২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বাংলাদেশের ৫০তম বাজেট। এটি চলমান করোনা অতিমারীর সময়ের দ্বিতীয় বাজেট। এ বাজেট এমন একটি সময়ে উপস্থাপিত হলো, যখন বাংলাদেশ এখনো করোনার প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারেনি। করোনার অভিঘাত আমরা এখনো অনুভব করছি। ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে যে বিষয়গুলো জায়গা পাওয়ার কথা ছিল তার অনেকগুলোই দেখা যায়নি। প্রাধিকারগুলো এবং করোনার পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় নেয়া হয়েছে খুব কম।
জাতীয় বাজেট ২০২১-২২ নিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) গতকাল এক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এ কথা বলেছে। প্রতিক্রিয়া তুলে ধরে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, আগামী বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২ শতাংশ ধরা হয়েছে, সরকার আগামী অর্থবছরে অনেকটা স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশাই করছে। এ প্রবৃদ্ধি হতে হলে আগামী অর্থবছরে অনেক বেশি বিনিয়োগ হতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ না বাড়লে প্রবৃদ্ধি কোথা থেকে হবে তা স্পষ্ট নয়।
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা গত অর্থবছরের সমান রাখা হয়েছে। কিন্তু এ লক্ষ্যমাত্রাও কীভাবে পূরণ হবে আমাদের জানা নেই। বর্তমান পর্যায়ের সক্ষমতা দিয়ে জাতীয় বোর্ডের পক্ষে এটি অর্জন করা সম্ভব নয়। রাজস্বের ক্ষেত্রে পদক্ষেপগুলো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে নয়, বরং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে বেশকিছু সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়েছে। তাদের জন্য কর ও মূল্যসংযোজন করে যে ছাড়গুলো দেয়া হয়েছে, সেগুলো কভিডকালে ব্যবসাকে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ দেয়ার বিষয়টিও ভালো পদক্ষেপ। তবে ব্যক্তি করের ক্ষেত্রে নিচের দিকে আয়মুক্ত করের সীমা বাড়ানো হয়নি। এটি করলে সাধারণ মানুষের হাতে খরচ করার এবং বিনিয়োগযোগ্য অর্থ আসত। কেননা এ সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষের ভোগ ব্যয় বাড়ানো।
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ নিয়ে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, খাতওয়ারি প্রাধিকারের ক্ষেত্রে সবার আগে আসে স্বাস্থ্য খাত। মোট বাজেটের অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য খাতের জন্য বরাদ্দ ২০২১ অর্থবছরে ছিল ৫ দশমিক ১৫ শতাংশ, যা বৃদ্ধি পেয়ে ২০২২ অর্থবছরে হয়েছে ৫ দশমিক ৪২ শতাংশ। কিন্তু এ বরাদ্দকৃত অর্থ ২০১০ অর্থবছর অর্থাৎ যখন মহামারী ছিল না, তখনকার বরাদ্দের (৬ দশমিক ১৮ শতাংশ) চেয়ে কম। বর্তমান অবস্থায় স্বাস্থ্য খাতের জন্য মূল বিষয়টা হচ্ছে টিকাদান। এ করোনার প্রার্দুভাব কতদিন থাকবে আমরা জানি না। করোনা থেকে মুক্তি না পেলে অর্থনীতিতে চাঞ্চল্য ফিরে আসবে না। সেজন্য যারা যোগ্য, তাদের প্রত্যেককে টিকা দিতে হবে। বাজেটে এজন্য ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে কিন্তু এটা পর্যাপ্ত নয়।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, একদিকে কভিডকে মোকাবেলা করা, অন্যদিকে কভিড থেকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের জন্য যে বাজেট প্রয়োজন ছিল সেটা আমরা লক্ষ করিনি। সেটি এক বছরের বাজেট নয়। সেই বাজেটে আগামী কয়েক বছরের স্বাস্থ্য খাত, শিক্ষা খাত, সামাজিক খাত, কর্মসংস্থান ইত্যাদি কেমন হবে এবং অন্যান্য খাতে ব্যয় কাঠামো কেমন হবে, রাজস্ব আহরণ কীভাবে হবে, সেগুলোর একটা পরিষ্কার দিকনির্দেশনা থাকা উচিত ছিল। সার্বিকভাবে, দুর্বল অনুমিতি ও বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতা কভিডকালীন বাজেট বাস্তবায়নকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ও সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।