কভিড-উত্তর আর্থিক খাত

নিরাপত্তা ঝুঁকি নিরসনে তথ্যপ্রযুক্তির টেকসই অবকাঠামো প্রয়োজন

‘রংপুর জেলার কাউনিয়া এলাকার বরুয়া হাটের কৃষক মো. আব্দুল মজিদ। জমিতে জৈব সার দেয়ার জন্য সার কিনেছিলেন অনলাইনে। আজ দুপুরে ডেলিভারি পাওয়ার পর বাকি টাকা বিকাশ করে দিলেন ক্ষেত থেকে ফিরে এসে। করোনা রোগ আসার আগে মজিদ মিয়ার মোবাইল ব্যবহার করা বলতে মাঝে মাঝে টুকটাক আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে কথা বলার মধ্যেই সীমিত

‘রংপুর জেলার কাউনিয়া এলাকার বরুয়া হাটের কৃষক মো. আব্দুল মজিদ। জমিতে জৈব সার দেয়ার জন্য সার কিনেছিলেন অনলাইনে। আজ দুপুরে ডেলিভারি পাওয়ার পর বাকি টাকা বিকাশ করে দিলেন ক্ষেত থেকে ফিরে এসে। করোনা রোগ আসার আগে মজিদ মিয়ার মোবাইল ব্যবহার করা বলতে মাঝে মাঝে টুকটাক আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে কথা বলার মধ্যেই সীমিত ছিল। করোনার পর দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেলে ভাবনায় পড়েছিলেন চাষাবাদ নিয়ে। অনলাইনে কেনাকাটার সুযোগে সমস্যা তো গেছেই, বরং সুবিধা হয়েছে বেশি। অল্প পড়ালেখা জানার সুবাদে নিজেই সারের উপাদান দেখে নিয়ে বুঝেশুনে কিনতে পারছেন। ক্লাস সেভেনে পড়ুয়া নাতনি তাকে ইউটিউব দেখা শিখিয়ে দিয়েছে। সামনের বছর চেষ্টা করবেন নিজেই সার বানাতে। আগে নাতনির হাতে মোবাইল দেখলে রাগ করতেন, করোনার সময়ে মোবাইল ব্যবহারের সুবিধা দেখে নিজেই বুঝেছেন নতুন জিনিস মানে খারাপ না।’ এটিকে কভিড-উত্তর নতুন স্বাভাবিকতার একটি খণ্ডচিত্র বলা যায়। বর্তমানে বাংলাদেশের আনাচ-কানাচে এ রকম হাজারো চিত্র নির্দেশ করে, নতুন শতকে এটাই স্বাভাবিকতা এবং অবশ্যই সেটা ইতিবাচক। তবে এ নতুন স্বাভাবিকতার সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার অর্থ এটা নয় যে নতুন স্বাভাবিকতায় আমরা ফেলে আসা শতকের সবকিছু বাদ দিয়ে নতুন করে শুরু করব। বরং আমাদের দীর্ঘদিনের অভ্যস্ততার বিষয়গুলোর সঙ্গে নতুন কিছু জিনিসের সম্মিলন ঘটিয়ে নতুনভাবে পথচলা শুরু করা বা পরবর্তীকালে আমাদের আর কী কী নতুন স্বাভাবিকতার সঙ্গে পরিচিতি হতে পারে এবং সেই অদেখা পরিস্থিতির সঙ্গে কীভাবে খাপ খাইয়ে টিকে থাকতে হবে, তার জন্য প্রস্তুত থাকা এবং তার উপায় বের করা।

করোনা পরিস্থিতিতে সব খাতই সংকটের মধ্যে পড়েছে। আর্থিক খাত বিশেষ করে ব্যাংক খাতে এর প্রভাব সুস্পষ্ট। করোনার কারণে ব্যবসায়িক লেনদেন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দীর্ঘ সময় কাজকর্ম এবং উৎপাদন বন্ধ থাকায় মানুষের মধ্যে সঞ্চয়ের সংগতি কমেছে, বরং মধ্যবিত্ত ও স্বল্প আয়ের মানুষরা এ সময় তাদের যেটুকু সঞ্চয় ছিল, তাই ভাঙিয়ে জীবনযাপনের ব্যয় নির্বাহ করেছে। সে কারণে ব্যাংকে সঞ্চয়ের পরিমাণ কমে গিয়েছিল বেশ। তবে অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলার সঙ্গে সঙ্গে আর্থিক সেবা ও ব্যাংক খাতে পরিবর্তনের ও খাপ খাইয়ে নেয়ার প্রচেষ্টা লক্ষণীয়। ব্যাংক খাতের সার্বিক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র জানার সময় এখনো আসেনি এবং করোনা অনিশ্চয়তা স্পষ্ট। তবে নতুন পরিস্থিতিতে তথ্যপ্রযুক্তি যে ব্যাংক রূপান্তরে সবচেয়ে বড় অনুষঙ্গ এ ব্যাপারে সবাই একমত ও কম-বেশি নিশ্চিত।

ক্ষয়ক্ষতি ও অনিশ্চয়তার মাঝে এটাও সত্যি যে যেকোনো নতুন পরিস্থিতি নতুন নতুন সম্ভাবনার জন্ম দেয়। করোনাকালীন ভয়ভীতির অবস্থা কাটিয়ে বেশ অনেকটাই স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ঘুরে দাঁড়িয়েছে অর্থনীতি। স্বাস্থ্যবিধি মেনে নতুন করে শুরু হয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য। আর এসবের মধ্য দিয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে নতুন করে বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এসব প্রক্রিয়ায় অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে তথ্যপ্রযুক্তি। কারণ কভিড পরিস্থিতি মানুষকে এটাই শিখিয়েছে, বলতে গেলে অভ্যস্ত করে দিয়েছে যে যা-ই ঘটুক না কেন, প্রযুক্তির সাহায্যে সবটা না হলেও অনেকটাই চলমান রাখা যায় জীবনযাত্রা।

কভিড-উত্তর পরিস্থিতিতে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক আর্থিক সেবার অবস্থা পর্যালোচনার জন্য কভিড-পূর্ব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা অত্যন্ত জরুরি। বিশ্বের আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে গত এক দশক আগে বেশ ভালোভাবেই আমাদের দেশে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক লেনদেন ও আর্থিক সেবার পথচলা শুরু হয়েছে। এমএফএস বড় পরিবর্তন এনেছে এ খাতে। এ পথে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাঝে যাত্রা শুরু করেছে বেশ দ্রুতগতিতে। তবে ভোক্তা পর্যায়ে প্রস্তুতি ছিল শ্লথ। সুষম বাজার ব্যবস্থায় ডিমান্ড অর্থাৎ ভোক্তার চাহিদা এবং উৎপাদকের সাপ্লাই অর্থাৎ জোগান দেয়ার সক্ষমতা দুটোই সমান জরুরি এবং এ দুটোই টেকসই বাজার ব্যবস্থার প্রধান শর্ত। কভিড-পূর্বে, তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক আর্থিক সেবার জোগান দেয়ার সক্ষমতা দ্রুতগতিতে বাড়লেও অনেক ক্ষেত্রে ভোক্তাদের সমভাবে সাড়া পাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। একটি বড় অংশের ভোক্তা এ ধরনের সেবার প্রয়োজনীয়তা ও উপযোগিতা অনুধাবন করতে পারছিলেন না। এ কঠিন কাজকে সহজ করেছে কভিড। করোনাকালে যেকোনো ধরনের যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে তথ্যপ্রযুক্তি কাজ করেছে। যেকোনো বিরূপ প্রাকৃতিক পরিস্থিতিতে তথ্যপ্রযুক্তির কোনো বিকল্প নেই—সাধারণ মানুষ এ সত্য উপলব্ধি করার সঙ্গে সঙ্গেই কিন্তু ভোক্তার চাহিদার বাজারটি তৈরি হয়ে গেছে। নতুন স্বাভাবিকতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে আমাদের বাজার ব্যবস্থায় তথ্যপ্রযুক্তির চূড়ান্ত ব্যবহার নিশ্চিত করার এখনই তাই সঠিক সময়।

ঝুঁকির ব্যাপারটি অবশ্য একটু অন্য রকম। করোনার আগেও সাইবার নিরাপত্তার বিষয়ে যথেষ্ট সচেতনতা তৈরি না হওয়ার কারণে তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। সচেতনতার অভাব বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে। এ ধরনের অল্প কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ভোক্তার মধ্যে নিরাপত্তাজনিত অনিশ্চয়তা তৈরি করে এবং ব্যবহারে অপারগতা, এমনকি বিনিয়োগেও প্রভাব ফেলে। করোনা পরিস্থিতিতে আর্থিক খাতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বল্প সময়ের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি গ্রহণ ও এ-সংক্রান্ত সেবা প্রদান শুরু করা হয়েছে বা দ্রুত বিস্তারের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এ দুর্যোগের সময়ে সাইবার নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়গুলো যথাযথ গুরুত্ব না পেলেও একটি টেকসই ব্যবস্থার জন্য এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবেলায় মনোযোগী হওয়ার বিকল্প নেই।

সর্বত্র তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করার ক্ষেত্রে যে বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি তা হলো এ বিষয়ে সঠিক জ্ঞান, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও সচেতনতার ব্যবস্থা করা। মনে রাখতে হবে, করোনাকালে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ছিল প্রয়োজনের তাগিদে। কিছুটা স্বপ্রণোদিত হয়ে, অন্যের সাহায্য নিয়ে আমরা আপত্কাল পার করেছি, এখনো করছি। তবে এটি কোনো স্থায়ী অবস্থা না-ও হতে পারে। সর্বত্র তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করার জন্য আমাদের এ বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দরকার, তথ্যপ্রযুক্তি-বিষয়ক টেকসই অবকাঠামো নিশ্চিত করার পাশাপাশি এ খাতের সঙ্গে জড়িত নিরাপত্তা ঝুঁকি নিরসন করার জন্য সর্বমহলের ঐকান্তিক আগ্রহ প্রয়োজন।

নতুন স্বাভাবিক সময়ে, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে রূপান্তর প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ সহজতর নয়। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রতিনিয়ত নানা পরিবর্তন হয় বিধায় এ খাতে ব্যাপক বিনিয়োগের প্রয়োজন পড়ে প্রতি মুহূর্তে। বিনিয়োগকারীর বিনিয়োগকৃত অর্থের সঠিক ব্যবহার এজন্য অত্যন্ত জরুরি। আর এ বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন সঠিক নেতৃত্ব। মনে রাখতে হবে যে অনাগত দিনগুলোতে আমাদের আর কোন কোন নতুন স্বাভাবিকতার সঙ্গে পরিচিত হতে হবে তা আমাদের অজানা। তাই বর্তমানে যে স্বাভাবিক নতুনে আমরা ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি বা যাচ্ছি, সেখানে তথ্যপ্রযুক্তি আমাদের সামনে যে সুযোগটা তৈরি করে দিয়েছে তার ইতিবাচক এবং সঠিক ব্যবহারই আমাদের অনাগত দিনের অজানা ঝুঁকি মোকাবেলা করার পথ দেখাবে। আমরা যদি এখন তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারি, তাহলে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় কোনোভাবেই টিকে থাকা সম্ভব নয়।

এ রকম মহামারীর সময়ে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক লেনদেন আমাদের সহযোদ্ধা হয়ে দাঁড়ায়। আবার এর বিপরীত চিত্রও আমরা দেখেছি। আমদের ব্যাংক ব্যবস্থায় কর্মী ও গ্রাহক উভয়ই যথেষ্ট প্রযুক্তিবান্ধব না হওয়ার কারণে আর্থিক খাতের ‘ফ্রন্টলাইনারস’ হিসেবে ব্যাংক কর্মীরা এ সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছেন। আমরা অনেক দক্ষ ব্যাংকারকে হারিয়েছি এ সময়। ফ্রন্টলাইনারস হিসেবে ব্যাংক কর্মীদের জন্য প্রণোদনা ছিল ঠিকই, তবে জীবনের পরিপূরক হিসেবে কোনো প্রণোদনাই যথেষ্ট নয় কখনো। ব্যাপক হারে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে হয়তো এমনটি হতো না। যেকোনো পরিস্থিতিতেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চলমান রাখা যায়। তবে তার জন্য দরকার প্রয়োজনীয় ও সঠিক অবকাঠামো এবং দক্ষ জনবল। তাছাড়া এ খাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অনৈতিকতা ও অপব্যবহার রোধের জন্য আইনের প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি।

নতুন স্বাভাবিকতায় আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারক, ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ ব্যাংক ব্যবস্থাপনার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখতে হবে যে নতুন স্বাভাবিকতার মানে পুরনো সবকিছু ঝেড়ে ফেলে নতুনভাবে শুরু করা নয়। বরং পুরনো অভিজ্ঞতার সঙ্গে নতুনত্বের সংযোজন করে নতুন পরিস্থিতি মোকাবেলা করার উপায় খুঁজে বের করা দরকার। লক্ষ রাখতে হবে যে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা মানে এটা নয় যে ব্যাংকে যে বিদ্যমান জনবল রয়েছে, তাদের উপযোগিতা নেই। ‘পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিদ্যমান দক্ষতার উপযোগিতা’ কোনোভাবেই চাকরিতে বহাল থাকার বা রাখার মানদণ্ড হিসেবে কাজ করতে পারে না। বিশেষত এ কভিড-পরবর্তী পরিস্থিতিতে। বরং এখন সুযোগ এসেছে কর্মীর প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়িয়ে তাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর। আপত্কালে ব্যাংক কর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিষ্ঠানের পাশে দাঁড়িয়েছেন আর তাদের সঙ্গে নিয়েই এগোতে হবে নতুন স্বাভাবিক সময়ে। এ কঠিন বাস্তবতায়, কর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের নতুন স্বাভাবিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে শেখানোর মধ্যেই প্রকৃত নেতৃত্বের সফলতা।

 

ড. শাহ্ মো. আহসান হাবীব: বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক

আরও