ডিসেম্বর মাস বিজয়ের মাস।
একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী দীর্ঘ নয় মাস এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চালিয়ে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। কিন্তু কেউ কি জানত সারা দেশ বিজয়ের আনন্দে যখন আত্মহারা, অলক্ষ্যে তখন ঘটেছিল এক হূদয়বিদারক তাণ্ডব। শেষ মুহূর্তে পরাজয় তথা স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় নিশ্চিত জেনে হানাদার বাহিনী এ দেশের কৃতী বুদ্ধিজীবীদের নিধনের কাজটি সম্পন্ন করে ফেলেছে। সেই থেকে বিজয়ের মাসে একটা কালো দিন ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। সেদিন কালো পতাকায় ঢেকে যায় দেশ, আমরা অবনত চিত্তে স্মরণ করি আমাদের কৃতী সন্তান শহীদ বুদ্ধিজীবীদের—‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা, আমরা তোমাদের ভুলবো না।’
দুই.
বিজয়ের মাস। যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার ডাক দিয়েছিলেন, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর জন্য নির্মম পরিহাস, সেই উদ্যানে তাদের আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা হয়েছিল ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১।
লাখ লাখ প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া বিজয় দিবসটি তাই উদযাপিত হওয়ার অপেক্ষায় থাকে। প্রতি বছর বিজয় দিবস আসে এবং যায়।
এবারকার দিবস বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও আমাদের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্ববহ। ইতিহাসের এক বিশেষ সন্ধিক্ষণে আমরা আমাদের মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করছি। কয়েক দিন পর আমরা আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে পদার্পণ করব। আমরা স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করেছি। গোটা জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে নভেল করোনাভাইরাস মহামারী মোকাবেলা করে সারা বিশ্বের বুকে নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। প্রমত্তা পদ্মার বুক চিরে নিজেদের অর্থায়নে নির্মাণাধীন পদ্মা সেতু মাত্র সপ্তাহ খানেক আগে দেশের দুই প্রান্তকে সংযুক্ত করেছে।
তিন.
এক টিভি চ্যানেল আমার কাছে জানতে চেয়েছে বাংলাদেশের জন্মের ৫০ বছরে পা দেয়ার প্রাক্কালে এবং বিশেষত বিজয়ের মাসে আমি স্বাধীন বাংলাদেশে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কী ‘বিজয়’ দেখছি। আমার উত্তর ছিল সোজাসাপটা এবং সংক্ষিপ্ত নিম্নরূপ:
- বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ৩ শতাংশ থেকে ১ দশমিক ২ শতাংশ, প্রজনন হার ৭ থেকে ৩ এবং খানার আকৃতি ৬ থেকে ৪—জনমিতিক বিপ্লব ঘটেছে!
- খাদ্য উৎপাদন চার গুণ বৃদ্ধি এবং চাল উৎপাদনে প্রায় স্বয়ম্ভর, তা সবুজ বিপ্লবের অবদান;
- মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ রুপালি বিপ্লব সংঘটিত;
- প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় মেয়েদের প্রায় ১০০ শতাংশ অন্তর্ভুক্তি এবং নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি;
- পদ্মা সেতুসহ নির্মাণাধীন মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নের অপেক্ষায়; গ্রামীণ রাস্তাঘাট ও গ্রাম-শহর যোগাযোগ সহজীকরণ;
- অর্থনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তির উত্থান, যেমন: জনশক্তি রফতানি, তৈরি পোশাক, বৈদেশিক সাহায্যনির্ভরতা হ্রাস বিশেষত
- নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ এবং প্রায় ৭০ শতাংশ খানায় বিদ্যুৎ এবং স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা;
- ব্যাপক দারিদ্র্য হ্রাস—৭০ থেকে ১৬ শতাংশ;
- নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পদার্পণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪২ বিলিয়ন ডলার;
- তলাবিহীন ঝুড়ি নয়, বরং উন্নয়নের রোল মডেল—হতাশার অন্ধ সুড়ঙ্গ শেষে আলোর সাক্ষাৎ পাওয়া।
চার.
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এ বছর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী পালিত হচ্ছে। কাজেই এই বিশেষ বছরে এই দিনটি দ্বিমাত্রিক রূপ নিয়েছে। ওয়েবিনারে পরিচালিত এই আলোচনায় বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের সদস্যরা অংশগ্রহণ করে অশ্রুসিক্ত স্মৃতিচারণ করেন। এদের মধ্যে ছিলেন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাসান মাহমুদ আলী এমপি, মেঘনা গুহঠাকুরতা, জিয়াউদ্দিন আহমেদ, শাওন মাহমুদ, আসিফ মুনির তনয়, রোকাইয়া হাসান নিলি, জাহীদ রেজা নূর এবং ফেরদৌসী মজুমদার। আমার নিজের মত, এমন একটা সেমিনারের শিরোনাম হতে পারত—‘পিতার গল্প’ এবং এই গল্পগুলো নিয়ে একটা বই বের করা যেতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নিপুণ গ্রন্থনা, সুচারু সঞ্চালনা এবং সার্বিক তত্ত্বাবধানে পরিচালিত দেড় ঘণ্টার পর্বটি ৩ ঘণ্টায় গড়ালেও উপস্থিত শ-দেড়েক অতিথি প্রাণভরে উপস্থাপনা উপভোগ করেছেন বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। বিশেষত আসিফ মুনির কর্তৃক মাহাবুব আলম চৌধুরী রচিত ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ কবিতা থেকে আবৃত্তি, ‘কবর’ নাটকের আংশিক সংলাপ উপস্থাপন এবং রোকাইয়া হাসান নিলির গাওয়া রবীন্দ্রসংগীত সবার মন ছুঁয়ে নিয়ে অনুষ্ঠানে নতুন মাত্রিকতা এনে দেয়।
অনুষ্ঠানের ইতি টানেন মাননীয় উপাচার্য এমএম শহিদুল হাসান। সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললেন, তিনিও এক শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের জামাতা, তাই প্রতি বছর দিনটি তার কাছে উদযাপন এবং একই সঙ্গে অনুভবেরও। আরো জানালেন, ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকে।
পাঁচ.
একটু পেছনে ফিরে তাকাই। একটু আগেও বলেছি যে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের এদেশীয় দোসরদের সহায়তায় বেছে বেছে জাতির মেধাবী সন্তানদের হত্যা করে ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১। এ তালিকায় ছিলেন শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী, সংস্কৃতিসেবী, সাংবাদিক, প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ। আমাদের চিন্তাচেতনায় যদিও বিষয়টি ঢাকাকেন্দ্রিক। আসলে সারা দেশেই বেছে বেছে বুদ্ধিজীবী নিধনের কাজটি চলে। শহীদ সেসব বুদ্ধিজীবীর নাম-ঠিকানা এখনো অজানা।
প্রসঙ্গত বলে রাখা প্রয়োজন যে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকা দীর্ঘ। তালিকা ধরে ধরে বাংলার শ্রেষ্ঠ মনীষাগুলোকে হত্যা করার নৃশংসতম অপকর্মটির শুরু সেই ২৫ মার্চ রাত থেকেই। ১৯৭২ সালে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশে তথ্য মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ নামে একটা বই প্রকাশ করে। সেখানে শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে ১ হাজার ৭০ জনের নাম প্রকাশ করা হয়েছিল। ১৯৮৫ সালে বাংলা একাডেমি শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষগ্রন্থ প্রকাশ করে। এই বইয়ে বুদ্ধিজীবীর সংজ্ঞা আরেকটু নির্দিষ্ট করা হয়, ২০১ জন শহীদ বুদ্ধিজীবীর নাম-পরিচয় কোষগ্রন্থটিতে ঠাঁই পায়। অনেকের ঠিকানা-তথ্য ততদিনে দুর্লভ হয়ে গেছে। ১৯৯৭ সালের ৪ ডিসেম্বর বাংলা একাডেমি কথাসাহিত্যিক রশীদ হায়দারের সম্পাদনায় প্রকাশ করে ১০ খণ্ডের স্মৃতি: ১৯৭১। ১০ খণ্ডে ২৩৮ জন শহীদ বুদ্ধিজীবীর স্মৃতিচারণা করেন নিকটজনরা। এই কাজগুলোর জন্য বাংলা একাডেমি ও রশীদ হায়দার আমাদের কৃতজ্ঞতাভাজন হয়ে রইবেন। তবে তালিকা যে অসম্পূর্ণ, তা সহজবোধ্য।
বিশ্ববিদ্যালয় আবাসন থেকে শিক্ষকদের চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে গিয়েছিল ঘাতকরা। মিরপুরে বধ্যভূমিতে জলা-জংলায় পড়ে থাকে কারো মরদেহ। যেমন করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এদেশীয় সহযোগীরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল মুনীর চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সার, সিরাজুদ্দীন হোসেন, সেলিনা পারভীন, ফজলে রাব্বী, আলীম চৌধুরী—নক্ষত্রপ্রতিম আমাদের শ্রেষ্ঠ মানুষগুলোকে। তালিকা ধরে ধরে। শুধু আজকের শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসেই নয়, আমাদের সামনে তারা সবসময়ই ধ্রুব নক্ষত্র হয়ে আছেন।
ছয়.
কিন্তু বিজয়ের মাসেও মন আমাদের বেদনাক্লিষ্ট থাকে, তার কারণ সমাজে বিদ্যমান তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য, সুশাসনের ঘাটতি, ব্যাপক দুর্নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের অভাব, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ইত্যাদি প্রতিকূল পরিস্থিতি কষ্টে অর্জিত স্বাধীনতার সুফল তথা জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে পারছে না।
তার পরও আশায় আশায় বুক বেঁধে থাকি—আমরা করব জয় একদিন, মনের গভীরে আছে প্রত্যয়।
আবদুল বায়েস: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও অর্থনীতির অধ্যাপক; বর্তমানে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির খণ্ডকালীন শিক্ষক