নারীর জন্য নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র বাড়ানোর তাগিদ

দেশে যখন একজন নারী নির্যাতন বা অন্যায়ের শিকার হন কিংবা প্রতিবাদ করেন, তখন সে পরিস্থিতি মোকাবেলায় তার একটি নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজন হয়। অনেক সময় দেখা যায়, কেবল নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে অনেক নারী প্রতিনিয়ত অত্যাচার সহ্য করে চলেন। বাংলাদেশে এ মুহূর্তে নির্যাতনের শিকার নারীর জন্য ছয়টি সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। এছাড়া ১২টি ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) এবং সাতটি ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের মাধ্যমে নির্যাতিত

দেশে যখন একজন নারী নির্যাতন বা অন্যায়ের শিকার হন কিংবা প্রতিবাদ করেন, তখন সে পরিস্থিতি মোকাবেলায় তার একটি নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজন হয়। অনেক সময় দেখা যায়, কেবল নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে অনেক নারী প্রতিনিয়ত অত্যাচার সহ্য করে চলেন। বাংলাদেশে মুহূর্তে নির্যাতনের শিকার নারীর জন্য ছয়টি সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। এছাড়া ১২টি ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) এবং সাতটি ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের মাধ্যমে নির্যাতিত নারীকে সেবা দেয়া হচ্ছে। দেশে নারী নির্যাতন বাড়লেও আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা এবং সেবার মান বাড়ছে না। এমন পরিস্থিতিতে নারী নির্যাতন রোধে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র বাড়ানোর দাবি উঠেছে।

গতকাল বণিক বার্তা প্রাগ্রসরের উদ্যোগে আয়োজিত এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় নির্যাতনের শিকার নারীর জন্য নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রের গুরুত্ব প্রয়োজনীয়তা শীর্ষক অনলাইন বৈঠকে এসব কথা উঠে আসে।

প্রাগ্রসরের নির্বাহী পরিচালক (অনারারি) ফওজিয়া খোন্দকারের সভাপতিত্বে অনলাইন বৈঠকে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নিজেরা করির সমন্বয়কারী খুশী কবির, বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সালমা আলী, আইন সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক শিপা হাফিজ, সিডব্লিউসিএসের নির্বাহী পরিচালক ইশরাত শামীম, বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি শামীমা বেগম, মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক . শেখ মুসলিমা মুন, ব্র্যাকের সোস্যাল কমপ্লায়েন্স অ্যান্ড সেফগার্ডিংয়ের পরিচালক জেনিফা জব্বার, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সেবা সদনের সম্পাদিকা নাসরিন, ব্লাস্টের উপপরিচালক মাহবুবা বেগম, পল্লীশ্রী থেকে শামসুন নাহার, মানব প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক মাহমুদা শেলী, বিএনপিএসের উপপরিচালক শাহনাজ সুমি, আইন সালিশ কেন্দ্র থেকে সেলিনা, প্রাগ্রসরের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর প্রমা ইসরাত এবং প্রাগ্রসরের প্রোগ্রাম অফিসার প্রীতিলতা পাল। বৈঠকে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্লাস্টের অ্যাডভোকেট সিফাত নূর খানম। এছাড়া মাঠ পর্যায়ের নারী নির্যাতনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করেন এমন অধিকারকর্মী এবং নির্যাতনের শিকার ভুক্তভোগীরা তাদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে সূচনা বক্তব্য দেন বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাশেদ খান মেনন বলেন, দেশ এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নারী নির্যাতনের চিত্র কমিয়ে আনাও জরুরি। দুর্ভাগ্যজনক সত্য হলো, কভিডকালে নারী নির্যাতন যেমন বেড়েছে, নারী পাচারও বেড়েছে। আমাদের প্রবাসী নারীকর্মীদের কথাও আমি উল্লেখ করতে চাই। তারা যখন নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসেন, তখন যাওয়ার আর কোনো জায়গা থাকে না। একপ্রকার গৃহহীন হয়েই তাদের থাকতে হয়। সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র এবং সেবার মান বাড়ানোর যে দাবি আজ উঠেছে, বিষয়টি আমি সংসদীয় কমিটির বৈঠকে তুলে ধরব।

নিজেরা করির সমন্বয়কারী খুশী কবির বলেন, নির্যাতিত নারীদের মধ্যে প্রবাসী নারী শ্রমিকদের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তারা নির্যাতিত হয়ে ফিরে এলে সমাজ, পরিবার তাকে ভিন্নভাবে দেখে। কেউ সমর্থন না দেয়ার কারণে তারা এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। অন্যদিকে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোও উন্মুক্ত হওয়া দরকার। শুধু কয়েকটি ক্যাটাগরির নারীদের সেখানে সেবা দেয়া হবে এমনটি নয়। সেখানে সব ধরনের নারীকে সহজে সেবা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে গোপনীয়তা রক্ষা করা জরুরি। কোথাও কোথাও এমনটাও দেখা গেছে, কোনো নারী আশ্রয়কেন্দ্রে আসার পর স্বামী তাকে জোর করে নিয়ে গেছেন। তাই গোপনীয়তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশেও আশ্রয়কেন্দ্রগুলো গোপনীয়তা রক্ষা করে চলে। আশ্রয় নেয়া নারীদের বাইরে থেকে এসে কেউ জোর করে নিয়ে যাবে এমনটা যেন না হয়। এগুলো প্রতিরোধের মতো ব্যবস্থা থাকতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমাদের পুলিশ বাহিনীকেও সবসময় নারীবান্ধব বলা যায় না। অনেক সময় দেখা যায়, পুলিশের পক্ষ থেকে আমাদের কাছে সাহায্য চাওয়া হয়। কোনো নির্যাতিত নারীকে তারা আমাদের জিম্মায় রাখতে অনুরোধ করেন। সর্বোপরি আমি বলতে চাই, আশ্রয়কেন্দ্রগুলো আনন্দঘন পরিবেশে পরিচালিত হওয়া উচিত। নয়তো নির্যাতিত নারী আশ্রয়কেন্দ্রে এসে মানসিকভাবে আরো দুর্বল হয়ে পড়বে।

বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সালমা আলী বলেন, নারী যখন পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়, তখন সবার আগে তার একটি নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজন হয়। আশ্রয়ই যদি দেয়া সম্ভব না হয়, তাহলে আসলে কিছুই দেয়া হলো না। আমরা জানি, সরকারি যে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো আছে, সেগুলো ন্যূনতম মানও বজায় রেখে চলছে না। বরং ওইসব কেন্দ্রে গিয়ে নারী আরো ভিকটিম হয়ে পড়ে। আমরা চাই, এসব কেন্দ্র নারীবান্ধব, শিশুবান্ধব হয়ে উঠুক।

মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক . শেখ মুসলিমা মুন বলেন, দেশের ছয়টি বিভাগীয় শহরে আমাদের সেবা দেয়া হচ্ছে। আমরা ১০৯ নম্বরে একটি হেল্প সার্ভিস চালু করেছি। আমরা এক বছর পর্যন্ত নির্যাতিত নারীকে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকার সুযোগ দিই। এটা কেবল পারিবারিক সহিংসতার ক্ষেত্রে। এখানে কোনো জিডি কিংবা আদালতের নির্দেশেরও প্রয়োজন নেই। আমাদের কেন্দ্রে আসা কোনো নারী যদি কিছু সময় পর পরিবারে ফিরে যেতে চায়, আমরা তাদের আইনি সহায়তা দিই। আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে ঠিক। কিন্তু যে সেবা দিচ্ছি, তারও প্রচারণা জরুরি বলে আমি মনে করি।

এর আগে সভাপতির বক্তব্যে ফওজিয়া খোন্দকার বলেন, নারীর জন্য পুরো পৃথিবীই যুদ্ধক্ষেত্র। ঘরে-বাইরে সর্বত্রই নির্যাতনের শিকার হয় নারী। নারীর নিজস্ব কোনো ঘর নেই। নির্যাতনের শিকার নারীর প্রথম যেটি প্রয়োজন তা হলো নিরাপদ আশ্রয়। আজকের আলোচনা নির্যাতিত নারীর জন্য আমাদের কার্যক্রম আরো সহজ গতিশীল করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

প্রবন্ধ উপস্থাপক অ্যাডভোকেট সিফাত নূর খানম বলেন, নির্যাতনের শিকার নারীর জন্য দেশে বর্তমানে ছয়টি সরকারি নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। এছাড়া ১২টি ওসিসি এবং সাতটি ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের মাধ্যমে নির্যাতিত নারীকে সেবা দেয়া হচ্ছে। এসব সেন্টারে নির্যাতিত নারীকে যেসব সেবা দেয়া হয় তার মধ্যে রয়েছে সাময়িক আশ্রয়, চিকিৎসা, মনোসামাজিক কাউন্সিল, পুনর্বাসন, বিভিন্ন প্রশিক্ষণ শিক্ষা।

দেশে নারী নির্যাতন বাড়লেও আশ্রয়কেন্দ্র এবং সেবার মান বাড়ছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে নির্যাতিত নারীর জন্য সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা খুবই কম। বেসরকারি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর একটি বড় সমস্যা অর্থের জোগান। অর্থাভাবে অনেক বেসরকারি আশ্রয়কেন্দ্র বন্ধ করে দিতে হয়েছে। অন্যদিকে নির্যাতনের শিকার নারী চাইলেই আশ্রয়কেন্দ্রের সেবা নিতে পারছে না। এক্ষেত্রে তাকে জিডি কিংবা আদালতের আদেশের মাধ্যমে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হয়। পাশাপাশি নির্যাতিত নারীর মানসিক সংকট কাটানোর জন্যও আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে ভূমিকা রাখা জরুরি। কিন্তু বেশির ভাগ আশ্রয়কেন্দ্রেই মনোসামাজিক সেবাটি নেই।

আইন সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক শিপা হাফিজ বলেন, নির্যাতিত নারীর সহযোগিতার জন্য আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা শুধু কম নয়, আমি বলব অসম্ভব রকম কম। এর সংখ্যা বাড়াতেই হবে। অনেক বেশি নারীরই ধরনের আশ্রয়কেন্দ্রের প্রয়োজন রয়েছে। বিভিন্ন জরিপের তথ্য বলছে, দিন দিন নারী নির্যাতন বাড়ছে। বিশেষ করে কভিডকালে বেড়েছে বেশি। তাই আশ্রয়কেন্দ্র বাড়াতে হবে। পাশাপাশি এমন ব্যবস্থা করতে হবে, যেন যেকোনো নির্যাতিতা জিডি ছাড়া সরাসরি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারে।

সিডব্লিউসিএসের নির্বাহী পরিচালক ইশরাত শামীম বলেন, নির্যাতিত নারীদের আমরা বিভিন্নভাবে সেবা দিয়ে আসছি। তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করছি। এক্ষেত্রে সেলাইয়ের কাজ শেখানোর পাশাপাশি তাদের হাঁস পালনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করার ব্যবস্থা করেছি। শিক্ষিত নারীদের পোশাক কারখানার চাকরি দিয়েছি। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, অর্থাভাবে আমাদের সেন্টারটি কিছুদিন আগে বন্ধ করে দিতে হয়েছে।

প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক মাহমুদা শেলী বলেন, আমরা তৃণমূলে কাজ করি। অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে চাই, ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এমন অনেক নারীকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার মতো ঘটনাও ঘটে। তারা যখন মামলা করতে যায়, তখন দেখা যায় মামলার যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে করতে বেলা শেষ হয়ে যায়, তখন তাদের থাকার কোনো জায়গা থাকে না। আমি টাঙ্গাইলে কাজ করি। এখানে নির্যাতিতাদের জন্য কোনো আশ্রয়কেন্দ্র নেই। ফলে দেখা যায়, ওই নারীকে থানাতেই থাকতে হয়। কিন্তু থানা কতটা নিরাপদ, সেটিও একটি বাস্তবতা। সম্প্রতি একটি মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়ে গর্ভবতী হয়। সে ওসিসিতে ২০ দিন ছিল। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তাকে ওসিসি থেকে চলে যেতে হয়। কিন্তু অবস্থায় সে কোথায় যাবে? বাবা-মা, ভাই তাকে আশ্রয় দেয়নি। তাই নির্যাতিত নারীদের সেবা দেয়ার জন্য আশ্রয়কেন্দ্র বাড়ানোর বিকল্প নেই।

আরও