একাত্তরের গল্পেই লুকিয়ে আছে বিজয়ের প্রেরণা

প্রতিবছর ঘুরে বিজয় দিবস আসে । আর সেই দিবস কে কেন্দ্র করে, সেই দিবসকে রঙিন করে সাজাতে এবং সাজতে ব্যস্ত থাকি আমি এবং আমরা সবাই । নানা কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত থাকে দেশের গণমাধ্যম, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ। নির্দিষ্ট দিনে সেই দিবসের সঙ্গে জড়িতদের স্মরণ করা হয় মহা উৎসবে। সেই নির্দিষ্ট একটি দিন যে তাদের কে ব্যতিব্যস্ত করে তোলার মাধ্যমে দেশ মেতে উঠে অন্য এক খেলায়।

প্রতিবছর ঘুরে বিজয় দিবস আসে । আর সেই দিবস কে কেন্দ্র করে, সেই দিবসকে রঙিন করে সাজাতে এবং সাজতে ব্যস্ত থাকি আমি এবং আমরা সবাই । নানা কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত থাকে দেশের গণমাধ্যম, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ। নির্দিষ্ট দিনে সেই দিবসের সঙ্গে জড়িতদের স্মরণ করা হয় মহা উৎসবে। সেই নির্দিষ্ট একটি দিন যে তাদের কে ব্যতিব্যস্ত করে তোলার মাধ্যমে দেশ মেতে উঠে অন্য এক খেলায়।

২০২০ সালে বাংলাদেশ বিজয়ের ৪৯ তম দিবস পালন করছে। কিন্তু এই বিজয়ের উল্লাসের পেছনে, বিজয়ের আনন্দের পেছনে রয়েছে একটি দেশ জন্মের করুণ ইতিহাস। সেই ইতিহাসের গল্প জানতে পারলেই নিতে পারবো বিজয়ের সত্যিকারের সাধ। আমরা জানি মুক্তিযুদ্ধ মূলত ছিল একটি জনযুদ্ধ। যে যুদ্ধের পূর্বেও আরো কয়েকবার রক্তে রন্জিত হয়েছে বাংলা মায়ের বুক। স্বাধীনতার এই যুদ্ধে যে কেবল মানুষ প্রাণ দিয়েছে তা নয় এই সময় সংঘটিত হয়েছিল পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জেনোসাইড, খুন, গণহত্যা, লুট, ধর্মান্তরিতকরণ, সংখ্যালঘুর সম্পত্তি দখল, ধর্ষণ এবং বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ নানা ধরনের জঘন্যতম কাজ।

বাংলাদেশ জন্মের এই ইতিহাস এই বর্বরতার গল্পগুলো নিয়ে দেশের মানুষ অনেকটা অজানার দেশে। এর কারণগুলো কি আমাদের কাছে স্পষ্ট? একটু সতর্কভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে প্রকৃত চিত্র। বাংলাদেশ জন্মের ইতিহাস, শহিদদের আত্মত্যাগ বাংলার বুকে জমানো ক্ষতগুলোর সঠিক তথ্যচিত্র এবং শত শত বুদ্ধিজীবীসহ বাংলার আপামর জন সাধারণের প্রতিটি আত্মত্যাগের শোকগাথার কোনো জনপ্রিয় আর্কাইভ নেই। বিজয়ের ৪৯ বছরেও এমন কোনো আর্কাইভ তৈরি করতে না পারার পেছনে মূলত কারণগুলো যদি খুঁজে বের করতে চাই তাহলেও আমরা দেখবো যে বিজয়ের সঠিক ইতিহাস না জানার কারণে এই বিষয়গুলো নতুন প্রজন্মের কাছে তার স্ব স্ব আবেদন ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।

আমরা যদি প্রশ্ন করি নতুন প্রজন্ম মূলত কোথা থেকে জ্ঞান অর্জন করবে? পাঠ্যপুস্তক, গল্প, উপন্যাস, সাহিত্য নাকি তথ্য প্রযুক্তির নানা মাধ্যম থেকে। আমরা যদি লক্ষ্য করি এই সবগুলো দিকের কোনটাই সত্যিকার অর্থে ওইভাবে মুক্তিযুদ্ধের সকল তথ্য এবং উপাত্ত ধারণ করে না। অল্প করে যা প্রচার করা হয় তার মধ্যেও নানা রাজনৈতিক মত এবং মতাদর্শের প্রভাব লক্ষ্যণীয়। বর্তমান নতুন প্রজন্ম যতটা না একজন সেলিব্রেটিকে চেনেন জানেন এবং তাদের খবর রাখেন ততটা কি দেশের সূর্য সন্তানদের সম্পর্কে জানেন??

পরীক্ষা এবং চাকরির সুবাদে কিছু সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী নাম জানলেও সেইসব সূর্যসন্তানদের জীবনের গল্প তারা কখনোই জানেন না। কিন্তু এই না জানাটা কি সত্যি নতুন প্রজন্মের দায়?

আমি মনে করি না। কারণ আমরা যদি শুধু শিক্ষাব্যবস্থার কথা চিন্তা করি তাহলে দেখবো মুক্তিযুদ্ধ কিংবা তার পূর্বের বা পরের ইতিহাস ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে শেখানো এখনও বাধ্যতামূলক করা হয়নি। জাতির সূর্য সন্তানদের বীরত্বপূর্ণ জীবন দান সম্পর্কে তাদের জানা সবার আগে জরুরি আর তা বাধ্যতামূলক করা না হলে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

আমরা আজো জানি না আরো কত শত বীরাঙ্গনা বাংলার বুকে মুখ লুকিয়ে রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধাদের সঠিক তালিকা এবং সত্যিকারে মুক্তিযুদ্ধাদের পূর্ণ মর্যাদা এখনো সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়নি। বাংলার সেই সূর্যসন্তানদের অপার্থিব গুণের স্পর্শে ধ্বংস হয়েছিল  সকল অপশক্তি একাত্তরের জনযুদ্ধে। সেই যুদ্ধে শিক্ষিত যুবক থেকে শুরু করে সাধারণ কৃষকের সন্তান এবং বুদ্ধিজীবী থেকে খেটে খাওয়া মানুষ একই মন্ত্রে দিক্ষিত হয়ে ছিলেন। এক সঙ্গে এক যোগে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, কোথায় পেলেন সেই শক্তি এবং অদম্য সাহস? কারণ সকলে একই মূলমন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে সেই বিজয়ের পতাকা ছিনিয়ে আনতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। সেই দিনের সেই অসীম সাহস, নিপীড়ন ও নির্যাতনের ইতিহাস সবকিছুকে বুকের চিতানলে জ্বালিয়ে দিয়ে যে তাজাপ্রাণ জীবন দিয়েছিল তাদের জন্য কেবল সাদা কালো কয়েকটি দিবস নয়, তাদের মহান আত্মত্যাগের মহিমায় উদ্দীপ্ত হয়ে আলোর মশাল হাতে নিয়ে নিজের দেশকে রক্ষা করা দেশের সকলের দায়িত্ব এবং কর্তব্য। সেই কাজগুলো সহজ হয়ে যাবে যখন নতুন প্রজন্ম একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পেছনের এবং পরের সকল ইতিহাস জানে এবং বোঝে। কারণ একাত্তরের গল্পেই লুকিয়ে আছে বিজয়ের সত্যিকারের প্রেরণা।

এক নদী রক্তের বিনিময়ে রক্তস্নাত যে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত যে বিজয় সেই বিজয়ের উল্লাস তখনই পরিপূর্ণ হবে যখন বিজয়ের আনন্দের পেছনের এই গল্পগুলো আমাদের নতুন প্রজন্মের মুখে মুখে পাখির বুলির মতো শোনা যাবে। তখনই সাদা-কালো এই শোকের দিবসগুলো লাল-সবুজের রঙে রঙিন হয়ে ধরা দিবে বাংলার প্রতিটি স্বপ্নাতুর মানুষের চোখে।

ফারজানা ইসলাম ভূঁইয়া 

সাবেক শিক্ষার্থী শাবিপ্রবি, সিলেট

নৃবিজ্ঞান বিভাগ

আরও