গুটিকয়েক নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে (এনবিএফআই) ঘটে যাওয়া অনিয়মের কারণে বর্তমানে পুরো খাতটি আস্থার সংকটে ভুগছে। তাই এ খাতে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রতিষ্ঠানগুলোতে অভ্যন্তরীণ সুশাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে খাতটিতে এখন সুশাসন একেবারেই নেই, এমনটি নয়। বরং সুশাসন আছে বলেই বাংলাদেশের তথ্যের ভিত্তিতে প্রশান্ত কুমার হালদার বা পিকে হালদারের গ্রেফতার সম্ভব হয়েছে। তবে আরো বেশি মাত্রায় সুশাসন প্রতিষ্ঠান বিকল্প নেই।
গতকাল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ‘অর্থনৈতিক উন্নয়নে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। বণিক বার্তা ও বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশন (বিএলএফসিএ) যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে।
সভায় পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম বলেন, কভিডকালেও আমরা সামষ্টিক অর্থনীতিকে ভালোভাবে ব্যবস্থাপনা করতে পেরেছি। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যের মতো পরিণত অর্থনীতি এমনকি ভারতও প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক অবস্থানে গিয়েছে। তবে আমাদের সে অবস্থা হয়নি। কারণ আমরা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে এগিয়েছি।
তিনি বলেন, ২০২১ সালে কী হবে সে লক্ষ্যমাত্রা আমরা ২০১০ সালে ঠিক করেছিলাম। ওই সময় আমরা মাথাপিছু আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ২০২১ সালে ২ হাজার ডলার নির্ধারণ করেছিলাম। ২০২১ সালের শেষে আমাদের মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫৯১ ডলার। প্রধানমন্ত্রী যখন ক্ষমতা গ্রহণ করেন তখন ছিল ৭২০ ডলার। এ প্রবৃদ্ধি বিস্ময়কর। কভিডের পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে মূল্যস্ফীতি অবশ্যই একটা চ্যালেঞ্জ। তাই বাজেট ব্যবস্থাপনায় মূল্যস্ফীতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।
অনেকেই বলছে বাংলাদেশ শ্রীলংকা হয়ে যাবে, কিন্তু এটা কখনো ঘটবে না—এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, ভুলভ্রান্তি যেকোনো দেশেরই হতে পারে। এখান থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি। কিন্তু বাংলাদেশ কখনো শ্রীলংকার মতো পরিস্থিতিতে যাবে না। কারণ বাংলাদেশ ২০১০ সাল থেকেই পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে এবং এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের ভুল করেনি।
বৈঠকে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নে সংশ্লিষ্টদের বিভিন্ন সুপারিশ বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) উদ্যোগ নেবে এমন প্রত্যাশা জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থ সংকটে রয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের কৌশলগত সহায়তা দেবে। কারণ আমরা চাই এসব প্রতিষ্ঠানের প্রসার ঘটুক। এজন্য বন্ড মার্কেট থেকে আমানত সংগ্রহের বিষয়টিকে আরো সহজ করতে হবে। বন্ড মার্কেটের বিকাশের অনেক সুযোগ রয়েছে।
এ খাতে সুশাসন রয়েছে বলেই বাংলাদেশের তথ্যের ভিত্তিতে পিকে হালদার গ্রেফতার হয়েছেন উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, খাতটিতে আরো সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা খুব বেশি বলা হলেও তাতে সমস্যা নেই। প্রয়োজনে একীভূত করা যাবে, তবে প্রতিযোগিতার জন্য সংখ্যা না কমানোই ভালো। নিয়ম-কানুন মেনে লাইসেন্স নেবে, টিকতে না পারলে বন্ধ হয়ে যাবে। সরকার এটির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। এজন্য একীভূত আইনটা হওয়া দরকার।
ভিডিও বার্তায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের অর্থনীতিতে ব্যাংকের পাশাপাশি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা এনবিএফআইয়ের যথেষ্ট অবদান রাখার অবকাশ রয়েছে। ব্যাংক থেকে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে এনবিএফআইকে নিজেদের তুলে ধরতে হবে। কারণ ব্যাংক গ্রাহককে যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেয়, এনবিএফআইও যদি একই জিনিস করে, তাহলে গ্রাহকের কাছে তাদের আলাদা গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না। আমার মনে হয় যুক্তিসংগতভাবে এনবিএফআইয়ের সংখ্যা নির্ধারণের সময় এসেছে। যারা তুলনামূলক দুর্বল, তাদের অন্য এনবিএফআই বা ব্যাংকের সঙ্গে মার্জ করতে হবে।
সাবেক গভর্নর আতিউর রহমান বলেন, বাংলাদেশের অনেক এলাকা যেমন নানা কারণে প্রথাগত ব্যাংকিং সেবার বাইরে ছিল, তেমনি ব্যাংকিং সেবা পাওয়া যায় এমন এলাকাতেও এমন নাগরিক বা উদ্যোক্তা ছিলেন, যাদের চাহিদা মেটাতে প্রথাগত ব্যাংকিং যথেষ্ট ছিল না। এ শূন্যস্থান পূরণে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অভিযানে আমরা যুক্ত করেছিলাম এমএফআই ও এনবিএফআইগুলোকে। এনবিএফআই তথা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের আর্থিক সেবার প্রসারে একটি অনন্য ভূমিকা সেই সময় থেকেই পালন করে আসছে এবং তারা বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির শক্তিশালী যে অবস্থান সেখানে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আহমেদ জামাল বলেন, গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের কারণে বর্তমানে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। তবে এখনো এ খাত নিয়ে মানুষের আগ্রহ রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানের আর্থিক কাঠামোতে বাধ্য হয়ে ব্যাংকগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন করতে হচ্ছে। যদি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্ত অবস্থানে থাকত, তাহলে ব্যাংকগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে যেতে হতো না। এতে সবার জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করাটাই এখন চ্যালেঞ্জ। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকও কাজ করছে। ফাইন্যান্স অ্যাক্ট সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের একার পক্ষে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না। এজন্য প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অ্যাসোসিয়েশনকেও এগিয়ে আসতে হবে।
বিএসইসির কমিশনার অধ্যাপক ড. শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৩টিই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত। সেজন্য আমাদের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হচ্ছে করপোরেট সুশাসনের দিকটি দেখা। আমরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনুসৃত উত্তম চর্চা ও ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টের গাইডলাইনের সমন্বয়ে একটি করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড তৈরি করেছি। বাংলাদেশ ব্যাংকও এ কোডটিকে আগামীতে আরো যুগোপযোগী করতে চাইছে। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার জন্য আমাদের যে লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, সেটি অর্জনের ক্ষেত্রে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো একটি খাতকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যাবে না। বরং তাদেরকে আরো ভূমিকা রাখার সুযোগ দিতে হবে।
আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএলএফসিএ চেয়ারম্যান এবং আইপিডিসি ফাইন্যান্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে ৩৪টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ২৮৪টি শাখার মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানে সম্মিলিত অর্থায়নের পরিমাণ ৬৭ হাজার ১২০ কোটি টাকা। এটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের সামগ্রিক ঋণের ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় বর্তমানে ৬ হাজার ৪৪৩ জন কর্মরত আছে।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও স্বল্পসংখ্যক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঘটে যাওয়া অনিয়মের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে এ খাতের ভাবমূর্তি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে খাতটিতে তহবিল সংগ্রহসহ কার্যক্রমের সম্প্রসারণ ব্যাহত হয়েছে। সামগ্রিকভাবে এ খাতের ভবিষ্যৎ নিয়েই একটি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সমস্যাকবলিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মূলে রয়েছে অভ্যন্তরীণ সুশাসনের ঘাটতি, যা কোনোভাবেই ব্যবসায়িক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, কয়েকটি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের কেলেঙ্কারির কারণে খাতটিতে সংকট তৈরি হয়েছে। এজন্য খাতটির উন্নয়নে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। তাই আইন-কানুন খুব বেশি কঠিন করাও ঠিক হবে না, আবার একেবারে ছেড়ে দেয়াও ঠিক হবে না।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান বলেন, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিয়েছে। তাই এ খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিকল্প কিছু নেই। পাশাপাশি এ খাতের উন্নয়নে গবেষণার পাশাপাশি জনসচেতনতা তৈরিতে বেশি বেশি সভা-সেমিনার আয়োজনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক হুমায়ুন কবির বলেন, আগে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণে কিছুটা দুর্বলতা ছিল। তবে বর্তমানে সেটা ধীরে ধীরে দূর হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইনে সংস্কার করা হচ্ছে।
পিডব্লিউসি বাংলাদেশের ম্যানেজিং পার্টনার মামুন রশীদ বলেন, ভারত, তাইওয়ান ও মালয়েশিয়ায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কারের সময় ইনডিপেনডেন্ট ডিরেক্টরদের সঠিকভাবে কাজে লাগিয়েছে। বাংলাদেশেও এ ধারণা প্রয়োগ করা যেতে পারে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানে যা করার কথা ছিল আমরা সেটা করতে পারছি কিনা—এমন প্রশ্ন রেখে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবীব বলেন, স্বাধীনতার পর নিজেদের কাজের পাশাপাশি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং মার্কেটেরও কাজ করেছে ব্যাংক। আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে আসার কারণ ছিল মোড অব ফাইন্যান্সের সঙ্গে সরাসরি যোগসূত্র স্থাপন করা। কিন্তু আমরা তা করতে পারছি না। এতে ব্যাংক ও নন-ব্যাংকের ক্ষেত্রগুলো অনেকটা একই রকম রয়ে গেছে। ব্যাংক সবচেয়ে বেশি রেগুলেট হওয়ার কথা, তার থেকে কম রেগুলেট হওয়ার কথা নন-ব্যাংক। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংককে এটা করতে হচ্ছে কারণ ব্যাংক ও নন-ব্যাংকের কিছু ক্ষেত্র একই রকম।
এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মফিজুর রহমান বলেন, যেভাবে বাংলাদেশ থেকে লুটপাট করে বিদেশে টাকা পাচার হচ্ছে, সেই তুলনায় পতনের পরিস্থিতি যথেষ্ট সহনীয় অবস্থায় রয়েছে। আশা করছি আমরা এখন পতনোন্মুখ পরিস্থিতি কাটিয়ে ওপরের দিকে যেতে পারব। তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরেকটু ভালো করে তদারকি করতে হবে।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সভাপতি ছায়েদুর রহমান বলেন, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্যাপিটাল মার্কেটে এক্সপোজার নিয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এজন্য পুুঁজিবাজার ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান উভয় ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ এক্সপোজার সমন্বয়ে কমপক্ষে তিন বছর সময় দেয়া প্রয়োজন ছিল। নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক একই ধরনের পণ্য নিয়ে ব্যবসা করে। তাই আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য টিকে থাকা কঠিন হয়ে যায়। এক্ষেত্রে পুঁজিবাজার নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আয়ের উৎস ছিল, সেটাও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
শান্তা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের ভাইস চেয়ারম্যান আরিফ খান বলেন, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রথম জামানতবিহীন এসএমই ঋণ দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানের ভালো দিক আছে। এখন কয়েকটি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান হাউজিংয়ের ক্ষেত্রে ঋণ দিচ্ছে, যেটা খুবই ভালো। আগামীতে এভাবে বিশেষায়িত সেবার দিকেই যেতে হবে। কিছু নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থা খুব খারাপ। অনেক ব্যাংকের অবস্থাও কিন্তু খারাপ। আসলে যে প্রতিষ্ঠানে সুশাসন রয়েছে তারা ভালো করছে।
আইডিএলসি ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জামাল উদ্দিন বলেন, সামান্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের কারণে গোটা খাতকে কঠোর নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে অনেক ভালো প্রতিষ্ঠানও সমস্যায় পড়ে যাবে। আমি মনে করি, আমাদের এ পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার উপায় খুঁজে বের করতে হবে। শৃঙ্খলা ঠিক রাখার পাশাপাশি যারা ভালোভাবে কাজ করতে চায়, তাদের জন্য সহজতর নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
ডেল্টা ব্র্যাক হাউজিং ফাইন্যান্স করপোরেশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও নাসিমুল বাতেন বলেন, একটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, আমরা এখনো এনবিএফআই ও ব্যাংকের মধ্যে পার্থক্য করতে পারিনি। এজন্য দেখা যাচ্ছে, এনবিএফআইয়ের একটি প্রতিষ্ঠান একটি নতুন পণ্য নিয়ে এলে ব্যাংকও সেটি অফার করছে। অর্থাৎ আমাদের এখনো ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। এটি একটি অসম প্রতিযোগিতা। কারণ ব্যাংকের তুলনায় এনবিএফআইয়ের তহবিল সংগ্রহ প্রক্রিয়া অনেক কঠিন।
ইউনাইটেড ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কায়সার তমিজ আমীন বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এনবিএফআই খাতের মূল নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় থাকলেও এসইসি, এনবিআর, আরজেএসসিও বিভিন্ন বিষয় দেখভাল করে। যখন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান পরস্পর সাংঘর্ষিক হয়, সেটা আমাদের জন্য অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করে। এজন্য নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি আরো একত্রিত ও সমন্বিতভাবে আমাদের পথ নির্দেশ করে, তা আমাদের জন্য বেশি কল্যাণের হবে। পাশাপাশি আমাদের নিজেদের দিক থেকেও সুশাসনের কর্মসূচিগুলো আরো বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. কায়সার হামিদ বলেন, এসএমইতে বাংলাদেশ ব্যাংকের যেসব পুনঃঅর্থায়ন তহবিল রয়েছে, সেখানে আমরা যদি প্রি ফাইন্যান্সিং করতে পারি তাহলে সুবিধা হয়। সম্প্রতি পুঁজিবাজারে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ সীমার সংজ্ঞা-সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এটি খুবই প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
লংকান অ্যালায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কান্তি কুমার সাহা বলেন, ইমেজ সংকটের কারণে ফান্ড সংগ্রহ করা এনবিএফআইয়ের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তাই আমি মনে করি, এ খাতে সেভিংস অ্যাকাউন্ট দিলে সমস্যা কোথায়। চেক ছাড়া শুধু কার্ড দিয়ে তা পরিচালনার সুযোগ রয়েছে। আমি মনে করি, যদি দীর্ঘমেয়াদি ফাইন্যান্সগুলো শুধু এনবিএফআইয়ের অধীনে ছেড়ে দেয়া যায়, তাহলে এ খাতের দ্রুত প্রসার ঘটবে।
হজ্ব ফাইন্যান্স কোম্পানী লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খন্দকার রুমী এহসানুল হক বলেন, এনবিএফআইয়ের কনফিডেন্সের অনেক বেশি অভাব রয়েছে। তহবিল সংগ্রহের ক্ষেত্রে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাংকনির্ভর। যদিও বিভিন্ন কারণে এখন ব্যাংকগুলোও দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে। তাই সম্প্রতি এনবিএফআইয়ের জন্য ডিপোজিট ও ইনভেস্টমেন্টের একটি হার নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এটি পুনর্বিবেচনা করলে ভালো হয়।
সিভিসি ফাইন্যান্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মিনহাজ আহমেদ বলেন, আশপাশের দেশগুলোসহ উন্নত বিশ্বে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হওয়ার জন্য বিভিন্ন শর্ত পূরণ করতে হয়। আমি মনে করি, সুশাসন নিশ্চিতের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের এ বিষয়টি বিবেচনায় নেয়ার সময় এসেছে। এছাড়া ছোট পরিসরে হলেও ডিজিটালি বিনিয়োগ সংগ্রহ ও ঋণ বিতরণের সুযোগ দিলে প্রান্তিক অঞ্চলেও খুব সহজে সেবা পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে।
লংকাবাংলা ফাইন্যান্সের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও হেড অব ট্রেজারি কামরুল ইসলাম বলেন, অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট উপেক্ষিত একটি বিভাগ। যদিও ফান্ড ম্যানেজমেন্টের পাশাপাশি ব্যালান্সশিটের ক্ষেত্রেও এ বিভাগের অনেক বড় দায়িত্ব রয়েছে। আর ব্যালান্সশিট ম্যানেজমেন্ট সুশাসনেরও একটি বড় অংশ। সর্বোপরি এনবিএফআই খাতের উন্নয়নে করপোরেট সুশাসন অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।
আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. শহীদুল জাহীদ এবং বিটিআইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এফআর খান। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন হকস বে অটোমোবাইলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল হক, আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান, বে লিজিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ইফতেখার আলী খান, আইআইডিএফসি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া, এএএ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. ওবায়দুর রহমান, ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজ লিমিটেডের সিইও আহসানুর রহমান, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক সিকিউরিটিজ লিমিটেডের সিইও মো. আনোয়ার হোসেন ও ভিআইপিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের সিইও শহিদুল ইসলাম, প্রভা অরোরার প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিধান চন্দ্র পাল, আভিভা ফাইন্যান্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুল জব্বার, ফার্স্ট ফাইন্যান্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন, মেরিডিয়ান ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী নিজাম আহমেদ, আরবিআই ফাইন্যান্স লিমিটেডের এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারম্যান সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সালেহ ও পিডব্লিউসি বাংলাদেশের ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিড মো. সাদেকুজ্জামান প্রমুখ।