উচ্চ তাপমাত্রাসহিষ্ণু ধানের জাত আনছে ব্রি

কৃষকের কাছে দ্রুত পৌঁছাতে উদ্যোগ নিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর

সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের কৃষিতে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। হঠাৎ বন্যায় হাওরের ফসল বিনষ্ট, লবণাক্ততা বেড়ে ওঠায় সবজি ও ধান উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার খবর নিয়মিতই গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। এর মধ্যে দেশের কৃষিতে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে উচ্চ তাপমাত্রা বা ‘হিট শক’। গরমকালে লু হাওয়া বা গরম বাতাসের প্রবাহ নতুন

সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের কৃষিতে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। হঠাৎ বন্যায় হাওরের ফসল বিনষ্ট, লবণাক্ততা বেড়ে ওঠায় সবজি ও ধান উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার খবর নিয়মিতই গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। এর মধ্যে দেশের কৃষিতে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে উচ্চ তাপমাত্রা বা ‘হিট শক’। গরমকালে লু হাওয়া বা গরম বাতাসের প্রবাহ নতুন কিছু নয়। সাধারণত আম, জাম, কাঁঠাল ও তাল পাকার সময়ে এ লু হাওয়া বা গরম বাতাস প্রবাহিত হয়। কিন্তু এবার এটি ধান কাটার আগমুহূর্তে প্রবাহিত হওয়ায় কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বোরোক্ষেতের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ‘হিট শক’ বা গরম ঝড়ো বাতাসে যে পরিমাণ ধান নষ্ট হয়েছে, তাতে চাল উৎপাদন এক লাখ টন কমার আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ। তবে আশার কথা, দেশজুড়ে হিট শকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার জন্য সরকার এরই মধ্যে ৪২ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ, সহায়তা কর্মসূচিসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যেন দেশের কৃষিকে এমন বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে না হয়, সেজন্যই উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল এবং রোগ ও পোকামাকড় প্রতিরোধক উচ্চফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবনের বিষয়ে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। নতুন কয়েকটি জাত নিয়ে গবেষণা প্রায় শেষ পর্যায়ে বলেও খবর মিলছে।

চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয় আর ধানের ফলন বৃদ্ধিতে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম এবং গড় ফলন বিশ্বমানের। কিন্তু দেশের কৃষিতে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে উচ্চ তাপমাত্রা বা ‘হিট শক’। জাপানে টাইফুনের কারণে ২০১৭ সালে তিন দিনব্যাপী তীব্র ঝড়ে একই ধরনের সমস্যা দেখা যায়। পরবর্তী সময়ে এ ঝুঁকি কমাতে তারা নতুন একটি প্রক্রিয়া চালু করে। ধান আবাদের সময়ে একই সময়ে সব বীজ বপন না করে নির্দিষ্ট সময় পরপর ধান বপন করে তারা। এতে শুকিয়ে যাওয়া সাদা শীষ সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ধানের সব কুশির শীষ একসঙ্গে বের হয় না বা শীষের সব ফুল একসঙ্গে ফুটে না বিধায় শতভাগ ক্ষতি হওয়ার শঙ্কা কম থাকে। আবার যেসব ক্ষেত্রে ধানের দানা গঠন প্রক্রিয়া চলছে, সেসব ক্ষেত্রে ডিগপাতা শুকিয়ে গেলেও (কাণ্ড ও শীষে সঞ্চিত কার্বোহাইড্রেটের কারণে) দানা গঠন প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে, ফলে ক্ষতি খুব সামান্য হয়। কয়েকটি দেশ হিট শকসহিষ্ণু কিছু জাতও উদ্ভাবন করেছে। তবে তা আমাদের আবহাওয়া উপযোগী কিনা পরীক্ষা করে দেখা আবশ্যক। দেশে গবেষণার মাধ্যমে নতুন জাত উদ্ভাবন করা গেলে সবচেয়ে ভালো ফল মিলবে। ব্রি উদ্ভাবিত নতুন জাতের ধান দ্রুত মাঠ পর্যায়ে কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সক্রিয়তা প্রয়োজন।

হিট শকের কারণ খোঁজা এখন জরুরি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। নদী-নালা, বিল-ঝিল দিন দিন ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও নিচে নেমে যাচ্ছে। কমে গেছে গাছপালাও। ঘটে যাওয়া হিট শক এসবের বিরূপ প্রভাব কিনা তা গবেষণা করে দেখা প্রয়োজন। কেননা ভবিষ্যতেও এ ধরনের দুর্যোগ হতে পারে। তাই এ ব্যাপারে চাষীদের আগাম সতর্ক করার পাশাপাশি তাদের করণীয় সম্পর্কেও দিকনির্দেশনা দেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি আরেকটি বড় প্রয়োজন হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত চাষীদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা। ঠিকমতো পুনর্বাসন করা না গেলে এ বিপুল পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত চাষী সহজে ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন না। বেড়ে যাবে দারিদ্র্য। কারণ কৃষিই তাদের একমাত্র আয়ের উৎস। অন্যদিকে কৃষকরা সাধারণত ধার-দেনা করে জমি আবাদ করেন। ফসল ঘরে তোলার পর তারা দেনা শোধ করেন। এবার অনেকের দেনা শোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

তীব্র দাবদাহের (হিট শক) ক্ষতি থেকে ধানকে রক্ষার অন্যতম উপায় হচ্ছে ধানের জীবনকালের ওপর ভিত্তি করে বপন ও রোপণ সময় এমনভাবে সমন্বয় করা, যাতে ধানের ফুল ফোটার সময় কালবৈশাখীর এমন তীব্র দাবদাহ এড়িয়ে যাওয়া যায়। শুধু বৈজ্ঞানিক কারণ বিশ্লেষণ করলেই চলবে না; যেসব জমি এখনো অক্ষত রয়েছে, সেগুলোয় সবসময় পানি ধরে রাখার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। সেটি কৃষককে ঠিকমতো মেনে চলতে হবে। চিটা হয়ে যাওয়া ধানক্ষেতে কৃষক যাতে দ্রুততর সময়ে অন্য ফসল ফলাতে পারেন, সে ব্যাপারে কৃষি বিভাগের এখনই এগিয়ে আসা দরকার। যদিও কর্মকর্তারা মনে করছেন, এ ক্ষতি সামগ্রিকভাবে জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তায় তেমন প্রভাব ফেলবে না; কিন্তু এ বিষয়ে গঠনমূলক গবেষণা হওয়া দরকার। আবার একই ধরনের গরম বাতাস বয়ে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা আছে কিনা সে বিষয়ে আবহাওয়াবিদরা খতিয়ে দেখতে পারেন।

করোনাভাইরাসের মতো নতুনতর বৈশ্বিক দুর্যোগে কৃষিই ভরসা আমাদের। গত বছর করোনা পরিস্থিতির মধ্যে সারা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সব শ্রেণী-পেশার মানুষ যখন লকডাউনে ঘরবন্দি, ঠিক সে সময়ও মাঠে ছিলেন বাংলার কৃষক। তাদের উৎপাদিত ফসল বাঁচিয়ে রেখেছে ঘরবন্দি ১৬ কোটি মানুষের জীবন ও অর্থনীতি। সবকিছুর আগে দিশেহারা কৃষকের পাশে দাঁড়াতে হবে। মনে রাখতে হবে এর সঙ্গে দেশের সামগ্রিক খাদ্যশস্য উৎপাদনের বিষয়টি জড়িত। এক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে ত্রাণ ও পুনর্বাসন সহায়তা দেয়া হোক। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি বিভিন্ন পক্ষও এগিয়ে আসতে পারে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক যাতে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পান, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলায় উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল ধানের জাত আবিষ্কারের ওপর জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে দেশের আবহাওয়া বিভাগকে আরো শক্তিশালী ও এর আধুনিকায়ন প্রয়োজন, যাতে তারা হিট শকের আগাম বার্তা কৃষককে দিতে পারে।

আরও