দ্বিতীয় দফায় করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। পরিস্থিতি দিন দিন যেভাবে খারাপ হচ্ছে, ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, হাসপাতালগুলোয় রোগী বাড়ছে এবং প্রয়োজনীয় সেবার অভাব দেখা দিচ্ছে, তাতে বিধিনিষেধের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকারের সুযোগ নেই। তবে গত বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এ পরিস্থিতিতে অনেকেই সংকটে পড়েন। অনেকের আয় বন্ধ হয়ে যায়। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিকরাও সমস্যায় পড়েন। করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে গত বছর ঈদ ও পহেলা বৈশাখের বাজার ধরতে না পেরে স্থানীয় বাজারকেন্দ্রিক ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের লোকসানে পড়েছিলেন। তবে গত বছর এ ভাইরাস যতটা নতুন ছিল কিংবা পরিস্থিতি যতটা অপরিচিত ছিল, এ বছর অন্তত সে রকম অবস্থা নেই। গতবারের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবারের পরিস্থিতি কতটা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সামাল দেয়া যায়, সেটিই এখন বিবেচনার বিষয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাস্থ্য খাতে গত বছরের সেই বিশৃঙ্খলা এখনো স্পষ্ট।
সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা করতে হবে এক সপ্তাহের বিধিনিষেধের ঘোষণা যেন যথাসম্ভব ফলপ্রসূ হয়। কিন্তু প্রথম দিনেই দেখা গেছে জনসমাগম হ্রাস পায়নি এবং শারীরিক দূরত্ব মানার চেষ্টাও পরিলক্ষিত হয়নি। একথা সত্য, বাংলাদেশের মতো অতিমাত্রায় জনঘনত্বের দেশে এটি কার্যকর করা যে কঠিন, তা আমরা গত বছর লক্ষ করেছি। তাছাড়া বিপুলসংখ্যক দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের এ দেশে বিধিনিষেধের অর্থনৈতিক অভিঘাত গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেয়া দরকার। যে বিপুল জনগোষ্ঠী দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল, এ সময় তাদের জীবনধারণের উপায় সম্পর্কে সরকার কী ভেবেছে, সে সম্পর্কে এখনো কিছু জানা যায়নি। কিন্তু বিষয়টি কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। গত বছর সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের আওতায় দারিদ্র্য, কাজ হারানো শ্রমিকসহ ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য কিছু আর্থিক সহায়তার পদক্ষেপ নিয়েছিল। কিন্তু এ সময়ে দেখা গেছে এর অর্ধেকই বাস্তবায়ন হয়নি। বিধিনিষেধ দীর্ঘায়িত হলে দরিদ্র মানুষেরা অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই তাদের জন্য দ্রুত আর্থিক সহায়তা প্রদানের পদক্ষেপ নিতে হবে। এবারের ঘোষণার ইতিবাচক বিষয় হলো, সরকার স্বাস্থ্যবিধি মেনে কারখানা খোলা রাখার ঘোষণা দিয়েছে। তবে দেশের বিভিন্ন স্থানে মার্কেট ও দোকান খোলাসহ গাড়ি চালু রাখতে সড়কে নেমেছেন শ্রমিক-মালিকরা। অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে তাদের জন্য সরকারি আর্থিক সমর্থনমূলক কার্যক্রম এখনই শুরু করা উচিত। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা যেন এটি পায়, তাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
মনোযোগ বাড়াতে হবে কভিড রোগীদের জীবন রক্ষার প্রতি। কভিড রোগীদের চিকিৎসার সুযোগ বাড়াতে হবে। পর্যাপ্ত অক্সিজেন, আইসিইউ সেবাসহ চিকিৎসার মান উন্নত করার জন্য বাড়তি উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে বরাদ্দ বাড়াতে হবে এবং সেই অর্থের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সামগ্রিকভাবে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা আরো দক্ষ, দায়িত্বশীল ও সুশৃঙ্খল করার উদ্যোগ নিতে হবে। দায়িত্বশীলদের জবাবদিহির ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। সংক্রমণের আরো বৃদ্ধি ঠেকানোর জন্য মাস্ক পরা, নিয়মিত হাত ধোয়া, শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে চলা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি রক্ষার প্রতি সবাইকে আরো মনোযোগী ও দায়িত্বশীল করে তোলার জন্য ব্যক্তিগত, পারিবারিক, প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বাড়াতে হবে।
সংক্রমণের হার, রোগীর সংখ্যা, মৃত্যুর ঘটনা যেভাবে বেড়ে চলেছে, তাতে এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এক সপ্তাহ দেশব্যাপী লকডাউনের ঘোষণাও এ ভাবনার ফল। কিন্তু নির্দেশনা জারি করা এক কথা আর সেগুলো সাফল্যের সঙ্গে বাস্তবায়ন করা অন্য কথা। নির্দেশনা জারির সময়েই সব দিক বিবেচনায় নিয়ে ভেবে দেখা দরকার সেগুলো বাস্তবায়ন করা কতটা সম্ভব। করোনা মোকাবেলায় প্রচলিত ধারণার বাইরে অন্য কোনো কার্যকরী উপায় আছে কিনা। করোনা মোকাবেলা ও অর্থনৈতিক ক্ষতি কমিয়ে আনতে সর্বস্তরে লকডাউনের পরিবর্তে হটস্পটভিত্তিক লকডাউন এবং সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে মাস্ক ব্যবহারের ওপর অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিসহ বেশকিছু গবেষণা জোর দিয়েছে। সারা দেশে প্রচলিত লকডাউনের পরিবর্তে কভিড রোগীর সংখ্যা চিহ্নিত হওয়ার ভিত্তিতে ছোট ছোট এলাকাকেন্দ্রিক (যেমন ইউনিয়ন বা উপজেলা) লকডাউন করা যেতে পারে। তাছাড়া সবার জন্য দেশে যতদিন করোনার প্রভাব থাকবে ততদিন বাড়ির বাইরে অবস্থানের সময় বাধ্যতামূলকভাবে মাস্ক ব্যবহারের ওপরও জোর দেয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশে গত বছর পহেলা বৈশাখের বিশাল অংকের অর্থনৈতিক ক্ষতির পর রমজান, রোজার ঈদ ও কোরবানির ঈদের ক্ষতিও ছিল অপূরণীয়। এরই মধ্যে দুঃসহ একটি বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। বলা হচ্ছে, এখন এর দ্বিতীয় ঢেউ চলছে। সামনে পহেলা বৈশাখ, রমজান ও ঈদুল ফিতর। এ সময়ে দেশ কীভাবে এ ক্ষতিগুলো কাটিয়ে উঠবে, সেটা সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে। বিশ্বব্যাপী মানুষ ব্যয় কমাচ্ছে এবং ঘরে থাকছে। ডেনমার্কে ২৯ শতাংশ মানুষের ব্যয় কমেছে লকডাউনের সময়। সুইডেনের অবস্থাও একই রকম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের অর্থনৈতিক প্রভাব বোঝা যাবে আরো কিছুদিন পর। এখন যে দ্বিতীয় ঢেউ চলছে, তা কতদিন ধরে চলবে এটি বলা মুশকিল। তবে এর মধ্যে ঘটে যেতে পারে বহু কিছু। এ পরিস্থিতিতে কোন দিকে যাবে আমাদের অর্থনীতি, আগামীতে দেশ কীভাবে তা মোকাবেলা করবে—এ রকম আরো বহু প্রশ্ন নিয়ে এ মুহূর্তে সবাই তাকিয়ে আছে সরকারের চিন্তাপ্রসূত কর্মপদ্ধতি ও দিকনির্দেশনার দিকে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যে দুর্বলতা দেখা গেছে, তা ঠিক করতে হবে। শ্রমিকদের কাজের নিশ্চয়তা থাকতে হবে। সব ধরনের প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখতে হবে। এক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকেও সমান মনোযোগ দিতে হবে। আগের সাধারণ ছুটিতে তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থও তারা পাননি নানা জটিলতার কারণে। এবারে তাদের কথা বিবেচনায় রেখে দ্রুত আর্থিক প্রণোদনা প্রদানের ব্যবস্থা করা দরকার। গত বছর পহেলা বৈশাখ, রমজান বা ঈদে যারা বিশাল বিনিয়োগ করেছিল, তা থেকে তারা কোনো ব্যবসা করতে পারেনি। এবারো পারবে কিনা, সন্দেহ রয়েছে। তাদের সহযোগিতা করতে হবে। এসব ছোট-বড় প্রতিষ্ঠানকে যেকোনোভাবেই হোক টিকিয়ে রাখতে হবে। করোনার প্রভাব ও বিধিনিষেধের কারণে দারিদ্র্যের সংখ্যা বেড়েছে বলে গবেষকরা বলছেন। হতদরিদ্রদের সংখ্যাও বেড়েছে। দেখা যাচ্ছে, অনেকেই প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারছে না। এমনকি খাবারও কিনতে পারছে না। কেউ কেউ বাড়ি ভাড়া দিতে পারছে না, চিকিৎসা করতে পারছে না। ঢাকা শহর ছেড়ে অনেকেই গ্রামে চলে গেছেন। তাদেরকে অর্থসহায়তা দিতে হবে। এসব মানুষকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে।