অভিমত

স্থাপত্যশিক্ষা, স্থপতি ও স্থাপত্যচর্চা

(গতকালের পর) স্থাপত্যশিক্ষার বিরামহীন পথচলা স্থাপত্যবিষয়ক অধ্যয়ন মূলত বিরামহীন। শিক্ষার্থী-পেশাজীবী নির্বিশেষে এ শিক্ষা গ্রহণ প্রতিনিয়ত চলমান। স্থাপত্য যাত্রা শুরু হয় প্রাক-প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আগে যখন একজন স্বপ্ন দেখেন বা ইচ্ছে পোষণ করেন যে তিনি স্থপতি হবেন এবং এরপর শিক্ষাগ্রহণ পর্বে যখন তিনি অধ্যয়নের সঙ্গে যুক্ত। এরপর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করে স্থপতি হওয়ার ঠিক আগে আগে তিনি একটি পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্ত থাকেন; স্থপতি হওয়ার পরেও তাকে একজন সিনিয়র স্থপতির সঙ্গে কাজ করতে হয় ন্যূনতম একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। উদ্দেশ্য, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে পেশাজগতের বাস্তবতার সংযোগ স্থাপন ও ধারণা নেয়া।

(গতকালের পর) 

স্থাপত্যশিক্ষার বিরামহীন পথচলা

স্থাপত্যবিষয়ক অধ্যয়ন মূলত বিরামহীন। শিক্ষার্থী-পেশাজীবী নির্বিশেষে এ শিক্ষা গ্রহণ প্রতিনিয়ত চলমান। স্থাপত্য যাত্রা শুরু হয় প্রাক-প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আগে যখন একজন স্বপ্ন দেখেন বা ইচ্ছে পোষণ করেন যে তিনি স্থপতি হবেন এবং এরপর শিক্ষাগ্রহণ পর্বে যখন তিনি অধ্যয়নের সঙ্গে যুক্ত। এরপর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করে স্থপতি হওয়ার ঠিক আগে আগে তিনি একটি পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্ত থাকেন; স্থপতি হওয়ার পরেও তাকে একজন সিনিয়র স্থপতির সঙ্গে কাজ করতে হয় ন্যূনতম একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। উদ্দেশ্য, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে পেশাজগতের বাস্তবতার সংযোগ স্থাপন ও ধারণা নেয়া।

পেশায় সম্পৃক্ত হওয়ার পর ধীরে ধীরে স্থপতির সম্পর্ক তৈরি হয় ক্লায়েন্ট গ্রুপ, অর্থাৎ যাদের জন্য স্থপতি তার স্থাপত্যিক সেবা দান করবেন তাদের সঙ্গে এবং এই পেশার সঙ্গে জড়িত অগ্রজ স্থপতি, প্রকৌশলী, কনট্রাক্টর এবং সংশ্লিষ্ট আরো অনেকের সঙ্গে। প্রতিটি ব্যক্তির সঙ্গে কাজ করতে করতে, তাদের পারস্পরিক কাজ ও ভাবের আদান-প্রদানের মাধ্যমে স্থপতি বাস্তবভাবে ক্রমাগত শিখতে থাকেন। এভাবে স্থাপত্য যাত্রার বিভিন্ন ধাপের মধ্যে এবং সম্পর্কযুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে রয়েছে এক বিরামহীন সংযোগ, যেন বিনিসুতার মালা। এই সংযোগ যত বেশি দৃঢ়, তত বেশিই এই যাত্রার সফলতা। 

খুব মৌলিক একটি ধারণা দেয়া হলো স্থাপত্য ও স্থপতির। এই স্বল্প আলোচনা থেকে সহজেই প্রতীয়মান যে স্থাপত্য অধ্যয়ন বিশেষ ধরনের একটি কারিগরি বিষয় এবং স্বাভাবিকভাবেই এর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাঠ্যক্রমেও রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। এখন এই স্থপতি হয়ে ওঠার যাত্রায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ভূমিকা এবং আমাদের দেশে এর অবস্থান নিয়ে অল্প কিছু আলোচনা করা যেতে পারে।

প্রথমত, কে বা কারা স্থাপত্য বিষয়ে অধ্যয়ন করতে অনুরাগী হবেন? কী তাদের বৈশিষ্ট্য? সবার জন্য এই বিষয়ে অধ্যয়ন কি ঢালাওভাবে প্রযোজ্য? ওপরের সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে স্থাপত্য একটি কারিগরি, প্রযুক্তিসমৃদ্ধ বিষয়, যার মধ্যে অতিমাত্রায় যুক্ত আছে সৃজনশীলতার গুণাবলি, যেখানে অহরহ প্রয়োজন হয় যুক্তিপূর্ণ বিশ্লেষণধর্মী অন্বেষা এবং নিরন্তর সাধনা। যেসব ছাত্রছাত্রী এসব গুণাবলি নিয়ে অধ্যবসায় করতে সদা প্রস্তুত, তারাই প্রকৃতভাবে স্থাপত্যশিক্ষার জন্য অনেক বেশি যোগ্যতর। এর সঙ্গে সঙ্গে একজন ভালো মানুষ হয়ে ওঠার প্রচেষ্টা একজন স্থপতির জন্য অত্যন্ত আবশ্যক। একটি সুন্দর সমাজের জন্য সবারই এই চেষ্টা থাকা উচিত, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে একজন স্থপতির বেলায় এই বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ‘ভালো’র সংজ্ঞা বা নিয়ামক কী? ‘ভালো’ শব্দটি অনেক সময় আপেক্ষিক। এর সংজ্ঞা একেকজন ব্যক্তি একেকভাবে দিতেই পারেন। কিন্তু সর্বজনীনভাবে ‘ভালো’র কিছু ধারণা রয়েছে মানবসমাজে এবং এটাও স্বীকৃত যে একজন ভালো মানুষ, সমষ্টিগত একটি ভালো সমাজ, সেটাই সব কল্যাণের ভিত্তি। সেই ভালোর মধ্যে রয়েছে সততা, সহমর্মিতা, সামাজিক সমতা, ন্যায়-নীতি ও সার্বিক কল্যাণে নিয়োজিত মূল্যবোধ এবং অন্যের যা কিছু শুভ ও কল্যাণকর, তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা।

স্থাপত্য শিক্ষার্থীর ভালো স্থপতি হয়ে ওঠার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি যে বিষয় তা হলো, স্থাপত্যের প্রতি তার এক ধরনের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ ও অনুরাগ থাকা। আমাদের দেশে বিদ্যালয় বা কলেজ লেভেলে উচ্চতর শিক্ষার জন্য নিজের পছন্দ-অপছন্দ কিংবা মেধার দিকনির্দেশনা নিয়ে কোনো সুচারু চিন্তাভাবনা করা হয় না। বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে অনেক সময় ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিতে হয় একজন ছাত্র বা ছাত্রী উচ্চতর শিক্ষার জন্য কী বিষয় নির্বাচন করবেন।

স্থাপত্য কী, কেন পড়ব কিংবা বিষয়টির প্রতি আগ্রহ কতটা এবং সর্বোপরি এই সৃজনশীল, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার ক্ষেত্রে একজন ছাত্র বা ছাত্রী কতটা সুনিপুণ ও আগ্রহী—এ বিষয়গুলো কিন্তু স্থাপত্যকে উচ্চশিক্ষার বিষয় হিসেবে নির্বাচন করার আগে একজন ছাত্র বা ছাত্রীর জেনে বা ভেবে নেয়া উচিত, তাকে যথাযথ পরামর্শ দেয়া উচিত। স্থাপত্য পড়ার জন্য উৎসাহ, সৃজনশীল মনোভাব, অংকনশৈলী, বিশ্লেষণধর্মী ও বিজ্ঞানভিত্তিক অনুসন্ধিৎসা প্রভৃতি একজন ব্যক্তিকে এ শিক্ষা সফল ও সার্থক হওয়ার পথটি অনেকটা এগিয়ে দেয়। এর ওপর তো রয়েছে যথাযথ পাঠ্যক্রম, শিক্ষা পদ্ধতি, শিক্ষক-শিক্ষিকার মান এবং তাদের যত্নশীল শিক্ষকতা ও নিবিড় তত্ত্বাবধান, যা একজন ছাত্র বা ছাত্রীকে তৈরি করার বাকি কাজটিকে ত্বরান্বিত করে। একটি বিষয় সবসময় লক্ষ রাখতে হয় যে একজন স্থপতি কখনই তার ছাত্রত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিত্যনতুন প্রেক্ষাপটসমৃদ্ধ জ্ঞানকে সমুন্নত রাখতে হলে তাকে সবসময়ই আপ-টু-ডেট থাকতে হয়। সমকালীন স্থানীয় এবং সম্পর্কযুক্ত বৈশ্বিক সমস্যা, যেমন জলবায়ু পরিবর্তন, সাসটেইনেবল বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যগুলো, রেসিলিয়েন্স বা সহনশীলতা, সামাজিক সুবিচার—এসব বিষয় এই ত্রিমাত্রিক ভৌত পরিবর্তন অর্থাৎ স্থপতিদের কাজের ক্ষেত্রের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শিক্ষার্থীদের এ বিষয়গুলো সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান এবং বাস্তবে তার প্রয়োগ ক্ষমতা তৈরি করে নেয়াকে নিশ্চিত করার জন্য পাঠ্যক্রমে এদের বিশেষ অন্তর্ভুক্তি খুব জরুরি।

স্থাপত্যশিক্ষা, স্থপতি ও স্থাপত্যচর্চা—এক বিনিসুতোর মালা

আমাদের দেশে অনেকেই মতামত প্রকাশ করেন যে স্থাপত্যেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং বাস্তবের পেশা ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। উল্লিখিত যোগসূত্রটিকে শক্তপোক্ত করার জন্য এই ফারাক বা বৈসাদৃশ্যকে কমিয়ে আনা জরুরি। কেননা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বাস্তবতার চলমান প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে তৈরি হলেই কেবল নব্য স্থপতি সহজে এবং যথাযথভাবে তার পেশাভিত্তিক সেবা প্রদান করতে পারেন।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় ২৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য পড়ানো হয়। এদের মধ্যে অবশ্য বিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) গুণগত মান নির্ণায়ক যে অ্যাক্রেডিটেশন বা স্বীকৃতি, তা মাত্র ১১টি বিশ্ববিদ্যালয় পেয়েছে। বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক স্থাপত্য শিক্ষাক্রমের শুরু ১৯৬২ সালে; প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশের প্রথম স্থাপত্য স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইউএসএইডের সহযোগিতায়। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা অধ্যাপকদের প্রচেষ্টায় তৈরি হয় এর পাঠ্যক্রম। আজ অবধি দেশের সব স্থাপত্য স্কুলে অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীরা যে পাঠ্যক্রম অনুসরণ করেন, তার অনেকটাই বুয়েটের পুরনো পাঠ্যক্রমেরই কিছুটা উন্নীত সংস্করণ। বিশেষ ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন এলেও বর্তমানে দেশীয় প্রেক্ষাপটকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এই পাঠ্যক্রমগুলোর নিয়মিত পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করা সময়ের দাবি।

স্থাপত্যশিক্ষার ক্ষেত্রে একজন শিক্ষকের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কেননা ভবিষ্যৎ দেশ নির্মাণের ভার যে স্থপতি প্রজন্ম নেবে, তাদের গড়ে তোলার সম্পূর্ণ দায়িত্ব তো এই শিক্ষককুলের ওপর। এখানে গুরু-শিষ্য পরম্পরায় সূক্ষ্ম বন্ধন তৈরি করতে পারে গভীর বোধ ও মননসম্পন্ন নবীন স্থপতি। তবে একথাও ঠিক, যেভাবে স্থাপত্য স্কুল, শিক্ষার্থী এবং সেই অনুপাতে শিক্ষক-শিক্ষিকার প্রয়োজন বেড়ে চলেছে, তাতে সব শিক্ষক গুরু হয়ে উঠতে পারবেন, তা আশা করা ঠিক নয়। কিন্তু শিক্ষকের গুণগত মান বজায় রাখা তো নিশ্চিত করা যায়! কোনোভাবে কাউকে আঘাত না দিয়ে একটি ব্যক্তিগত মতামত উল্লেখ করতে চাই। শুধু বা সব ক্ষেত্রে, প্রাপ্ত উচ্চতম নম্বর বা সর্বাধিক সিজিপিএ কিংবা বিদেশের ডিগ্রি স্থাপত্যশিক্ষার জন্য শিক্ষক নির্বাচনের মাপকাঠি হওয়া উচিত নয়। একজন ভালো শিক্ষকের যেসব গুণাবলি থাকলে তিনি একজন উচ্চপর্যায়ের মেন্টর, একজন গাইড এবং শিক্ষক হয়ে ছাত্রছাত্রীর শিক্ষা প্রণালির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক তৈরি করতে পারেন, সেই বিচারেই শিক্ষকের নির্বাচন হওয়া খুব জরুরি। শুধু স্থাপত্যের কারিগরি বিষয়গুলো এবং সংশ্লিষ্ট জ্ঞান নয়, বরং একজন মূল্যবোধসম্পন্ন সচেতন মানুষ হয়ে ওঠার ব্যাপারেও শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা দেয়া, তাদের ভেতর আত্মানুসন্ধানের মাধ্যমে উত্কর্ষ সাধনের স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে দেয়া এ তো শিক্ষক এবং অগ্রজ স্থপতিরাই পারেন।  শিক্ষকের একজন সমৃদ্ধিশালী শিক্ষক হয়ে ওঠা এবং ছাত্রছাত্রীদের নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে গড়ে তোলার এই বাড়তি প্রচেষ্টাকে যথাযথ সম্মান দেয়া শুধু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নয়, ছাত্রসমাজ তথা সমগ্র সমাজের কর্তব্য।

পেশাজীবী একজন স্থপতির প্রতিশ্রুতি রক্ষা বা কমিটমেন্ট এবং মূল্যবোধ উভয়ই খুব জরুরি। বর্তমান সমাজের ক্রমে ক্ষয়ে যাওয়া মূল্যবোধ, পুঁজিবাদী ও ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি, মনের জীর্ণতা, স্বার্থপরতা ও লোভ—এ সবকিছু থেকে বেরিয়ে এসে একজন স্থপতিকে নিজ মূল্যবোধ জোরালোভাবে সংরক্ষণ করে রাখতে পারতে হবে। কেননা একজন স্থপতি মূলত একজন শিল্পী, তথাকথিত ব্যবসায়ী তিনি নন। তার কাজের, তার মনের সততা এবং সাধনাই প্রতিফলিত হবে তার স্থাপত্যকর্মে—একথা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নবীন স্থপতির সবসময় মনে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে একজন স্থপতির একটি ভুলের জন্য এক বা একাধিক ব্যক্তিকে নানাভাবে মূল্য দিতে হতে পারে। এটা কখনই কাম্য নয়।

সমকালীন কর্মক্ষেত্র, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ এবং এর সম্ভাব্য বিস্তার

প্রতি বছর উল্লিখিত সব স্কুল থেকে বেশ কিছুসংখ্যক ছাত্রছাত্রী স্থপতি হয়ে বের হন। ভবিষ্যৎ স্থপতিরা তাদের শিক্ষানবিশ সময়কাল অতিবাহনের জন্য ও পরবর্তী সময়ে চাকরি করার জন্য পর্যাপ্ত প্রতিষ্ঠান খুঁজে পান না। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কিছু চাকরি বা শিক্ষানবিশের সুযোগ থাকলেও তা ক্রমবর্ধমান চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়। একসময় নগরকেন্দ্রিক স্থাপত্য ও স্থাপত্যচর্চাকেই মূল অধ্যয়ন এবং কাজের পরিধির মধ্যে বিবেচনা করা হতো এবং এখনো কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এ পেশার দৌরাত্ম্য মূলত বিত্তবান, অভিজাত ও শিক্ষিত সমাজের মধ্যেই ঘূর্ণায়মান। সময় এসেছে স্থাপত্য পেশা ও অনুশীলনের পরিধি বা ব্যপ্তি বৃদ্ধি করার; শুধু কেন্দ্রীয় শহর নয়, বরং ইন্টারমিডিয়েট বা মধ্যবর্তী শহর এমনকি গ্রাম পর্যায়ে স্থাপত্যের কার্যক্রম পৌঁছে দেয়া; স্থাপত্য দিয়ে গ্রাম-শহর-নগর, পরিবেশ, প্রকৃতিকে সমৃদ্ধ করা এবং সেই লক্ষ্যে পর্যাপ্ত গবেষণালব্ধ তথ্য ও জ্ঞান নব্য স্থপতিদের মধ্যে পৌঁছে দেয়া। মুজিব শতবর্ষে ‘আশ্রয়নের’ মতো প্রকল্পের পাশাপাশি এমন উদ্যোগ হতে পারে জাতির পিতার স্বপ্নপূরণের আরেকটি ধাপ।

আমাদের দেশে বড় বড় শহর নানাভাবে অনেকটাই পরিপৃক্ত। তা সে জনসংখ্যা হোক, ভৌত কাঠামোসংবলিত built environment হোক কিংবা বর্ধিষ্ণু স্থপতিদের কাজের সুযোগের পরিমাণই হোক। আবার একথাও ঠিক যে ছোট বা মধ্যবর্তী শহরগুলোয়ও এখনো শুধু ব্যক্তিগতভাবে স্থাপত্যচর্চাকে সত্ভাবে পেশা হিসেবে নিয়ে আর্থিকভাবে টেকা সম্ভব নয়। সেই বাজার এখনো তৈরি হয়নি। তাহলে ক্রমবর্ধমান যে পরিমাণ শিক্ষার্থী নব্য স্থপতি হিসেবে বের হচ্ছেন, তাদের কাজের নিশ্চয়তা কীভাবে হবে?

একটি বিষয় এখানে উল্লেখযোগ্য। কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের একটি বৃহৎ অংশ ছোট শহর বা গ্রাম থেকে আসছেন এবং তাদের সৃজনশীল বৈশিষ্ট্য ও মেধার পাশাপাশি রয়েছে প্রকৃতিলব্ধ এক ধরনের চেতনা ও মনন। নগরকেন্দ্রিক স্থাপত্যচর্চাকে প্রসারিত করার অভিপ্রায়ে পাঠ্যক্রমে যদি গ্রামাঞ্চলকেও একই প্রাধান্য দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তবে তার ভিত্তিতে শিক্ষালাভ করে লব্ধ স্থাপত্যিক জ্ঞান ও অনুশীলনকে দেশের আনাচে-কানাচে কাজে লাগাতে পারেন এই নব্য স্থপতিকুল; যাদের নাড়ির টান এখনো গ্রামের সঙ্গে যুক্ত; যাদের এখনো সরাসরি যোগাযোগ আছে গ্রামাঞ্চলের সঙ্গে। দেশীয়, স্থানিক প্রভৃতি পরিপ্রেক্ষিতকে কাজে লাগিয়ে এই নবীন সৈনিক দল নামতে পারে ভবিষ্যৎ দেশ গড়ার অভিযানে। কমিউনিটি আর্কিটেক্ট বা Barefoot architectg-এর মতো কনসেপ্টের প্রয়োজন মনে হয় এই সমাজে এখন এসেছে।

আরেকটি উপায়ও রয়েছে নবীনদের কাজের পরিধি বাড়াতে। যদিও এটি তেমন নতুন কোনো চিন্তা নয়, তবে এখনো বহুলভাবে কার্যকরী হয়ে ওঠেনি। সৃজনশীলতা একজন স্থপতির সহজাত গুণ। কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ ছাড়াও তার সঙ্গে যুক্ত হয় পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত নানা বিষয়, যেমন ছবি আঁকা, ফটোগ্রাফি, গ্রাফিক ডিজাইন প্রভৃতি। সাম্প্রতিককালে অনেক স্থপতি আছেন, যারা শিল্প ও সংস্কৃতির নানা শাখায় নিজ গুণে সমাদৃত। যেমন চলচ্চিত্র, সাহিত্য, চিত্রকলা, সংগীত, নৃত্য, ফটোগ্রাফি প্রভৃতি। পাঠ্যক্রমে এই বিশেষ দিকগুলোকে পৃথকভাবে প্রাধান্য দিলে এবং কর্মক্ষেত্রে মূল্যায়ন করা হলে নবীন স্থপতিদের জন্য বহুমুখী কর্মক্ষেত্রের সুযোগ তৈরি হতে পারে। স্থাপত্যচর্চার পাশাপাশি গড়ে উঠতে পারে স্থাপত্য তথ্যচিত্র বা ফটোগ্রাফি, স্থাপত্য পেইন্টিংয়ের মতো আরো নানা পেশা।

একটি বিষয়ের দিকে একটু নজর দেয়া দরকার। দুঃখজনক হলেও সত্যি, আমাদের দেশে এখনো এক ধরনের সামাজিক বিভেদ বিরাজ করে, রয়েছে আর্থিক বৈষম্য। এর মধ্যে যুক্ত হয়েছে চলমান প্যানডেমিক পরিস্থিতিতে স্পষ্ট হওয়া ডিজিটাল বিভেদ। স্থাপত্যশিক্ষায় যুক্ত একটি বড় সংখ্যার শিক্ষার্থী দল নানাভাবে তাদের অনলাইন অধ্যয়নে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। সরকারি কিংবা যেখানে প্রযোজ্য সেসব ক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোগে অথবা সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে স্থাপত্যশিক্ষা-সংক্রান্ত নীতিমালা, উচ্চ মানসম্পন্ন স্থাপত্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি, ডিজিটাল বিভেদ কমিয়ে আনা—এমন নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ ও তা কার্যকর করা—এসব উদ্যোগ নবীন স্থপতিদের জন্য নিয়ে আসতে পারে আশার আলো, সেই সঙ্গে ডিজিটাল বাংলাদেশের যে স্বপ্ন, তা পূরণের দিকে একটি বড় পদক্ষেপও নেয়া হবে।

যথাযথ বা ভালো স্থাপত্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শুধু ব্যক্তিজীবনকেই ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে না, বর্তমান হুমকির সম্মুখীন পরিবেশ-প্রতিবেশকেও উন্নত করতে সহায়ক হতে পারে। বর্তমান বৈশ্বিক এবং দেশীয় প্রেক্ষাপটের আলোকে স্থাপত্যশিক্ষা আজ অনেক নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। এর মধ্যে যুক্ত হয়েছে চলমান প্যানডেমিক পরিস্থিতি, যার কারণে অনলাইন শিক্ষা পদ্ধতির প্রচলন, আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির জন্য ডিজিটাল সুযোগ-সুবিধা ইত্যাদির চ্যালেঞ্জ প্রভৃতি। এ সবকিছু মাথায় রেখে স্থাপত্য শিক্ষাক্রমে, শিক্ষা পদ্ধতিতে একটি সুচিন্তিত পরিবর্তন এ পেশা এবং পেশাজীবীদের দেশের সার্বিক কল্যাণে আরো কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। একই সঙ্গে স্থপতিকে ব্যক্তিচেষ্টায় নিজেকে তৈরি করে নেয়ার প্রক্রিয়ায় অনুপ্রাণিত করতে হবে এক অসাধারণ জ্ঞানচর্চার মধ্য দিয়ে। যার সাধনায় যত বেশি আন্তরিকতা, যার মধ্যে মানুষের প্রতি, নিজ দেশের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার পরশ রয়েছে, সাধনার প্রতি আস্থাশীল, সে-ই এগিয়ে যেতে পারবে এই পেশার শিখরে; শহর-গ্রাম নির্বিশেষে এই নির্মাণ শিল্পী দল সৃজনশীল কাজের মধ্য দিয়ে নতুন দেশ গড়বে। এই স্বপ্নীল প্রত্যাশা এই বিশেষ মুজিব জন্মশতবর্ষে ও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে তো থাকতেই পারে! (শেষ)

 

জাকিয়া রহমান ঋতা: সহকারী অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ

স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

আরও