স্বেচ্ছায় দেশে ফেরা কর্মসূচির আওতায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে রোববার রাতে লেবানন থেকে দেশে ফেরেন ২৭৮ জন বাংলাদেশী। তবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেই কোয়ারেন্টিনবিরোধী বিক্ষোভ করতে থাকেন তারা। পরে গতকাল দুপুর ১২টার দিকে তাদের কোয়ারেন্টিনে নিতে সমর্থ হয় কর্তৃপক্ষ।
একই পরিস্থিতি তৈরি হয় গত বৃহস্পতিবারও। ওইদিন সকালে যুক্তরাজ্য থেকে আসা দুই শতাধিক যাত্রী হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে কোয়ারেন্টিনে না যাওয়ার বিষয়ে বাগবিতণ্ডা শুরু করেন। একপর্যায়ে চিত্কার-চেঁচামেচি করে অবস্থান নেন হেলথ ডেস্কের সামনে। ৩ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন স্বাস্থ্যকর্মী ও অন্যরা। কোয়ারেন্টিন নিয়ে এমন পরিস্থিতিতেই পড়তে হচ্ছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে।
আবার কোয়ারেন্টিনে পাঠানোর পর সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। গত ৩১ মার্চ কোয়ারেন্টিন থেকে পালিয়ে যাওয়ায় যুক্তরাজ্য প্রবাসী দুজনকে সাতদিনের কারাদণ্ডসহ ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়। তারা সিলেটের হোটেল স্টার প্যাসিফিকে কোয়ারেন্টিনে ছিলেন। দুজনই ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী বাংলাদেশী। এর আগে গত ২০ মার্চ সিলেটের হোটেল ব্রিটানিয়া থেকে এক পরিবারের নয় সদস্য কোয়ারেন্টিন অবস্থায় পালিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে যায়।
গতকাল কোয়ারেন্টিনবিরোধী বিক্ষোভে যোগ দেন লেবানন প্রবাসীদের স্বজনরাও। নিয়ম অনুযায়ী লেবাননফেরত ব্যক্তিদের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনে যেতে হবে। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লেবাননফেরত যাত্রীদের স্বজনেরা ১ নম্বর আগমনী টার্মিনালের গেট ধরে টানাটানি করে। তারা কোয়ারেন্টিনবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দেয়। এদিকে যাত্রীরাও কোয়ারেন্টিনে যাবেন না বলে চিত্কার করতে থাকেন।
এ প্রসঙ্গে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, লেবাননফেরত যাত্রীরা কোয়ারেন্টিনে না যাওয়ার জন্য উত্তেজিত হয়ে বিক্ষোভ করেন। এ সময় তাদের স্বজনরাও আবেগে উত্তেজিত হয়। তবে সবাইকে বুঝিয়ে শান্ত করার পর ফোর্সের প্রোটেকশনে দুপুরের দিকে যাত্রীদের কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়।
এদিকে লেবানন থেকে আসা ফ্লাইটের তথ্য বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে আগে থেকে এয়ারলাইনস কিংবা দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়নি। ফলে রাত ৩টার দিকে ফ্লাইটটি এলে অবরতণের অনুমতি দেয়া হয়নি। প্রায় ১ ঘণ্টা আকাশে অপেক্ষার পর বিশেষ বিবেচনায় ফ্লাইটটি অবতরণের অনুমতি পায়। কিন্তু আগাম তথ্য না থাকায় সে সময় বিমানবন্দরের স্বাস্থ্যকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন না। পরে সকাল ৭টার দিকে যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়।
প্রসঙ্গত, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় ইউরোপ ও ১২ দেশ থেকে যাত্রী পরিবহন নিষিদ্ধ করে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। ১২ দেশের তালিকায় লেবাবনও রয়েছে। ৩ থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। এ কারণে রোববার রাতে লেবানন থেকে আসা ফ্লাইটটি প্রথমে অবতরণের অনুমতি পাচ্ছিল না। পরে দূতাবাসের উদ্যোগে মানবিক বিবেচনায় ফ্লাইটটি অবতরণ করতে দেয়া হয়।
উল্লেখ্য, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের দেশগুলোতে করোনাভাইরাসের নতুন ধরন শনাক্ত হলে গত ১ জানুয়ারি থেকে যুক্তরাজ্যফেরত যাত্রীদের সঙ্গে করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট থাকলেও ১৪ দিনের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয় প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন। পরে ১৫ জানুয়ারি চারদিন এবং তারপর সাতদিন কোয়ারেন্টিনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে দেশে করোনা সংক্রমণ বাড়তে শুরু করলে ২৯ মার্চ দুই সপ্তাহের জন্য ১৮ দফা নির্দেশনা দেয় সরকার। সেখানে বলা হয়, বিদেশফেরত যাত্রীদের ১৪ দিন প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। পরদিন ৩০ মার্চ শুধু যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের যেকোনো দেশ থেকে এলে ১৪ দিনের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনের নির্দেশনা জারি করা হয়।
তবে ৩১ মার্চ আসে নতুন নির্দেশনা। তাতে বলা হয়, যুক্তরাজ্য ছাড়া ইউরোপের সব দেশ এবং আরো ১২টি দেশ থেকে যাত্রী পরিবহন নিষিদ্ধ। ওই ১২টি দেশ হচ্ছে আর্জেন্টিনা, বাহরাইন, ব্রাজিল, চিলি, জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, পেরু, কাতার, দক্ষিণ আফ্রিকা, তুরস্ক ও উরুগুয়ে।