বড় করপোরেটের ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ লোপাটের চেষ্টা

প্রতারণা বন্ধে অভ্যন্তরীণ পরিচালন ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করুক ব্যাংক

প্রযুক্তির কল্যাণে ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় গতি এসেছে। পাশাপাশি জালিয়াতি করে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার ঘটনাও বেড়েছে। ব্যাংকে প্রতারণা ও জালিয়াতির নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে। সম্প্রতি দেশের বৃহৎ একটি ব্যাংক থেকে বড় দুটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের রক্ষিত অর্থ জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টা ধরা পড়েছে, গ্রেফতার করা হয়েছে ১০ জনকে। এক্ষেত্রেও ব্যাংক কর্মী

প্রযুক্তির কল্যাণে ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় গতি এসেছে। পাশাপাশি জালিয়াতি করে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার ঘটনাও বেড়েছে। ব্যাংকে প্রতারণা জালিয়াতির নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে। সম্প্রতি দেশের বৃহৎ একটি ব্যাংক থেকে বড় দুটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের রক্ষিত অর্থ জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টা ধরা পড়েছে, গ্রেফতার করা হয়েছে ১০ জনকে। এক্ষেত্রেও ব্যাংক কর্মী জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। আর্থিক লেনদেন বেড়ে ওঠার পাশাপাশি ধরনের জালিয়াতির ঘটনা অর্থের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যেখানে আর্থিক লেনদেনের সময় কমিয়ে এনে একে আরো মসৃণ করতে সচেষ্ট, সেখানে এমন জালিয়াতি উদ্বেগজনক। এতে অর্থনীতির গতিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পরিচালনগত এসব প্রতারণা বা জালিয়াতি বন্ধে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদারকি বৃদ্ধি সাইবার নিরাপত্তা জোরদারের বিকল্প নেই।

গত ৩০ বছরে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছে। সময়ের মধ্যে ব্যক্তি খাতের নতুন ব্যাংক এসেছে। আগে অনুমোদিত ব্যাংকসহ সব ব্যাংক ব্যাপকভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করেছে। সর্বাধুনিক সেবা প্রদানে প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকের সাধারণ লেজার অটোমেশন থেকে শুরু করে নতুন এটিএম, পস (পয়েন্ট অব সেলস) স্থাপন এবং ইন্টারনেট মোবাইল ডিভাইসভিত্তিক ব্যাংকিং সংযোজন করেছে। এতে গ্রাহকরা যখন অধিক প্রযুক্তিমুখী হয়েছেন, এখন নতুন প্রতারণার ঘটনাও ঘটছে, প্রতারকরা প্রযুক্তির দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে। জালিয়াতিগুলোকে মোটাদাগে তিনটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। এক. প্রযুক্তি-সম্পর্কিত জালিয়াতি, দুই. আমানত হিসাবসংক্রান্ত জালিয়াতি তিন. ঋণ হিসাবসংক্রান্ত প্রতারণা। প্রযুক্তি-সম্পর্কিত জালিয়াতির মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি। কিন্তু এখন অনলাইন সুবিধা ব্যবহার করে জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে। ব্যাংকের সিসি ক্যামেরার তথ্য চুরি, ব্যাংকের অনলাইনে ম্যালওয়্যার প্রবেশ, গ্রাহকের অ্যাকাউন্টের তথ্য চুরি করার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের প্রবণতা বেড়েছে। অর্থ লেনদেন সহজ করার সুবিধার্থে ফোনের মাধ্যমে বড় অংকের লেনদেনের ক্লিয়ারেন্স, স্বাক্ষর জালিয়াতি, বিইএফটিএন আরটিজিএসের মাধ্যমেও জালিয়াতি করে অর্থ তুলে নেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি ব্যক্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ব্যাংকের নিজস্ব অর্থও খোয়া যাওয়ার উদাহরণ রয়েছে। আর অপর্যাপ্ত কেওয়াইসি (নো ইয়োর ক্লায়েন্ট), ব্যাংক কর্তৃক ডিউ ডিলিজেন্সের ঘাটতি এবং গ্রাহক কর্তৃক দুর্বল তদারকি আমানতসংক্রান্ত জালিয়াতির প্রধান কারণ। সুপ্ত (ডরমেন্ট) হিসাব, যথাযথ রিকনসিলিয়েশন প্রক্রিয়া ছাড়া উচ্চসম্পদশালীদের হিসাব এবং বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তির দেশে থাকা হিসাবগুলো এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত। অর্থ ডরমেন্ট অ্যাকাউন্টে রেখে সরিয়ে নেয়া বা একাধিক অ্যাকাউন্ট খুলে ঋণের অর্থ সরানোর ঘটনাও ঘটছে। আর ঋণসংক্রান্ত প্রতারণা এখন সাধারণ জালিয়াতিতে পরিণত হয়েছে, যেগুলো দীর্ঘদিন ধরে সংঘটিত হয়ে আসছে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে ধরনের জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের পরিমাণ বহুগুণ বেড়েছে। দুর্বৃত্তরা দুর্বল ঋণ যাচাই ব্যবস্থা, অর্থছাড়-পরবর্তী অদক্ষ তদারকি এবং অপর্যাপ্ত নজরদারির সুযোগ নিচ্ছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ব্যাংক খাত সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে অর্থ জালিয়াতি প্রতারণা ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগসাজশে ঘটছে। মাঝেমধ্যে জালিয়াতি সংঘটিত হয় একটি শক্তিশালী গোষ্ঠীর সহযোগিতায়। সেক্ষেত্রে অপকর্মটি সম্পাদিত হয় প্রতারণাপূর্ণ সিকিউরিটি ডকুমেন্টস, অস্তিত্বহীন সম্পদের বিপরীতে ঋণ প্রদান, মিথ্যা কাগজের বিপরীতে লেনদেন প্রভৃতির মাধ্যমে। ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে অর্থ পাচার, ব্যাংকের অর্থ নিজ নামে দেখিয়ে তৃতীয় দেশের নাগরিকত্ব লাভ বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অর্থ সরিয়ে নেয়ার মতো ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।

ব্যাংকে আর্থিক জালিয়াতির বেশকিছু ঘটনা উন্মোচন হয়েছে। কয়েকটি ঘটনায় ব্যাংক কর্মীদের সাজাও দেয়া হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ঘটনার বিচার শেষ হয়নি, এমনকি দায়ী ব্যক্তিকে শনাক্ত তাদের বিচারের আওতায় আনা যায়নি। অনেক সময় ব্যাংকগুলো সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার ভয়ে জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশ্যে আনতে চায় না। এতে জালিয়াতি বেড়ে উঠছে। জালিয়াতি রোধে ব্যাংকগুলো সাধারণত নিজস্ব কিছু বিধিবিধান অনুসরণ করে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু গাইডলাইন রয়েছে। তবে এগুলো পর্যাপ্ত যুগোপযোগী নয়। আইনের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অনেক সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের আগাম সতর্কবার্তা আমলে না নেয়া বুঝতে না পারার কারণেও জালিয়াতি সংঘটিত হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে মাঠ প্রস্তুত করে অর্থ জালিয়াতি করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে অপারেটিং প্রসিডিউরের আধুনিকায়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। শুধু দুর্বৃত্তদের ধরলেই হবে না, দুর্বৃত্তায়ন যেন না হয়, সেটি নিশ্চিতে ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে। সিস্টেম শক্তিশালী করার পথ হচ্ছে মানসম্পন্ন পরিচালন প্রক্রিয়া অনুসরণ, সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করা এবং কর্মীদের মাধ্যমে জালিয়াতি সংঘটিত না হতে পারে সে ধরনের মডেল উন্নয়ন করা।

উচ্চপ্রযুক্তি জ্ঞান দক্ষতাসম্পন্ন লোকেরা এসব কেলেঙ্কারিতে জড়াচ্ছে। ব্যাংকিং জালিয়াতি পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। তার পরিবর্তে বিভিন্ন মিটিগেটিং ইনিশিয়েটিভস/প্রসেস কন্ট্রোলের মাধ্যমে এটি কমিয়ে আনা যেতে পারে। প্রথমে যথাযথ জালিয়াতি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে সঠিক জায়গায় সঠিক সম্পদ নিয়োজনে বোর্ডগুলোর অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া উচিত। ঝুঁকি প্রশমনের জন্য উদ্যোগভিত্তিক কৌশল আবশ্যক। কৌশলের মধ্যে () আইটি অবকাঠামো তৈরিতে উচ্চ বিনিয়োগ, () জালিয়াতি বা প্রতারণা প্রতিরোধ দ্রুত চিহ্নিতকরণের জন্য নীতি এবং প্রক্রিয়া উন্নয়নে অর্থায়ন বৃদ্ধি, () কার্যকর নৈপুণ্য মূল্যায়ন ব্যবস্থা কর্মীদের পর্যাপ্ত বেতন-সুযোগ-সুবিধাদি বৃদ্ধি এবং () কর্মকর্তা কর্মচারীদের জবাবদিহি ব্যবস্থা নিশ্চিতের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

সাধারণত খুব বেশি চিন্তা না করেই ব্যাংকের পর্ষদগুলো আইটি সম্পর্কিত সেবাগুলোর ওপর ব্যয় অনুমোদন করে। বিস্ময়করভাবে একই পর্ষদ প্রতারণা থেকে সুরক্ষাকারী আইটি ব্যবস্থা নিশ্চিত কিংবা একটি তথ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাগুলোর ক্ষেত্রে বাজেট কাটছাঁট করে। কোনো ব্যাংকিং সফটওয়্যার কেনার সময় অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত, ঝুঁকি বা অরক্ষণীয়তার ওপর সার্টিফিকেশন/রেটিং থাকা আইটি কোম্পানি থেকে তথ্যপ্রযুক্তিসংক্রান্ত পণ্য কেনা জরুরি। সুদক্ষ নিরীক্ষক দ্বারা ভৌত আইটি সম্পদ সফটওয়্যারের পর্যায়ক্রমিক নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশিত কোর রিস্ক ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইনেরও একটি পূর্বশর্ত। প্রতারণা-জালিয়াতি মোকাবেলায় কার্যকর করপোরেট সুশাসন খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পর্যাপ্ত সম্পদ নিয়ে (লোকবল লজিস্টিকস) একটি স্বতন্ত্র অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ কমপ্লায়েন্স ডিপার্টমেন্টও থাকা অত্যাবশ্যক।

কর্মীদের দ্বারা সংঘটিত প্রতারণা কেলেঙ্কারি তাত্পর্যজনকভাবে বেড়েছে। ব্যবস্থাপনার ত্রুটি বা অপর্যাপ্ততা সম্পর্কে জানা একজন কর্মী সহজেই জালিয়াতি করতে পারেন; এমনকি পাশের ডেস্কে বসা ব্যক্তিটি কী হচ্ছে তা বুঝতে পারলেও। অনেক ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জ্ঞাতসারেই ভুয়া দলিলের বিপরীতে ঋণ ছাড়ের ব্যবস্থা করেন এবং লেনদেন-পরবর্তী তদারক বন্ধ করে দেন। অনেক ঘটনায় অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশে বিলম্ব করা হয় কিংবা সঠিক ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা হয় না এবং প্রায়ই জুনিয়র কর্মীদের খুঁজে বের করা হয়, যারা তাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আদেশ বাস্তবায়ন করেন মাত্র। এক্ষেত্রে কর্মীদের জবাবদিহি নিশ্চিতের বিষয়টি স্বচ্ছ বস্তুনিষ্ঠ উপায়ে হওয়া জরুরি।

আমাদের ব্যাংক খাতে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বড় সমস্যা অভিজ্ঞ দক্ষ লোকের অভাব। পাশাপাশি সচেতনতারও যথেষ্ট অভাব রয়েছে। প্রযুক্তির কিছু ঝুঁকি সব সময় থাকবে। প্রতিনিয়ত প্রযুক্তি বদলাচ্ছে বিশ্বজুড়ে। তাই সাইবার ঝুঁকি মোকাবেলা করতে হলে পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আরো সতর্কতা, সচেতনতা এবং প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে। আর সেই পরিবর্তনগুলোর জন্যই প্রয়োজন যথাযথ অনুসন্ধান, দায় নির্ধারণ জবাবদিহিতা। সব সংকট দৃঢ়ভাবে মোকাবেলা করে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত নিরাপদে নির্বিঘ্নে এগিয়ে যাবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

আরও