বাংলাদেশকে বিনিয়োগের বড় ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে ভারতের আদানি গ্রুপ। এরই মধ্যে চট্টগ্রামে নির্মীয়মাণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের কাজ পেয়েছে আদানি গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আদানি পোর্টস অ্যান্ড এসইজেডস। প্রত্যাশা করা হচ্ছে, আগামী ২৬ মার্চের মধ্যেই এ-সংক্রান্ত চুক্তি সই হয়ে যাবে। চুক্তি সই হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অঞ্চলটি উন্নয়নের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিতে প্রস্তুত গৌতম আদানির মালিকানাধীন ভারতীয় জায়ান্ট আদানি গ্রুপ।
সমুদ্রপথের নৈকট্য বিবেচনায় চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে গড়ে তোলা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর। ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যকার জিটুজি সমঝোতার ভিত্তিতে এখানে গড়ে তোলা হচ্ছে ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল। ভারত সরকারের অংশীদার হিসেবে আদানি পোর্টস অ্যান্ড এসইজেডস অঞ্চলটি উন্নয়নের কাজ শুরু করতে যাচ্ছে। সম্প্রতি এ অঞ্চল নির্মাণের জন্য স্থানও চূড়ান্ত করা হয়েছে।
ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের বাংলাদেশ সূত্র জানিয়েছে, ডেভেলপার হিসেবে মিরসরাইয়ের ভারতীয় অঞ্চলটি উন্নয়নের জন্য প্রথমে আদানি গ্রুপ ও আরেকটি ভারতীয় প্রতিষ্ঠান এ নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছিল। প্রতিষ্ঠান দুটির আগ্রহপত্র বিবেচনার পর এর মধ্যে আদানি পোর্টসকে এ কাজের জন্য মনোনীত করা হয়েছে। মহামারীর কারণে অঞ্চলটি উন্নয়নের সার্বিক প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটলেও বর্তমানে তা চলমান রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গোটা প্রক্রিয়ায় প্রথম সমস্যা ছিল অর্থনৈতিক অঞ্চলের স্থান নির্বাচন নিয়ে। বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরের জোন-১৯ চূড়ান্ত করার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, ২৬ মার্চের মধ্যেই জমি-সংক্রান্ত টার্মস শিট বা চুক্তি সই হয়ে যাবে। তবে এক্ষেত্রে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের জন্য অঞ্চলটিতে জেটি নির্মাণের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে আদানি গ্রুপ। কারণ জেটি নির্মাণের অনুমোদন না পেলে ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করা যাবে না। এ কারণে আদানি গ্রুপ চাইছে সামগ্রিক লজিস্টিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করেই কাজে নামতে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আদানি পোর্টস বর্তমানে জেটিটি নির্মাণের অনুমোদন পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। এক্ষেত্রে বেজার সম্মতির পাশাপাশি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অনুমতির বিষয়টিও জড়িত। জেটি নির্মাণের অনুমতি পেলেই অঞ্চলটি উন্নয়নের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে নেবে আদানি।
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সফরকালে দেশটির বিনিয়োগকারীদের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা নিয়ে সমঝোতা স্মারক সই হয়। প্রাথমিকভাবে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় ৪৬০ একর ও বাগেরহাটের মোংলায় ১১০ একর জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার আগ্রহ দেখিয়েছিল ভারত। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার আগ্রহ দেখায় দেশটি। এ বিষয়ে বেজার সঙ্গে আদানির সমঝোতা স্মারক সই হয় ২০১৯ সালের ৪ অক্টোবর। গত বছরের ১ জানুয়ারি উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুমোদন পায় আদানি।
প্রসঙ্গত, আদানি গ্রুপ ভারতের বৃহত্তম বেসরকারি বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান। কমোডিটি বা নিত্যপণ্যের ট্রেডার হিসেবে আশির দশকের শেষ দিকে যাত্রা করে গ্রুপটি। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে আদানি গ্রুপের ব্যবসার ব্যাপ্তি ক্রমেই বেড়েছে। ভারতে অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের পূর্বাভিজ্ঞতাসম্পন্ন গ্রুপটির বার্ষিক আয় দেড় হাজার কোটি ডলার। পূর্বাভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বাংলাদেশেও অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নে আগ্রহী হয়ে উঠেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বর্তমানে ফেনী, চট্টগ্রামের মিরসরাই ও সীতাকুণ্ড মিলিয়ে ৩০ হাজার একর জমিতে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর প্রতিষ্ঠার কাজ এগিয়ে চলছে। শুরুতে এর মধ্যে এক হাজার একর জমিতে ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের কথা ছিল। তবে হালনাগাদকৃত তথ্য বলছে, শিল্পনগরের ১৯ নম্বর জোনে চিহ্নিত জমির পরিমাণ ৮০০-৯০০ একর।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চিহ্নিত জমির দাম পরিশোধ করতে হবে আদানি গ্রুপকে। এখানকার ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বেজা) যে অর্থ ব্যয় করছে, তা বেজার ইকুইটি হিসেবে বিবেচিত হবে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এ অঞ্চল উন্নয়নে ২০-৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। জেটি নির্মাণেও প্রায় সমপরিমাণ বিনিয়োগের প্রয়োজন পড়তে পারে। অঞ্চলটি উন্নয়নের পাশাপাশি আদানি গ্রুপ এ অঞ্চলে আরো ২০-৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাকি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে রোড শোর মাধ্যমে প্রচারণা কার্যক্রম চালানো হবে।
এ বিষয়ে বেজার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের সর্বশেষ হালনাগাদ হলো—পরামর্শক নিয়োগের কাজ চলছে। ভারতীয় একটি প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হবে। শর্ট লিস্টিং হয়েছে, ১৯ জানুয়ারি প্রস্তাব জমা নেয়া হবে। পরামর্শক নিয়োগ হলেই ভৌত কাজগুলো পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে যাবে। অঞ্চলটি উন্নয়ন করবে আদানি গ্রুপ। অঞ্চল উন্নয়নের কিছু কাজে সহায়ত করবে বেজা। পরামর্শক নিয়োগের পর কাজগুলো শুরু করা হবে। জোন উন্নয়নের কাজ শুরুর বিষয়ে সমঝোতার প্রক্রিয়া চলছে। আমরা জমিটা দেব, সেটা মোটামুটি চিহ্নিত হয়েছে। আপাতত জোন-১৯ চিহ্নিত করা হয়েছে। এখন জমি কোন মডেলে উন্নয়ন হবে, সেটা চূড়ান্ত করা হবে। কোন মডেলে ডেভেলপার হিসেবে আদানির কাজ শুরু হবে, সে বিষয়েও এখন সমঝোতার প্রক্রিয়া চলছে। বিষয়টি দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে। এর সঙ্গে জেটি নির্মাণের বিষয়েও আলোচনা হবে। সে আলোচনায় দুই পক্ষ থেকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে।
বেজা জানিয়েছে, বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরে ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় ভারতের কাছ থেকেই ঋণ পাওয়া যাচ্ছে সাড়ে ১১ কোটি ডলার। তৃতীয় লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি) আওতায় এ ঋণ পাচ্ছে বাংলাদেশ। ২০১৭ সালের অক্টোবরে ভারতের তত্কালীন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি বাংলাদেশ সফরে এলে তৃতীয় এলওসি সই হয়। এর আওতায় মোট ঋণের প্রতিশ্রুতি ছিল ৪৫০ কোটি ডলার।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী বণিক বার্তাকে জানান, বর্তমান সরকারের স্থায়িত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছে বিনিয়োগের আদর্শ স্থান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের কাজটি দ্রুত শুরু হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।