আগামী অর্থবছরের বাজেটে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয়ার সুপারিশ করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। এছাড়া নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানিতে শুল্কছাড় এবং ব্যক্তিশ্রেণীর ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে আয়ের করমুক্ত সীমা বাড়ানোরও সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
গতকাল রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আগামী অর্থবছরের সুপারিশমালা তুলে ধরেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। এ সময় সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মফিজুর রহমান, গবেষণা পরিচালক গোলাম মোয়াজ্জেম, সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খানসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, আগামী বাজেট আসছে এমন এক সময়ে, যখন নিত্যপণ্যের মূল্য ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে, বিদেশী উৎস থেকে সরকারের ঋণও বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে রাজস্ব সংগ্রহ নির্দিষ্ট পদ্ধতির মধ্যে না রেখে বাস্তবসম্মত হওয়া উচিত। তিনি বলেন, সিপিডি কোনো কোনো ক্ষেত্রে করহার বাড়ানো ও কোনো ক্ষেত্রে প্রণোদনা পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব করেছে। অর্থপাচার রোধে ট্রান্সফার প্রাইসিং জোরদারে উদ্যোগ নেয়ারও সুপারিশ করছে।
সিপিডি বলছে, আগামী বাজেটে এমন সব উদ্যোগ নেয়া উচিত, যার মাধ্যমে মানুষের কাজের সুযোগ বাড়ে। কৃষি উৎপাদনে খরচ কমিয়ে আনতে সার ও জ্বালানিতে ভর্তুকি দেয়ার সুপারিশ করা হয়। এছাড়া শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় কঠোর হওয়ার সুপারিশও করেছে সংস্থাটি।
বাজারে প্রতিযোগিতার অভাব ও পরিবহনে চাঁদাবাজির কারণে পণ্যের মূল্য বাড়ে উল্লেখ করে ফাহমিদা খাতুন বলেন, সরকারকে কঠোর হাতে এসব বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে মুদ্রার বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংককে বাজারে ডলার সরবরাহের সুপারিশ করেন তিনি।
এসবের পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বরাদ্দ বাড়ানো, শ্রমিকদের স্বাস্থ্যবীমা, বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন এবং এ খাতে অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে উদ্বুদ্ধকরণের সুপারিশও করেছে সিপিডি। সংস্থাটি মনে করে, মূল্যস্ফীতির হার ৬ শতাংশ যেটি বলা হয়, তা সঠিক নয়। বাস্তবতার পরিপ্র্রেক্ষিতে মূল্যস্ফীতি হিসাব করে নির্ধারণ করার সুপারিশও করা হয়। সিপিডি বলছে, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া নৈতিকতাবিরোধী। তাই একে কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না।
অনুষ্ঠানে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বর্তমান সময়টি অত্যন্ত কঠিন। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ার কারণে দেশের মধ্যে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ ক্রমেই বাড়ছে। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নিম্ন আয়ের মানুষকে কীভাবে স্বস্তি দেয়া যায় সেটাই হওয়া উচিত আগামী বাজেটের মূল উদ্দেশ্য।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শ্রীলংকার পরিস্থিতির সঙ্গে বাংলাদেশের পরিস্থিতি তুলনীয় নয়। তবে শ্রীলংকা থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। আমাদের অবস্থা ভালো। এটাও ঠিক শ্রীলংকার এমন পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। আমাদের বাজার ভিত্তিতে ঋণ আনতে হবে। নতুন নেয়া ঋণগুলো কোন সময়ে পরিশোধ করতে হবে, সেটার সঙ্গে সামঞ্জস্য ঠিক করতে হবে। সেই সঙ্গে প্রকল্পগুলোকে সাশ্রয়ীভাবে সময়ের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে।
কভিন-১৯ মহামারী-পরবর্তী দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বদলেছে বলে মনে করে সিপিডি। সে কারণে বড় করদাতাদের জন্য করহার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়া উচিত বলে মনে করে তারা। ঋণখেলাপি ও করখেলাপির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স বাস্তবায়নে নতুন বাজেটে একটি পথনকশাও দেখতে চায় সংস্থাটি।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আগামী অর্থবছরের বাজেটে নতুন ইকোনমিক সোশ্যাল অর্ডার প্রয়োজন। এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি শেষ করতে হবে। সরকারের ঋণ ও দায়, বাজার, সুশাসন ও রাজস্ব কাঠামোয় বিশেষ নজর দরকার। পুঁজিবাজার উন্নয়নে সুশাসন ও নজরদারি বাড়ানোর প্রস্তাব করেন তিনি।
তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, নির্বাচনের আগে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে কিছু প্রকল্প নেয়া হয় রাজনৈতিক বিবেচনায়। এ ধরনের প্রকল্প নেয়ার ক্ষেত্রে এখনই সতর্ক থাকা দরকার।
আয় বাড়াতে রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণের কথা বলেছে সিপিডি। প্রবাসী আয়ে প্রণোদনা অব্যাহত রাখার কথাও বলেছে সংস্থাটি।