ্জনক। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে চিঠি দিয়ে সারা দেশে ওষুধের তাপমাত্রা সঠিকভাবে অনুসরণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন সেটা পালিত হলেও পরে আবার বিশৃঙ্খল অবস্থা শুরু হয়েছে। ওষুধ সংরক্ষণে নীতিমালা ফার্মেসিগুলো যথাযথ পালন করছে কিনা, তা দেখভালে নিয়মিত তদারকির বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে ঔষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সর্বোপরি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।

বেশির ভাগ ওষুধই - ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে রাখা উচিত। তার বেশি হলেও সমস্যা, কম হলেও সমস্যা। অনেক ফার্মেসিতে যেভাবে ওষুধ রাখা হয়, তার তাপমাত্রা ঠিকঠাক থাকে না। আর ঠিক যে নেই, সেটা জানাও থাকে না সেখানকার কর্মীদের। সব মিলিয়ে প্রক্রিয়াটাই ধাক্কা খায়। তাই নিয়মিত নজরদারি জরুরি। সেই সঙ্গে কর্মীদের সচেতন করার জন্য প্রয়োজন যথাযথ প্রশিক্ষণেরও। তা না-হলে শুধু ওষুধ নয়, নষ্ট হবে প্রতিষেধক টিকাও। অর্থাৎ প্রশিক্ষণ কর্মীদের সচেতনতা ছাড়া সমস্যাটির সুরাহা সম্ভব নয়। রোদ লেগে বা গরমে ওষুধ খারাপ হয়ে যায় বহু ক্ষেত্রেই। অথচ তার মেয়াদ ফুরোতে তখনো হয়তো দুই বছর বাকি। সেই তারিখ দেখেই নিশ্চিন্ত হয়ে রোগীদের ওষুধ খাওয়ানো হয়, যা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। সমস্যা এড়ানোর জন্য ওষুধ বা টিকার মোড়কে ফটো সেনসিটিভ টেম্পারেচার সেনসিটিভিটি লেবেল লাগিয়ে রাখা যেতে পারে। সূর্যের আলো পড়লে বা গরমে ওই লেবেলের রঙ বদলে যাবে। তাতেই ধরা পড়বে ওষুধ ঠিক আছে কিনা। এতে খরচ সামান্য বেশি পড়বে ঠিক, কিন্তু নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হবে। এছাড়া ডিজিটাল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাপমাত্রার দিকে নজর রাখা, তাপমাত্রা ঠিকমতো মাপা হচ্ছে কিনা, তা দেখার জন্য কর্মী নিয়োগ করা প্রয়োজন। শুধু তা- নয়, কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেয়া, ফ্রিজ নিয়মিত ডিফ্রস্ট করা, গাড়িতে প্রতিষেধক টিকা সরবরাহের সময় আইস প্যাক ঠিকঠাক রাখা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য ব্যবস্থা, যা গ্রহণ করা জরুরি। কীভাবে কোল্ড চেইন বজায় রাখা উচিত, বজায় না রাখলে কী কী সমস্যা হতে পারে, সেই ব্যাপারে স্বাস্থ্যকর্মীদের একটা বড় অংশের কোনো ধারণাই নেই এবং সেটা খুবই বিপজ্জনক।

আরও