দরিদ্র-প্রান্তিক ও আদিবাসীদের জন্য বাজেটে বরাদ্দ বাড়াতে হবে

বাজেটে দরিদ্র-প্রান্তিক ও আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দ নিতান্তই কম। আসন্ন বাজেটে এ শ্রেণী-পেশার মানুষের জন্য বরাদ্দ বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন বক্তারা। গতকাল অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি) ও বণিক বার্তার উদ্যোগে ‘দারিদ্র্য ও বৈষম্য রোধে নারী, আদিবাসীসহ প্রান্তিকজনের বর্ধিত বাজেট ও অংশগ্রহণের গুরুত্ব’ শীর্ষক ওয়েবিনারে এসব বলেন বক্তারা।

বাজেটে দরিদ্র-প্রান্তিক ও আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দ নিতান্তই কম। আসন্ন বাজেটে এ শ্রেণী-পেশার মানুষের জন্য বরাদ্দ বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন বক্তারা। গতকাল অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি) ও বণিক বার্তার উদ্যোগে ‘দারিদ্র্য ও বৈষম্য রোধে নারী, আদিবাসীসহ প্রান্তিকজনের বর্ধিত বাজেট ও অংশগ্রহণের গুরুত্ব’ শীর্ষক ওয়েবিনারে এসব বলেন বক্তারা।

এএলআরডির চেয়ারপারসন ও নিজেরা করির সমন্বয়কারী খুশী কবিরের সভাপতিত্বে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শফিক উজ জামান, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, সমকালের উপদেষ্টা সম্পাদক আবু সাঈদ খান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা। এছাড়া অঞ্চলভিত্তিক আলোচকদের মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে অংশ নেন সরকারি হাজী মুহম্মদ মুহসীন কলেজের অধ্যাপক ইদ্রিস আলী, সুনামগঞ্জ থেকে হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি আবু সুফিয়ান, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন, রাজশাহীর রুলফাওয়ের পরিচালক আফজাল হোসেন, খুলনার রূপান্তরের নির্বাহী পরিচালক রফিকুল ইসলাম খোকন, গ্রাম বিকাশ কেন্দ্রের পরিচালক সারা মারান্ডি। বৈঠকে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ও গবেষক ড. আবুল বারকাত। বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ সূচনা বক্তব্য দেন।

সভাপতির বক্তব্যে খুশী কবির বলেন, আলোচনায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। নভেম্বর থেকে আমরা যদি বাজেট প্রণয়ন কমিটির সঙ্গে বসতে পারি, তাহলে আমরা জনগণের কী দাবি তা তুলে ধরতে পারব। পাশাপাশি মাঠ থেকে কী কী পাওয়া যায়, সে বিষয়গুলো নিয়ে আমরা ফেব্রুয়ারিতে একবার বসলে জনগণের দাবি তুলে ধরতে পারব। কারণ বাজেটে জনগণের অংশগ্রহণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ও গবেষক ড. আবুল বারকাত বলেন, বাজেটে দরিদ্র-প্রান্তিক মানুষের জন্য বরাদ্দ কত—এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য আমাদের কাছে নেই। তাই আমরা দরিদ্র ও প্রান্তিক শ্রেণীকে চারটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে নিয়েছি। পারিবারিক কৃষি, গ্রামীণ নারী, আদিবাসী ও কৃষিভূমি জলাশয়। এ চার শ্রেণীর জন্য বাজেটে যে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে তা মোটেও যথেষ্ট নয়। আমরা ভেবেছিলাম করোনা বোধহয় শেষ, কিন্তু আসলে করোনা এখনো শেষ হয়নি। ২০১৮-১৯ সালে আমরা বৈশ্বিক আর্থিক মহামন্দা দেখলাম, এর পরই দেখলাম কভিডের হানা। কভিডের মধ্যেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে। বিশ্ব এর আগে একসঙ্গে এতগুলো সমস্যার মুখোমুখি হয়নি।

তিনি বলেন, মহামারীতে স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। গত দুই বছরে নতুন করে ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমায় প্রবেশ করেছে। ফলে প্রান্তিকতা, বঞ্চনা, বৈষম্য দ্বিগুণ হারে বেড়েছে মহামারীকালে। সুতরাং দরিদ্র-প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাভাবিক সময়ে বাজেটের যে গুরুত্ব, করোনাকালে তা বেড়েছে বহুগুণ। 

আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শফিক উজ জামান বলেন, আজকের আলোচনাটি একটি ব্যতিক্রমী বাজেট আলোচনা। সাধারণত এ ধরনের আলোচনা হয় না। অথচ এমন আলোচনাই হওয়া উচিত। আমাদের দেশে বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ ও আদিগোষ্ঠীর লোক আছে। এটাই আসলে বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্য। আদিবাসী সংখ্যা যতই কম হোক না কেন তারা আমাদের সম্পদ। তারা কী অবদান রাখছেন অর্থাৎ পণ্যের দৃষ্টিতে না দেখে তাদের যদি সংস্কৃতির দৃষ্টিতে দেখি, তাহলে বোঝা যাবে তারা আমাদের অনেক বড় সম্পদ। তার পরও তারা আমাদের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। বাজেটে আদিবাসীদের জন্য মাত্র ৮ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হয়। এটা ১০ শতাংশ করা উচিত।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে আমরা একটি কঠিন সময় পার করছি। আদিবাসীদের সঙ্গে নিয়েই আমাদের সবাইকে এগিয়ে যেতে হবে। কাউকে পেছনে ফেলে আমরা বড় কোনো উন্নয়ন দেখতে পাব বলে আমার মনে হয় না। আশার কথা হলো, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় আদিবাসীদের কথা অন্তত বলা আছে। এখন সেটা বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, আদিবাসীদের অংশগ্রহণ আছে কিনা ইত্যাদি বিষয় এখন গভীরভাবে ভাবতে হবে।

সমকালের উপদেষ্টা সম্পাদক আবু সাঈদ খান বলেন, এটা ঠিক যে বাংলাদেশ এগিয়েছে, তবে অনেকেই পেছনে পড়ে রয়েছে। পেছনে পড়ে থাকাদের এগিয়ে নেয়ার জন্য প্রবন্ধ উপস্থাপক প্রস্তাব করেছেন। সংবিধানের ১০, ১৯, ২৩সহ আরো কয়েকটি ধারায় বলা হয়েছে, পিছিয়ে থাকা মানুষকে এগিয়ে নিয়ে এসে বৈষম্য কমিয়ে আনা। ১০ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, একটি ন্যায়ানুগ সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এখানে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি বিনির্মাণ। আমি মনে করি, অন্তত বৈষম্য কমিয়ে আনা এটা তো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকারের মধ্যে পড়ে। সুতরাং বৈষম্য কমিয়ে আনার জন্য দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রয়োজন বলে মনে করছি।

নিরূপা দেওয়ান বলেন, বাজেট প্রণয়নের ব্যাপারে সরকারের কাছে আদিবাসী বা প্রান্তিক জনগণ যাবে না, বরং সরকারকেই কাছে আসতে হবে। আমাদের এলাকার জন্য যে বাজেট হবে, সেখানে আমাদের স্থানীয় জনগণ কী চায়, কোথায় অপূর্ণ আছে, এসব বিষয় মাঠ থেকে তথ্য নিয়ে বাজেট করতে হবে বলে মনে করি। কিন্তু বাজেট যারা করেন, তারা মাঠ থেকে তথ্য না নেয়ার কারণে বাজেটে আমাদের কাঙ্ক্ষিত চাহিদার প্রতিফলন দেখি না। একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক দেশ কখনই কাউকে পেছনে রেখে এগিয়ে যায় না।

এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, আলোচনায় অনেক বিষয়ই উঠে এসেছে। এর মধ্যে ভর্তুকির কিছু বিষয় উঠে এসেছে। পানি সমস্যা দূর করার কথা বলা হয়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে ভূপৃষ্ঠে পানির আধার নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে বাজেটে বরাদ্দ রাখতে হবে। আমরা বারবার বলে আসছি, বাজেট প্রণয়নের জন্য সরকারকে জনগণের কাছে আসতে হবে। বাজেটে কী থাকবে কী থাকবে না সেটি নিচ থেকে ওপরের দিকে যেতে হবে।

সরকারি হাজী মুহম্মদ মুহসীন কলেজের অধ্যাপক ইদ্রিস আলী বলেন, ভালো লাগছে বাজেট নিয়ে আমরা সুনির্দিষ্ট আলোচনা করতে পারছি। অর্থাৎ কোন খাতে বরাদ্দ কত হওয়া উচিত সে বিষয় নিয়ে আমাদের এ আলোচনাই বলে দিচ্ছে আমাদের দেশ উন্নতির দিকে এগোচ্ছে। প্রান্তিক জনগণের জীবনমান উন্নত করতে বাজেটে অবশ্যই বরাদ্দ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি গ্রামীণ কৃষিকেও বাজেটে গুরুত্ব দিতে হবে।

সুনামগঞ্জ থেকে হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি আবু সুফিয়ান বলেন, আমার সুপারিশ হলো, হাওরের যে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের তালিকা করে প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হোক। দ্বিতীয় কথা হলো, কৃষক পরিবারের নারীকে বাদ দিয়ে কৃষির কথা কল্পনা করা যায় না। পুরুষদের মতো তারাও প্রচুর শ্রম দেন। কিন্তু হাওর অঞ্চলের নারীরা ভালো চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত। হাওর অঞ্চলের যেসব এলাকায় কমিউনিটি ক্লিনিক নেই, সেখানে ক্লিনিক সেবার ব্যবস্থা করা হোক।

জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন বলেন, আজকের আলোচনায় আমি অভিভূত ও আপ্লুত। কিছু রাজনৈতিক দল তো আদিবাসীদের মানুষই মনে করে না। তারা দেশের জনগণ নয়, বরং উচ্ছিষ্ট মনে করে। ফলে আমাদের জন্য তেমন উন্নয়নমূলক বাজেট করা হয় না। সম্প্রতি বরেন্দ্র অঞ্চলের দুজন কৃষক পানি না পেয়ে আত্মহত্যা করেছেন। আমি বলব, তাদের হত্যা করা হয়েছে। তারা তো শুধু আদিবাসী নন, কৃষকও। কিন্তু তাদের পানি দেয়া হয়নি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা, সুবিধাবাদীরা আদিবাসীদের পুকুর দখল করে রেখেছে। কবরস্থানের জায়গা দখল করে রেখেছে। এ বিষয়গুলোর সুরাহা হওয়া প্রয়োজন। সরকার আমাদের অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু এগুলোর বাস্তবায়নের কোনো লক্ষণই দেখছি না। 

রাজশাহীর রুলফাওয়ের পরিচালক আফজাল হোসেন বলেন, আমি বরেন্দ্র এলাকার মানুষ। এখানে পদ্মা আছে, যমুনা আছে, চলনবিল আছে, লক্ষাধিক পুকুর আছে, তার পরও জলের সংকট। বর্ষাকালে প্রচুর জল হয়, গ্রীষ্মকালে জল পাওয়া যায় না। বরেন্দ্র এলাকা থেকে জলের অভাবে শুধু আদিবাসী নয়, সাধারণ জনগণও স্থানান্তরিত হচ্ছে। আমাদের দাবি হলো, এসব এলাকার জলের আধার তৈরি করার জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখতে হবে। কৃষকদের জন্য বরাদ্দ রাখতে হবে। 

খুলনার রূপান্তরের নির্বাহী পরিচালক রফিকুল ইসলাম খোকন বলেন, এ প্রস্তাবগুলো শুধু বাজেটকেন্দ্রিক না রেখে প্রাক নির্বাচনী মেনিফেস্টো যারা প্রণয়ন করেন, তাদের কাছে নিয়ে যাওয়া যায় কিনা সে বিষয়টিও ভেবে দেখা দরকার।

গ্রাম বিকাশ কেন্দ্রের পরিচালক সারা মারান্ডি বলেন, একটি জাতির উন্নয়নের জন্য সবাইকেই এগিয়ে নিতে হবে। আমাদের মধ্যে যারা প্রান্তিক জনগণ তাদের পেছনে রেখে দেশকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। আদিবাসীদের ভূমি নিয়ে সমস্যা রয়ে গেছে। উন্নত দেশগুলোতে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের আগে আদিবাসীদের মতামত নেয়া হয়। আমাদের শিক্ষা-সংস্কৃতিতেও আদিবাসীরা পিছিয়ে। এসব বৈষম্য দূর করতে হবে।

বরিশালের কারিতাসের কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট অফিসার মংমে বলেন, ষাটের দশকেও আমাদের এখানে লক্ষাধিক রাখাইন ছিল, এখন মাত্র দুই থেকে আড়াই হাজার রাখাইন টিকে আছে। বাংলাদেশ সরকার কি গবেষণা করে দেখেছে, কেন রাখাইনদের সংখ্যা কমে গেছে? আমার মনে হয় করেনি। আমাদের রাখাইন নারীরা তাঁতের কাজে পারদর্শী। কভিডে তারা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। কিন্তু আমি দেখিনি, সরকার তাদের কোনো প্রণোদনা দিয়েছে কিংবা কোনো ব্যবস্থা করেছে। এ বৈষম্য দূর হওয়া দরকার।

আরও