২০১৩ সালের জানুয়ারিতে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদালয়ে (শাবিপ্রবি) মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য স্থাপনের উদ্যোগ নেয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বরে ‘মুক্তিযোদ্ধা সন্তান ও মা’-এর ভাস্কর্য স্থাপনের জন্য ভিত্তিও নির্মাণ করা হয়। তবে ভাস্কর্য স্থাপনের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’-এর অভিযোগ এনে প্রতিবাদে নামে একটি মহল। এ সময় তাদের সঙ্গে যোগ দেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও। তাদের প্রতিবাদের মুখে আটকে যায় ভাস্কর্য স্থাপন। সাত বছরেও এ ভাস্কর্য আর নির্মাণ হয়নি।
এর আগে ১৯৯৯ সালে শাবিপ্রবির ছাত্রহল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে ও ছাত্রীহল শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নামে নামকরণের সিদ্ধান্ত নেয় সিন্ডিকেট। এমন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ওই সময় মাঠে নামে জামায়াত-শিবিরসহ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক গোষ্ঠী। সিলেটজুড়েই আন্দোলন গড়ে তুলে তারা। ওই আন্দোলনে আব্দুল মুনিম বেলাল নামে শিবিরের এক কর্মী বিজিবির (তত্কালীন বিডিআর) গুলিতে নিহত হন। সে সময় নামকরণের পক্ষে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমদ, প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানসহ বিশিষ্টজনরা শাবিপ্রবির ফটকে এসে অনশন করেন, যা দেশজুড়েই বেশ আলোচনার জন্ম দেয়। কিন্তু তীব্র আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু ও জাহানারা ইমামের নামে নামকরণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে প্রশাসন। ২০০০ সালের ৬ মে ৮৯তম সিন্ডিকেট সভায় হলের নামকরণে তত্কালীন রাষ্ট্রপতি স্থগিতাদেশ জারি করেন।
সরেজমিন ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চত্বরের পাশে গোলচত্বর হিসেবে পরিচিত জায়গায় ভাস্কর্যের জন্য নির্মিত ইট সিমেন্টের ভিত্তি এখন রয়ে গেছে। দীর্ঘদিন অযত্নে পড়ে থাকার পর সমাবর্তন উপলক্ষে গত বছর এ জায়গার কিছুটা সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়। তবে ভাস্কর্যের জায়গা এখনো ফাঁকা রয়ে গেছে।
তবে এ স্থানে ভাস্কর্য নির্মাণ সম্ভব না হলেও ক্যাম্পাসের একটু ভেতরেই ‘চেতনা ৭১’
নামে একটি ভাস্কর্য রয়েছে শাবিপ্রবিতে। ২০১২ সালে নির্মিত এ ভাস্কর্য নিয়ে কোনো আপত্তি আসেনি।
শাবিপ্রবির ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ শিক্ষকবৃন্দ’-এর আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আব্দুল গনি বলেন, এ ক্যাম্পাসে, সিলেট শহরে যেসব স্বাধীনতাবিরোধী ভাস্কর্যের বিরোধিতা করেছিল, তারা ও তাদের দোসররাই আজ জাতীয়ভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। আমরা চাই, আমাদের ক্যাম্পাসের অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যের কাজ দ্রুত সমাপ্ত করা হোক।
এ প্রসঙ্গে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমদ বলেন, আমি এখানে যোগ দেয়ার আগেই গোলচত্বরের ওই ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ শুরু হয়। এর বিরুদ্ধে মৌলবাদী গোষ্ঠী মাঠে নেমেছিল। পরে আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামায়াত সবাই এর বিরোধিতা করে। কারণ কারো সঙ্গে আলোচনা না করেই ভাস্কর্যটির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল। সবার সঙ্গে কথা বলে কাজ করলে হয়তো এ সমস্যা হতো না। পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে তত্কালীন অর্থমন্ত্রী ও সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য আবুল মাল আবদুল মুহিত ভাস্কর্যের কাজ বন্ধ রাখতে বলেন। এখন এ কাজ আবার শুরু করতে হলে প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিয়ে করতে হবে।
উপাচার্য বলেন, ভাস্কর্য হলো সৌন্দর্য। এর সঙ্গে ধর্মের কোনো যোগ নেই। আমিও চাই, আমাদের ক্যাম্পাসে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য নির্মিত হোক। তবে আমার মেয়াদকাল প্রায় শেষ হয়ে আসছে। বিশ্ববিদ্যালয় এখন খুব সুন্দরভাবে চলছে। তাই শেষ সময়ে এসে আমি কোনো ঝামেলায় জড়াতে চাই না। এ বিষয়ে তাই সবার সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।