দশক সেরা অর্থনীতি

আমি বাজি ধরছি যে তিনটি দেশের পক্ষে

আমরা নতুন একটি বছরে প্রবেশ করেছি। কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন ঘিরে নতুন আশার বিস্তার ঘটেছে। হাতবদল হয়েছে হোয়াইট হাউজের কর্তৃত্বের। সব মিলিয়ে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা আর শঙ্কা থেকে আপাত আমরা আমাদের দৃষ্টি অন্যত্র সরিয়ে নিতে পারি। নবীন একটি দশকে পা রেখে আমরা বরং ভাবতে পারি যে আগামীতে কোন রাষ্ট্রগুলো বড় ধরনের অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্প হয়ে উঠবে।

আমরা নতুন একটি বছরে প্রবেশ করেছি। কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন ঘিরে নতুন আশার বিস্তার ঘটেছে। হাতবদল হয়েছে হোয়াইট হাউজের কর্তৃত্বের। সব মিলিয়ে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা আর শঙ্কা থেকে আপাত আমরা আমাদের দৃষ্টি অন্যত্র সরিয়ে নিতে পারি। নবীন একটি দশকে পা রেখে আমরা বরং ভাবতে পারি যে আগামীতে কোন রাষ্ট্রগুলো বড় ধরনের অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্প হয়ে উঠবে।

আমি বাজি ধরব দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম ও মেক্সিকোর পক্ষে, তিনটি দেশই উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া উন্নত অর্থনীতির দেশ, অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক ভিয়েতনামকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে উল্লেখ করছে, যেমন বাংলাদেশ ও ভারত। এদিকে মেক্সিকো অবস্থান করছে কম্বোডিয়া, বোতসোয়ানা কিংবা ইন্দোনেশিয়ার মতো উচ্চমধ্যম আয়ের কোনো একটা পর্যায়ে। আমার অনুমান, আগামী দশ বছরে উল্লিখিত প্রতিটি অর্থনীতিই একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাবে।

এদের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষ নেয়াটা সবচেয়ে নিরাপদ। ওদের শুরুটা হয়েছিল ১৯৭০-এর দশকে, পার্ক চুং হির আমলের শেষ বছরটিতে। ১৯৯৭ সালের পূর্ব এশীয় আর্থিক সংকট শুরুর আগে দেশটির অর্থনীতির আকার বেড়েছে এবং দুই দশক ধরে তারা ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।

দরিদ্রদের তুলনায় ধনী রাষ্ট্রগুলোর প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা কম। তবে ধনী রাষ্ট্র হলেও মানবসম্পদে বিনিয়োগের কারণে দক্ষিণ কোরিয়া অনেক বেশি সম্ভাবনাময়। বিশ্ব বৌদ্ধিক সম্পত্তি সূচক অনুসারে, ২০১৯ সালে প্রতি লাখ জনসংখ্যার বিপরীতে ৩ হাজার ৩২৯টি পেটেন্ট অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া এর সতীর্থ দেশগুলোকে ছাড়িয়ে যায়। ১ হাজার ৯৪৩টি পেটেন্ট অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জাপান। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রে এটি যথাক্রমে ৮৯০ ও ৮৬০। ২০১৯ সালের এপ্রিল—দক্ষিণ কোরিয়া প্রথম কোনো রাষ্ট্র, যারা দেশব্যাপী ফাইভজি ক্যাম্পেইন চালু করে। তাছাড়া ২০২৬ সালের মধ্যে বৈশ্বিক ফাইভজি মার্কেটের ১৫ শতাংশ দখলের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে দেশটির কোম্পানিগুলো। 

তারা আরো একটি চমত্কার কাজ করেছে। বিশ্বের প্রায় সব রাষ্ট্র যেখানে শিক্ষক সংকটে জর্জরিত, দক্ষিণ কোরিয়া চমত্কারভাবে সে সমস্যার সমাধান করে দেখিয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা রয়েছে শিক্ষক সংকট সমস্যাকে ঘিরে; যেমন অভিজিৎ ব্যানার্জি ও অ্যান্ড্রু নিউম্যান কিংবা ওদেড গ্যালোর ও জোসেফ জাইরা তাদের গবেষণাগুলোয় দেখিয়েছেন যে প্রয়োজনের তুলনায় স্কুলশিক্ষকদের অনেক কম বেতন দেয়া হয়। আমি মনে করি, এ কারণে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অনেকেই এ পেশা বেছে নিতে অনুৎসাহিত হন। ভালো শিক্ষকরা অনেকটাই কল্যাণকর জলবায়ু নীতিগুলোর মতো: এর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম লাভবান হয়, তবে বর্তমানকে এটি খুব একটা প্রভাবিত করতে পারে না।

দক্ষ শিক্ষক সমস্যা সমাধানে দক্ষিণ কোরিয়া যে কাজটি করেছে তা হলো, তারা তাদের দেশের সেরা মেধাবীদের উৎসাহিত করেছে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে। দক্ষিণ কোরিয়ার স্কুলশিক্ষকরা বর্তমানে দেশটির ধনী নাগরিকদের মধ্যে অন্যতম। দেশটিতে এমনও শিক্ষক রয়েছেন, যারা অনলাইনে অংকের ক্লাস নিয়ে ৮ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত আয় করতে সমর্থ হচ্ছেন। সচরাচর আমরা কিন্তু এমনটা ঘটতে দেখি না।

তাছাড়া দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট মুন জা-ইন তার অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের প্রচেষ্টাগুলোয় খুব ভালোভাবেই সফল হয়েছেন। যেমন প্রাসাদতুল্য ব্লু হাউজে না থেকে সিউলের শহরতলিতে সাধারণ একটি সরকারি কমপ্লেক্সকে তিনি প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন হিসেবে ব্যবহার করছেন। তার কাজটি হয়তো প্রতীকী, তবে সমাজে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রদান করে। আমার প্রত্যাশা, দক্ষিণ কোরিয়া আগামী দশ বছরের মধ্যে মাথাপিছু আয়ের দিক দিয়ে জাপানকে ছাড়িয়ে যাবে।

২০১০ সালে ভিয়েতনামের মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ১ হাজার ২৯৭ ডলার। দেশটি তখন বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল তিন অর্থনীতির মধ্যে অন্যতম। তালিকায় থাকা বাকি দুটি রাষ্ট্র চীন ও ভারত, যারা ভিয়েতনামের চেয়ে তুলনামূলক ধনী রাষ্ট্র। মূলত তখন থেকেই চমত্কার প্রবৃদ্ধির ধারবাহিকতা বজায় রাখতে সমর্থ হয়েছে ভিয়েতনাম, আজ তারা মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে ভারতকে পেছনে ফেলেছে।

ভিয়েতনামের সফলতার এ গল্পের সূত্রপাত ১৯৮৬ সালে। যখন ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টি তাদের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদে কমান্ড অর্থনীতি থেকে সরে আরো বেশি বাজারমুখী মডেলের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য ‘দোই মোই’ (নবায়ন) নীতি গ্রহণ করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভিয়েতনাম তাদের শুল্ক কমিয়েছে, সীমান্ত উন্মুক্ত করে দিয়েছে ব্যবসা ও বিদেশী বিনিয়োগের জন্য এবং বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে মানবসম্পদের উন্নয়নে।

তাছাড়া কভিড-১৯ মহামারী ব্যবস্থাপনায় ভিয়েতনামের অসামান্য সাফল্য অর্থনীতিতে বাড়তি শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে ভিয়েতনামের লাখপ্রতি অপরিশোধিত মৃত্যুহার মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২০ সালে যখন বিশ্বের অধিকাংশ অর্থনীতিই সংকুচিত হয়েছে, সেখানে ভিয়েতনামের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ৯ শতাংশ, অর্জনটি নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া ভিয়েতনাম যে ধারাবাহিকতার সঙ্গে বিদেশী বিনিয়োগপ্রবাহ আকৃষ্ট করছে, এটি তাদের বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তুলছে।

মেক্সিকোর অবস্থা অবশ্য ভিয়েতনামের মতো নয়। তারা মহামারীর কবলে পড়েছে। প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেস ম্যানুয়েল লোপেজ ওব্রাদর পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে মহামারী অব্যবস্থাপনার দায় তিনি এড়াতে পারেন না। যদিও ২০১৮ সালে আন্দ্রেস যখন প্রেসিডেন্ট  নির্বাচিত হন তখন মেক্সিকোজুড়ে তিনি অধুনাতন আশার সঞ্চার ঘটিয়েছিলেন। প্রবর্তন করেছিলেন নতুন একটি প্রগতিশীল অর্থনৈতিক এজেন্ডা, যার নাম তিনি দিয়েছিলেন ‘চতুর্থ রূপান্তর’। এ উদ্যোগের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি অভিজাত শ্রেণীর সুযোগ-সুবিধা কমানোর কথাও বলেছিলেন তিনি। বিষয়টিকে আরো বেশি ন্যায্য করার জন্য প্রেসিডেন্টের জন্য বরাদ্দকৃত লস পিনোসে না থেকে সাধারণ একটি আবাসিক ভবনে থাকতে শুরু করেন আন্দ্রেস।

ভিয়েতনামের পাশাপাশি মেক্সিকোর সামনেও বৈশ্বিক উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্রস্থলে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা বিদ্যমান। গত বছর কার্যকর হয় যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা চুক্তি (ইউএসএমসিএ)। চুক্তিটি এ তিন অর্থনীতির সংহতিকে আরো বেশি এগিয়ে নিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার পুঁজি, উন্নত প্রযুক্তি এবং মেক্সিকোর পর্যাপ্ত শ্রমশক্তিকে কাজে লাগিয়ে অঞ্চলটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জনে সক্ষম, এমনকি বিশ্বমঞ্চ থেকে চীনকে হঠিয়ে তাদের জায়গাটিও দখলে নিতে পারে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তার দাপ্তরিক কাজ করতে শুরু করেছেন, এবার নিশ্চয়ই ত্রিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নয়ন হবে। চুক্তির মাধ্যমে তিনটি রাষ্ট্রই উপকৃত হবে। তবে মেক্সিকোর লাভের পাল্লাটা হবে সবচেয়ে ভারী। কারণ প্রবৃদ্ধি অর্জনে তাদের সামনে অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি সুযোগ রয়েছে।

পরিশেষে বলব, ভারতের ঘটনাটি অনেকটাই ধাঁধার। কয়েক বছর আগেও তারা প্রতি বছরে ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্পে পরিণত হয়েছিল। দেশটির প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হয়েছে। বিশেষ করে ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত—স্বাধীনতার পর এত দীর্ঘ সময় ধরে আগে কখনই ভারতের প্রবৃদ্ধি এমন মন্দায় আক্রান্ত হয়নি।

যদিও মৌলিকভাবে ভারত এখনো অন্যতম শক্তিশালী উদীয়মান অর্থনীতি। তাদের আছে বিশ্বমানের তথ্যপ্রযুক্তি খাত। রয়েছে শক্তিশালী ওষুধ শিল্প। আরো রয়েছে উচ্চশিক্ষিত ছোট একদল কর্মিবাহিনী। প্রতিবন্ধকতা হলো দেশটির বিভাজনমূলক রাজনীতি। যা ক্রমে আস্থা হারিয়ে ফেলছে। ফলে গত কয়েক বছরে বিনিয়োগের হারও ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

ভারত যদি এর রাজনীতিকে পরিচ্ছন্ন করতে পারে তাহলে তারা বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হতে পারে। এখানে সবচেয়ে বড় বিষয়টি হচ্ছে ‘যদি’। বিশেষ করে বর্তমানে পরিপ্রেক্ষিতে। তাই এ দশকের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বিজয়ীদের বাছাইয়ের সময় স্বাভাবিকভাবেই ভারতের নামটা বাদ পড়ে যায়। 

[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]

 

কৌশিক বসু: বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ও আমেরিকার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক

ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস

আরও