করোনায় শুটিং লাইট হাউজগুলোয় শুধুই অন্ধকার

শিল্পী একা কিংবা সহশিল্পীদের নিয়ে ক্যামেরার সামনে সংলাপ বলেন, অভিনয় করেন। ক্যামেরার পেছনে থাকেন অনেক মানুষ। পরিচালক, ভিডিওগ্রাফার, লাইটম্যান, মেকআপম্যান তো থাকেনই।

শিল্পী একা কিংবা সহশিল্পীদের নিয়ে ক্যামেরার সামনে সংলাপ বলেন, অভিনয় করেন। ক্যামেরার পেছনে থাকেন অনেক মানুষ। পরিচালক, ভিডিওগ্রাফার, লাইটম্যান, মেকআপম্যান তো থাকেনই। আরো থাকেন তাদের চার-পাঁচজন করে সহযোগী এবং প্রডাকশন সামলানো একঝাঁক মানুষ। শুটিং শেষে শুরু হয় পোস্ট-প্রডাকশনের কাজ। ভিডিও এডিটিং, মিউজিক কম্পোজিং, কালার গ্রেডিংসহ কত কাজ শেষে একটি নাটক বা সিনেমা আমাদের সামনে আসে। আমরা দেখি শুধু নায়ক-নায়িকা তথা ক্যামেরার সামনের শিল্পীদের। ১ ঘণ্টার একটা নাটক মানে বিশাল কর্মযজ্ঞ। শতাধিক মানুষের সম্পৃক্ততা। তাদের আয়-রোজগারে চলে সংসার। একটা নাটকের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কয়েকশ মানুষের জীবনযাপন।

গত বছরে মহামারী শুরু হলে এ মানুষগুলো চোখে অন্ধকার দেখতে শুরু করেন। শিল্পী থেকে শুরু করে বিনোদনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেদের জড়িয়ে রাখা মানুষেরা হয়ে পড়েন বেকার। যার বড় ঢেউটা এসে লাগে শুটিং স্পটে আলো জ্বালানো মানুষগুলোর ওপর। একটি শুটিং হাউজ চালান আল আমীন। বণিক বার্তার পক্ষ থেকে যোগাযোগ করলে তার কণ্ঠে ভর করে রাজ্যের হতাশা। কেমন আছেন জানতে চাইলে আল আমীন বলেন, ‘কী আর বলব ভাই। আমার একটা মিডিয়া হাউজ আছে। এখানে নিজেরা যেমন কাজ করি, বিভিন্ন শুটিং সরঞ্জাম ভাড়া দিই। গত বছর করোনা আসার পর আমার সব শেষ। বলতে গেলে কোনো কাজ নেই। সব সরঞ্জাম পড়ে থেকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একেকটা যা দাম, নতুন করে কিনব সেই আশা নেই। সরকার যদি আমাদের দিকে না তাকায়, অনেক মালিক মিডিয়া হাউজ বন্ধ করে দেবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘সরকার নাটক ও চলচ্চিত্র শিল্পে যে প্রণোদনা দিয়েছে, মিডিয়া হাউজ মালিকরা তার কিছুই পায়নি।’ তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘ভাই, দয়া করে একদিন এসে দেখে যাবেন আমার কতগুলো লাইটসহ অন্যান্য সরঞ্জাম নষ্ট হয়েছে। কম করে হলেও ১৫-২০ জন স্টাফ রাখতে হয় আমাদের। তাদের বেতন, অফিস ভাড়া সব পকেট থেকে টানতে হচ্ছে। কোনো আয় তো নেই-ই, বরং পকেট থেকে খরচ করে কয় দিন অফিস চালাতে পারব জানি না।’   

আলো মহল নামে একটি লাইট হাউজের মালিক মো. সালাম চৌধুরী। পাশাপাশি লাইট হাউজ মালিক অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক পদে আছেন। বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অফিস ভাড়া, স্টাফদের বেতন দিয়ে প্রতি মাসে ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা খরচ হয় আমাদের। এক-দুই মাস কোনোমতে চালানো যায়। প্রায় দেড়টা বছর ধরে তেমন কোনো কাজ নেই। প্রতিটি হাউজ যদি বছরে ৩০-৩৫ লাখ টাকা লস দেয়, কয় দিন চলতে পারবে? আমাদের সমিতির অধীনে ৩০টা হাউজ আছে। তার মধ্যে ৫-৭টা এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। ১০-১২টা এর মধ্যেও কাজ পাচ্ছে। বাকিদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। আরো কয়েকটি বন্ধ হয়ে যাবে।’ তিনি জানান, সমিতির বাইরেও অনেক লাইট হাউজ আছে। সব মিলিয়ে মিডিয়ায় ৫০-এর অধিক লাইট হাউজ আছে। সবাই যদি মাসে দুই-আড়াই লাখ টাকা করে লোকসান দেয়, তাহলে লাইট হাউজগুলোর সম্মিলিত লোকসান মাসে ২ থেকে আড়াই কোটি টাকা।

আব্দুস সালাম বলেন, নাটক, বিজ্ঞাপন, ওয়েব সিরিজ, সিনেমা এবং ওভিসি নির্মাণ যদি স্বাভাবিকভাবে শুরু হয়, তাহলে একটা সংকট তৈরি হবে। পড়ে থাকতে থাকতে অনেক লাইট নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক সরঞ্জাম ব্যবহারের অনুপযোগী। মরিচা ধরে গেছে। স্বাভাবিকভাবে শুটিং চললে চাহিদা অনুযায়ী সাপ্লাই দেয়া যায় না। এখন তো আরো দেয়া যাবে না।’ নতুন করে এ খাতে টাকা বিনিয়োগ করবে সেই অবস্থাও কারো নেই বলে জানান তিনি।

চীন থেকে ৪০-৪২ হাজার টাকা খরচ করে একেকটা বাল্ব আনতে হয়। সেগুলো জ্বলুক না জ্বলুক ৩৫০ ঘণ্টা হায়াত। এরপর ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে যায় বলে জানান লাইট হাউজ মালিক অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুস সালাম।

ওয়ার্ল্ড মিডিয়া নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক পাংখা মনির। তিনি জনপ্রিয় একজন ডিরেক্টর অব ভিডিওগ্রাফি তথা ডিওপি। তার ১০টার মতো বিভিন্ন ধরনের ক্যামেরা আছে। প্রতিটি ক্যামেরার পেছনে কাজ করেন তিন-চারজন করে। ৩০-৩৫ জন স্টাফের বেতন ও অফিস ভাড়া বাবদ মাসে ৩ লাখ টাকা খরচ। খরচ বাদ দিয়ে মাসে ১ থেকে দেড় লাখ টাকা লাভ থাকে তার। গত দেড় বছরে লাভের মুখ তো দেখেইনি, বরং স্টাফদের বেতন ও অফিস ভাড়া দিতে হচ্ছে পকেট থেকে। বণিক বার্তাকে পাংখা মনির বলেন, ‘আমাদের অবস্থা খুবই নাজুক। নিজের পকেট থেকে টাকা দিচ্ছি। এখন লকডাউন উঠে গেছে। আশা করি দ্রুত কাজ শুরু হবে। কাজ শুরু হলে ক্ষতি যতটা সম্ভব পুষিয়ে নিতে হবে।’ 

টিভি নাটক বা এ-জাতীয় অনুষ্ঠানগুলো যারা এডিটিংয়ের দায়িত্ব পালন করেন, তাদের ‘এডিটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ নামে একটি সংগঠন আছে। এ সংগঠনের সদস্য, এডিটিং প্যানেল ‘আলফা আই’-এর এডিটর জোবায়ের পিয়াল জানালেন, দুটো ঈদে তারা প্রত্যাশামতো কাজ পাননি। তবে অনলাইন এডিটিং কিংবা হোম অফিসের মাধ্যমে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের কাজ করে তারা টিকে ছিলেন।

শুটিং লাইট মালিক সমিতির সভাপতি শামীম আহমেদ বলেন, ‘২০২০ সালের মার্চে যখন লকডাউন দিল, আমরা তো জানতাম না লকডাউন আসবে। তখন বঙ্গবন্ধু জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে অনেক কাজ হওয়ার কথা ছিল। এছাড়া ওটিটি প্লাটফর্মগুলো তখন ওয়েব সিরিজ ও ফিল্ম বানানো শুরু করবে। ফলে নতুন বছরে অনেক কাজের আশায় আমরা ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে চীন থেকে বিভিন্ন সরঞ্জামের অর্ডার করি। এর মধ্যে চীনে লকডাউন ঘোষণার ফলে সেই সরঞ্জাম আসতে পাঁচ-ছয় মাস লেগে যায়। আমাদের ১ টাকা আয় নেই কিন্তু ব্যাংক লোন ঠিকই দিতে হচ্ছিল।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতিদিন কাজ হয়, প্রতিদিন পেমেন্ট হয়। আমাদের স্টাফদের বেতন দিতে হয়। শুটিং বন্ধ থাকায় স্টাফদের বেতন দিতে পারি না। অনেক টেকনিশিয়ান বাসা ভাড়া দিতে না পেরে গ্রামে চলে গেছেন। এখন যদি শুটিং শুরু হয়, না পাব সরঞ্জাম, না পাব লোকবল। সব মিলিয়ে গভীর সংকট আমাদের জন্য। আমরা কারো থেকে প্রণোদনাও পাব না। আমরা তো এত বড় ব্যবসায়ী নই যে আরেক জায়গা থেকে টান দিয়ে এ ক্ষতি পুষিয়ে নেব। এ সংকট থেকে উত্তরণের আপাতত উপায়ও নেই।’ বিনোদনজগতের অনেকেই সরকারি প্রণোদনা পেয়েছেন। ক্যামেরার পেছনে আলো জ্বালিয়ে রাখা এ মানুষগুলোর চোখে শুধুই অন্ধকার বলে জানান শামীম আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আমাদের যেসব ইকুয়েপমেন্ট ব্যবহার হয়, এগুলো সেকেন্ড হ্যান্ড বিক্রি করব সে সুযোগও নেই। কোথাও ফেলে রাখলেও জায়গার ভাড়া দিতে হয়। এ অবস্থায় আবার যদি লকডাউন হয়, আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, অনেক মালিক তার হাউজ বন্ধ করে গ্রামে চলে যাবেন।’

এ অবস্থা থেকে মুক্তির উপায় জানতে চাইলে শামীম আহমেদ বলেন, ‘সরকার জানে না চলচ্চিত্র ও নাট্য শিল্পে আমাদের ভূমিকা কত। একজন প্রযোজক একটা নাটকের পেছনে দুই-আড়াই লাখ টাকা ইনভেস্ট করেন। আমরা ৪০-৫০ লাখ টাকার মালপত্র ব্যবহার করি। আমাদের ইনভেস্টটা তাদের চেয়ে অনেক বেশি। আমাদের এমনও অফিস আছে, একশর বেশি স্টাফ আছে। আমাদের অনেক ছেলে ঈদের পড়ে না খেয়ে আছে বলা চলে। ফোন দিয়ে কান্নাকাটি করে। আমরা কোনো অনুদান পাইনি। এফটিপিওকে আমি জানিয়েছি। তারা যদি আমাদের দুঃখের কথা সরকারকে বলে, তাহলে হয়তো একটু সুবিধা হয়।’

শামীম আহমেদ দুঃখের সঙ্গে বলেন, ‘মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে সংবাদ সম্মেলন করে ঘোষণা দিয়ে এ ব্যবসা থেকে চলে যাই। ৫ টাকা ইনকাম তো নাই-ই; মাসে যদি ৫ লাখ টাকা লোনে পড়ে যাই, সেই ব্যবসা করার কোনো মানে হয়?’

আরও