প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন। ৩ জানুয়ারি জীবনমঞ্চ ত্যাগ করেছেন, বিকাল ৫টায় তিনি ঢাকার বনানীর নিজ বাসায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
উপন্যাস থেকে সিরিজ নাটক—সর্বক্ষেত্রে ছিল তার স্বতঃস্ফূর্ত বিচরণ। রাবেয়া খাতুন উপন্যাস লিখেছেন ৫০টিরও বেশি, চার খণ্ডে সংকলিত ছোটগল্পের সংখ্যা চার শতাধিক। ছোটদের জন্য লেখা গল্প-উপন্যাসও সংখ্যায় কম নয়। বাংলাদেশের ভ্রমণসাহিত্যের অন্যতম লেখক তিনি
রাবেয়া খাতুনের জীবন
রাবেয়া খাতুনের জন্ম ১৯৩৫ সালে বিক্রমপুরে। তিনি মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক বাড়ি মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলায় অবস্থিত ষোলঘর গ্রামে। আরমানিটোলা বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা (বর্তমানে মাধ্যমিক) পাস করেন ১৯৪৮ সালে। ১৯৫২ সালের ২৩ জুলাই সম্পাদক ও চিত্র পরিচালক এটিএম ফজলুল হকের সঙ্গে রাবেয়া খাতুনের বিয়ে হয়। তার স্বামী প্রয়াত এটিএম ফজলুল হক ছিলেন দেশের চলচ্চিত্রবিষয়ক প্রথম পত্রিকা সিনেমার সম্পাদক ও চিত্রপরিচালক। বাংলাদেশের প্রথম শিশুতোষ চলচ্চিত্র ‘প্রেসিডেন্ট’-এর পরিচালকও তিনি।
সৃষ্টিকর্ম
লেখালেখির পাশাপাশি রাবেয়া খাতুন শিক্ষকতা ও সাংবাদিকতাও করেছেন। তার প্রকাশিত পুস্তকের সংখ্যা ১০০-এর বেশি। এর মধ্যে রয়েছে উপন্যাস, গবেষণাধর্মী রচনা, ছোটগল্প, ধর্মীয় কাহিনী, ভ্রমণকাহিনী, কিশোর উপন্যাস, স্মৃতিকথা ইত্যাদি। রেডিও, টিভিতে প্রচারিত হয়েছে অসংখ্য নাটক, জীবন্তিকা ও সিরিজ নাটক। তার গল্পে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে কয়েকটি। তার রচিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক জনপ্রিয় উপন্যাস মেঘের পর মেঘ অবলম্বনে বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম ২০০৪ সালে নির্মাণ করেন চলচ্চিত্র ‘মেঘের পরে মেঘ’। ২০১১ সালে তার আরেকটি জনপ্রিয় উপন্যাস মধুমতী অবলম্বনে পরিচালক শাহজাহান চৌধুরী একই শিরোনামে নির্মাণ করেন চলচ্চিত্র ‘মধুমতী’। এছাড়া অভিনেত্রী মৌসুমী ২০০৩ সালে তার লেখা কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি অবলম্বনে একই শিরোনামে নির্মাণ করেন চলচ্চিত্র ‘কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি’। রাবেয়া খাতুন উপন্যাস লিখেছেন ৫০টিরও বেশি, চার খণ্ডে সংকলিত ছোটগল্পের সংখ্যা চার শতাধিক। ছোটদের জন্য লেখা গল্প-উপন্যাসও সংখ্যায় কম নয়।
বাংলাদেশের ভ্রমণসাহিত্যের অন্যতম লেখক তিনি। কর্মজীবনে অনেক মানুষের সান্নিধ্যে এসেছেন তিনি। উদ্বুদ্ধ হয়েছেন যাদের দ্বারা স্মৃতিমূলক রচনার মধ্য দিয়ে তাদের ব্যক্তিত্ব ও বৈচিত্র্যময় ব্যক্তিত্বকে পাঠকের কাছে তুলে ধরেছেন। ছোটগল্প দিয়ে শুরু হলেও লেখক পরিচয়ে প্রথমত তিনি ঔপন্যাসিক। প্রথম উপন্যাস ‘মধুমতী’ (১৯৬৩) প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই শক্তিমান কথাসাহিত্যিক হিসেবে পরিচিতি পান। ক্ষয়িষ্ণু তাঁতি সম্প্রদায়ের জীবন সংকট ও নাগরিক উঠতি মধ্যবিত্ত জীবনের অস্তিত্ব জিজ্ঞাসার মধ্যে ব্যক্তিকে আবিষ্কার করেছিলেন রাবেয়া খাতুন এ উপন্যাসে। তিনি ভ্রমণসাহিত্য রচনাকে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম হিসেবে বিবেচনা করেছেন বলে তার ভ্রমণসাহিত্যের বইও অনেক। বেশকিছু আত্মজৈবনিক স্মৃতিমূলক রচনা লিখেছেন। একাত্তরের নয়মাস (১৯৯০) বইয়ে তুলে ধরেছেন একাত্তরের শ্বাসরুদ্ধকর দিনগুলোর কথা।
রাবেয়া খাতুন ঘুরেছেন অনেক দেশ—ইংল্যান্ড, আমেরিকা, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, সুইডেন, জাপান, নেপাল, ভারত, সিকিম, পাকিস্তান, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মিসর, দুবাই, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, উজবেকিস্তান, মরিশাস, মালদ্বীপ, সুইজারল্যান্ড। এছাড়া টরন্টো ইউনিভার্সিটি বাংলা বিভাগের আমন্ত্রণে রাবেয়া খাতুন ঘুরে এসেছেন কানাডায়।
সাংগঠনিক কার্যক্রম
বাংলা একাডেমি, চলচ্চিত্র জুরি বোর্ড, লেডিস ক্লাব, বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ, মহিলা সমিতিসহ অসংখ্য সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন রাবেয়া খাতুন। তার নিজস্ব সম্পাদনায় পঞ্চাশ দশকে বের হতো ‘অঙ্গনা’
নামের একটি নারীদের মাসিক পত্রিকা।
পুরস্কারপ্রাপ্তি
সাহিত্যচর্চার জন্য পুরস্কার হিসেবে পেয়েছেন একুশে পদক (১৯৯৩), বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭৩), নাসিরুদ্দিন স্বর্ণপদক (১৯৯৫), হুমায়ূন স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮৯), কমর মুশতারী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৪), বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ পুরস্কার (১৯৯৪), শের-ই-বাংলা স্বর্ণপদক (১৯৯৬), ঋষিজ সাহিত্য পদক (১৯৯৮), লায়লা সামাদ পুরস্কার (১৯৯৯) ও অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৯)। ছোটগল্পের জন্য পেয়েছেন নাট্যসভা পুরস্কার (১৯৯৮)। সায়েন্স ফিকশন ও কিশোর উপন্যাসের জন্য পুরস্কৃত হয়েছেন শাপলা দোয়েল পুরস্কার (১৯৯৬), অতীশ দীপঙ্কর পুরস্কার (১৯৯৮), ইউরো শিশুসাহিত্য পুরস্কার (২০০৩)। ছোটগল্প ও উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়ন হয়েছে প্রেসিডেন্ট (১৯৬৬), কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি (২০০৩), মেঘের পরে মেঘ (২০০৪), ধ্রুবতারা, মধুমতী (২০১০)। টিভি নাটকের জন্য পেয়েছেন টেনাশিনাস পুরস্কার (১৯৯৭), বাচসাস (বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি) পুরস্কার, বাংলাদেশ কালচারাল রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন মিলেনিয়াম অ্যাওয়ার্ড (২০০০), টেলিভিশন রিপোর্টার্স অ্যাওয়ার্ডসহ (২০০০) তিনি এ পর্যন্ত অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছেন। বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অবদানের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবেন কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন।