দীর্ঘদিন ধরে চিনি উত্তোলন করতে না পারায় এমনিতে ব্যবসা খারাপ যাচ্ছে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) ডিলারদের। সম্প্রতি সরকারি চিনিকল বন্ধের আশঙ্কায় নতুন করে অনিশ্চয়তা জেঁকে বসেছে তাদের মধ্যে। এ অনিশ্চয়তা থেকে ডিলারশিপ ছাড়ছেন ব্যবসায়ীদের অনেকেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কিছুদিন ধরে চিনিকল নিয়ে অস্থিরতার কারণে বিএসএফআইসির ডিলারশিপ বাতিলের হার বেড়েছে। গত এক মাসে ৩২৫ জন ডিলার তাদের ডিলারশিপ বাতিলের আবেদন করেছেন করপোরেশনের কাছে। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এক মাসে প্রায় ৭৯ জনের ডিলারশিপ বাতিল করে জামানতের অর্থ ফেরত দিয়েছে বিএসএফআইসি। তবে অর্থ সংকটের কারণে বাকি আবেদনকৃত ডিলারদের জামানত ফেরত দিতে পারেনি করপোরেশন। সক্রিয় ডিলারদের আরো অনেকে ডিলারশিপ তুলে নিতে চাইছে বলে দাবি করেছেন খাতুনগঞ্জের একাধিক চিনি ব্যবসায়ী।
বিষয়টি স্বীকার করেছেন বিএসএফআইসির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা মাযহার উল হক খান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিএসএফআইসি ছয়টি মিলের উৎপাদন স্থগিত রেখেছে। তাছাড়া মজুদ কমে যাওয়ায় সীমিত পরিসরে চিনির বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। অনেকেই হতাশার কারণে ডিলারশিপ বাতিলের আবেদন করেছেন। তবে আর্থিক সংকটে সবাইকে একসঙ্গে জামানতের টাকা ফেরত দেয়া যাচ্ছে না। তবে সরকারি চিনিকলগুলো পুরোদমে উৎপাদন কার্যক্রমে সক্রিয় হলে বিএসএফআইসির চিনি বিপণন কার্যক্রম ফের চাঙ্গা হবে বলে মনে করছেন তিনি।
সারা দেশে বিএসএফআইসির নিবন্ধিত ডিলার ছিলেন ৫ হাজার ৩৬০ জন। চিনিকলে উৎপাদিত চিনি বরাদ্দপত্রের মাধ্যমে সংগ্রহ করে দেশব্যাপী বিক্রি করতেন এসব ডিলার ব্যবসায়ী। তবে কয়েক বছর ধরে ডিলারদের কাছে চিনি বরাদ্দ অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন সময়ে বরাদ্দ প্রদান করা হলেও বেসরকারি মিলের পরিশোধিত চিনির দামের সঙ্গে সরকারি মিলের চিনির দামের তারতম্যের কারণে ডিলাররাও দীর্ঘদিন ধরে লোকসানের মধ্যে ছিল। লোকসানের আশঙ্কায় বরাদ্দকৃত চিনি উত্তোলনে ব্যর্থ হলে টনপ্রতি ২০০ টাকা হারে জরিমানা কর্তনের ফলে ডিলারদের লোকসান বেড়েছে। এ কারণে কয়েক বছর ধরে চিনি উত্তোলনের পরিবর্তে ডিলারশিপ নবায়ন করেননি অধিকাংশ ব্যবসায়ী। সম্প্রতি দেশব্যাপী চিনিকল বন্ধ করে দেয়ার গুঞ্জনে ডিলারশিপই বাতিল করতে চাইছেন তারা।
বাংলাদেশ চিনি ডিলার ব্যবসায়ী সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, দেশের চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন বিএসএফআইসির ডিলাররা। তবে দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত থাকলেও লোকসানের মধ্যেও ডিলারশিপ ধরে রেখেছেন তারা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চিনি সরবরাহ না দেয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন চিনিকলের উৎপাদন বন্ধের খবরে অনেকেই তাদের জামানত তুলে নিচ্ছেন। সরকারি এসব ডিলার ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চিনির বাজার চলে গেলে বেসরকারি পর্যায়ে চিনির দাম নিয়ে কারসাজির সুযোগ তৈরি হবে বলে আশঙ্কা করেন তিনি।
বিএসএফআইসি সূত্রে জানা গেছে, সরকারি ১৫টি চিনিকলের মধ্যে চলতি মাড়াই মৌসুমে ছয়টি মিলের উৎপাদন কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে। মিলগুলো হচ্ছে পঞ্চগড় সুগার মিল, সেতাবগঞ্জ সুগার মিল, শ্যামপুর সুগার মিল, রংপুর সুগার মিল, পাবনা সুগার মিল ও কুষ্টিয়া সুগার মিল। ২০১৯-২০ অর্থবছরে সরকারি মিলগুলোতে ১ লাখ ১৫ হাজার টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও উৎপাদন হয়েছে ৮২ হাজার টন। ফলে চলতি মৌসুমে ছয়টি মিল বন্ধ থাকলে চিনি উৎপাদন ৬০-৬৫ হাজার টনে নেমে আসবে। ফলে বাধ্য হয়ে বিএসএফআইসি ডিলার পর্যায়ে চিনি বিক্রি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে।
এদিকে বিএসএফআইসির মজুদ চিনির পরিমাণও আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। গত ১ জুলাই প্রতিষ্ঠানটির চিনির মজুদ ছিল ৫৬ হাজার ৩০ দশমিক ৯১ টন। সর্বশেষ ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত মজুদ নেমে এসেছে ৩৫ হাজার ৭১৭ দশমিক ৭২ টনে। এর মধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, ফায়ার সার্ভিস ও মিলস রেশনের জন্য মোট ১৭ হাজার ৪১৭ টন সংরক্ষণ করা রয়েছে। ফলে সংরক্ষিত ছাড়া বিএসএফআইসির মজুদ নেমে এসেছে ১৮ হাজার ৩০০ টনে। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির সক্রিয় প্রায় ১ হাজার ৮০০ জন ডিলারের কাছে ৩ হাজার ৬০০ টন চিনির বরাদ্দপত্র দেয়া থাকলেও সেগুলো উত্তোলন না করে ডিলারশিপ বাতিলে ঝুঁকছেন ব্যবসায়ীরা।