জ্বালানি খাতের ভুল পরিকল্পনার কারণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত এসব পরিকল্পনায় আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি। বিশেষ গোষ্ঠীর অনৈতিক সুবিধা নেয়ার ফলে গ্যাসের মজুদও কমেছে। সেই সঙ্গে তিতাস অযৌক্তিকভাবে গ্যাসের দাম বড়ানোর প্রস্তাব করেছে। গতকাল বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক ভার্চুয়াল আলোচনা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন বক্তারা।
রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে ‘জ্বালানি সরবরাহে এলএনজি বিতর্ক: বিদ্যুৎ খাতের জন্য এলএনজি আমদানি খরচ এবং ফল’ শীর্ষক এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এবং সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট আব্দুল্লাহ ফাহাদ। সেখানে উপস্থিত ছিলেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বদরূল ইমাম ও ম. তামিম, সিপিডির পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল জলিল প্রমুখ।
প্রবন্ধে বলা হয়, ২০২০-২১ অর্থবছরে আমদানি করা এলএনজির দাম প্রতি ঘনমিটার ৩১ টাকা ৫৬ পয়সা। অন্যদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহূত প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৪ টাকা ৪৫ পয়সা। সংস্থাটি বলছে, আমদানি নির্ভরশীলতা কমাতে দেশীয় উৎপাদন এবং চাহিদার মধ্যে সামঞ্জস্য রাখা জরুরি। করোনাকালে নিম্ন আয়ের মানুষের চাহিদা বিবেচনায় আরো কিছুদিন ভর্তুকি দিয়ে হলেও এলএনজির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারকে আহ্বান জানায় সিপিডি।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম অস্থিতিশীল। যেকোনো সময় দামের পরিবর্তন ঘটে থাকে। এতে করে ভোক্তা পর্যায়ে ভোগান্তি বাড়ে। তাছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে জ্বালানি হিসেবে এলএনজির দিকে ঝুঁকছে সরকার। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্রিন এনার্জিতে বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারকে পরামর্শ দেয় সংস্থাটি। অন্যথায় পরিবেশ ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন-জীবিকা নির্বাহসহ সবদিক থেকে বিপদ বাড়বে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থাপনায় থাকা রাষ্ট্রীয় সংস্থা তিতাস অযৌক্তিকভাবে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। আমদানি করা প্রতি ঘনফুট এলএনজির দাম দেশীয় গ্যাসের চেয়ে অন্তত ২৪ গুণ বেশি। এমন পরিস্থিতিতে আবারো গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে নিম্ন আয়ের মানুষ বিপাকে পড়বেন। করোনায় ধুঁকতে থাকা নিম্ন আয়ের মানুষের কথা বিবেচনায় গ্যাসের দাম না বাড়ানোই উচিত সরকারের।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বদরূল ইমাম মনে করেন, দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের অনুসন্ধান বাড়ানো জরুরি। প্রচুর সম্ভাবনা থাকলেও অজানা কারণে সঠিকভাবে তা অনুসন্ধান করা হচ্ছে না। ফলে সংকট দেখা দিয়েছে।
সিপিডি পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি করলে অর্থনীতির ওপর চাপ পড়বে, ভোক্তাদের ওপর চাপ পড়বে। ক্রমান্বয়ে এনএনজিনির্ভর হয়ে গেলে পরিবেশগতভাবে সমস্যা সৃষ্টি হবে। কারণ এটি ক্লিন এনার্জি নয়। প্রাকৃতিক গ্যাস যতটা ক্লিন এনার্জি এটি প্রক্রিয়াজাত হওয়ায় দূষণ সৃষ্টি করে। কয়লা যেমন দূূষণকারী জ্বালানি, এটিও তেমনি। স্বল্পমেয়াদে, দীর্ঘমেয়াদে একটি জ্বালানি কৌশল তৈরি করা প্রয়োজন। সরকারের উচিত পরিচ্ছন্ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাওয়া।
বিইআরসি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল জলিল এ আলোচনাকে সময় উপযোগী উল্লেখ করে বলেন, সার্বিক দিক বিবেচনায় নিয়েই সরকার কাজ করছে। তবে পলিসি লেভেলে সব কথা বলার সুযোগ আমার নেই। সরকার এসব খাতের উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। বিদ্যুতের বিষয়ে এখানে একপেশে একটা তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের কথা উল্লেখ করে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম বণিক বার্তাকে জানান, আমদানিনির্ভরতার ওপর এত বেশি মনোনিবেশ করা হয়েছে যে ধরেই নেয়া হয়েছে দেশে আর কোনো গ্যাস নেই। দেশীয় জ্বালানি খাতের কোম্পানিগুলোকে এ মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।