উপজেলা চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ইউএনওসহ ১৮ কর্মকর্তার নালিশ

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলা চেয়ারম্যান ফারুক ইমরুল কায়েসের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ এনে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত নালিশ করেছেন ইউএনও মুহাম্মদ মনসুর উদ্দিনসহ ১৮ সরকারি কর্মকর্তা। অভিযোগপত্রে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ইউএনওকে ‘বেশি কথা বললে পিটিয়ে নরসিংদী পাঠিয়ে দেবো’- বলে হুমকি দেয়ারও অভিযোগ করা হয়েছে। ইউএনওসহ উপজেলার শীর্ষ পর্যায়ের ১৮ কর্মকর্তার স্বাক্ষর সম্বলিত অভিযোগের একটি কপি শুক্রবার(১৩ নভেম্বর) রাতে বণিক বার্তার হাতে এসেছে। তবে উপজেলা চেয়ারম্যান অভিযোগের বিষয়ে অস্বীকার করেছেন।

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলা চেয়ারম্যান ফারুক ইমরুল কায়েসের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ এনে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত নালিশ করেছেন ইউএনও মুহাম্মদ মনসুর উদ্দিনসহ ১৮ সরকারি কর্মকর্তা। অভিযোগপত্রে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ইউএনওকে ‘বেশি কথা বললে পিটিয়ে নরসিংদী পাঠিয়ে দেবো’- বলে হুমকি দেয়ারও অভিযোগ করা হয়েছে।

ইউএনওসহ উপজেলার শীর্ষ পর্যায়ের ১৮ কর্মকর্তার স্বাক্ষর সম্বলিত অভিযোগের একটি কপি শুক্রবার(১৩ নভেম্বর) রাতে বণিক বার্তার হাতে এসেছে। তবে উপজেলা চেয়ারম্যান অভিযোগের বিষয়ে অস্বীকার করেছেন।

এদিকে জেলা প্রশাসক অভিযোগ পাওয়ার পর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপপরিচালক (ডিডিএলজি) রফিকুল ইসলামকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করেছেন বলে জানান।

লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার (১২ নভেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে উপজেলা পরিষদের মাসিক সমন্বয় সভা চলাকালীন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফারুক ইমরুল কায়েস উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার নিকট ভিজিডি ও মাতৃত্বকালীন ভাতার কার্ডের অংশ দাবী করেন। চেয়ারম্যানের এ কথার প্রেক্ষিতে ইউএনও মুহাম্মদ মনসুর উদ্দিন বিধি মোতাবেক তালিকা প্রনয়নের কথা বললে ক্ষিপ্ত হয়ে সভাস্থল ত্যাগ করেন উপজেলা চেয়ারম্যান। এর কিছুক্ষণ পরে ইউএনও অফিস সংলগ্ন করিডোরে লাগানো সিসি টিভি ক্যামেরাটি উপজেলা চেয়ারম্যান তার একজন ব্যক্তিগত লোক দিয়ে খুলে ফেলতে থাকেন। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের দৃষ্টিতে এলে তিনি তাৎক্ষনিকভাবে সিসি টিভি ক্যামেরা খোলার দৃশ্যটি মোবাইল ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলতে গেলে চেয়ারম্যান অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করে। এ সময় চেয়ারম্যান ইউএনওকে বলতে থাকেন ‘বেশি কথা বললে পিটিয়ে নরসিংদী পাঠিয়ে দিব। উপজেলা পরিষদ কি তোর বাবার সম্পত্তি, উপজেলা পরিষদ কি তুই চালাবি।'


এ অবস্থায় উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা উপজেলা চেয়ারম্যানকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করলে তাকেও ‘ঘার ধরে উপজেলা পরিষদ থেকে বের করে দিবো’ বলে হুমকি দেওয়া কথা লেখা আছে। এসময় অন্যান্য অফিসাররা এর প্রতিবাদ জানালে তাদেরকেও গালিগালাজ করার কথা উল্লেখ আছে।

এদিকে খবর পেয়ে আদিতমারী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুল ইসলাম ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনেন।

লিখিত অভিযোগে আরো উল্লেখ করা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা নুরেলা আকতারকে চেয়ারম্যান তার অফিস কক্ষে ডেকে নিয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং কর্মচারী ডেকে বলতে থাকেন ‘বেয়াদবটাকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দাও। রাস্তায় কেউ মানহানি ঘটালে এর দায় কেউ নেবে না।’

জেলা প্রশাসকের নিকট করা লিখিত আবেদনের অনুলিপি সমাজকল্যাণ মন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ ও রংপুর বিভাগীয় কমিশনারকে অনুলিপি দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ ১৮ কর্মকর্তার স্বাক্ষর রয়েছে।

আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহাম্মদ মনসুর উদ্দিন বলেন, ‘উপজেলা চেয়ারম্যান মহোদয়ের সবকিছুই ঠিক আছে। তিনি একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষ। কিন্তু ওনার ব্যবহার বা আচরণটা ভালো নয়। এভাবে কেউ কাজ করতে পারে না। আমরা সবকিছুই মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু হচ্ছিল না। গত বৃহস্পতিবারের (১২ নভেম্বর) ঘটনায় বাধ্য হয়েই জেলা প্রশাসক মহোদয়ের নিকট লিখিতভাবে প্রতিকার চেয়েছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘লিখিত প্রতিকার চাওয়ার আগে আমরা জেলা প্রশাসক মহোদয়ের ওখানে অপেক্ষা করেছি হয়তো তিনি এসে বিষয়টি সুরহা করবেন। কিন্তু তিনি কথা দিয়েও আর আসেননি। পরে আমরা লিখিত দিয়েছে।’

লিখিত অভিযোগে উল্লিখিত কিছু বিষয় (পিটিয়ে নরসিংদী পাঠিয়ে দেবো। উপজেলা কি তোর বাপের সম্পদ। উপজেলা কি তুই চালাবি) প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ মনসুর উদ্দিন দাবি করে বলেন, ‘অভিযোগে যা যা লিখিত রয়েছে; তার সবকিছুই প্রমাণ রয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘উপজেলা চেয়ারম্যান মহোদয়ের আশপাশের কিছু লোকজন তার কান ভারী করে থাকে। এসব লোকজনের মধ্যে কয়েকজনের কথায় তিনি আমাদের কর্মকর্তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন বলে মনে হয়। তিনি মনে করেন আমরা এখানে সবাই দুর্নীতিগ্রস্ত। এটাই ওনার দৃষ্টিতে সবসময় সন্দেহ।’    

আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ অপর ১৭ কর্মকর্তার অভিযোগের বিষয়ে পড়ে শোনালে উপজেলা চেয়ারম্যান ফারুক ইমরুল কায়েস বলেন, ‘আমি কাউকে খারাপ কিছু বলিনি। ইউএনও সকল কর্মকর্তাকে একত্র করে আমার বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসক মহোদয়ের নিকট লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে। অভিযোগপত্রে যে ভাষায় লেখা হয়েছে। এসবের কোনো ভিত্তি নেই। আমি সঠিক তদন্ত চেয়েছি।’

তিনি বলেন, স্থানীয় জনগণের অভিযোগ উপজেলার অফিস গুলোতে সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতি চলছে। জনগণকে হয়রানি করা হয়। উপজেলার প্রত্যেক দফতরের প্রধানদের অনিয়ম, দুর্নীতি ও হয়রানি বন্ধ করতে বলেছি এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা মোতাবেক সুশাসন নিশ্চিত করতে বলেছি। আমার এ কথাগুলো বিএনপি-জামায়াত সমর্থন করে কতিপয় কর্মকর্তা স্বাভাবিকভাবে নেয়নি বরং উল্টো আমাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করে আসছে। এ অভিযোগ তারই ফসল।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমি কখনো কারো সাথে কোনো অন্যায় করিনি। জনগণের বিপুল ভোটে নির্বাচিত একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে এবং মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে সাধারণ মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলি। আমার পরিবার আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে। তাই কোন কোন কর্মকর্তা এতে রুষ্ঠ হয়ে এই অভিযোগে ইউএনও’র সাথে সামিল হয়েছেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমার পিতা জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক সামসুল ইসলাম সুরুজকে ২০০৩ সালে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে। এখনো বিচার হয়নি। এখন আমার বিরুদ্ধেও নানা ষড়যন্ত্র চলছে।’

অপর এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তার সাথে যে কথা হয়েছে, তা তিনি না বলে উল্টোভাবে উপস্থাপন করেছেন। এটা একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি করতে পারেন না। এছাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যা করছেন, সেটাও আপনারা (গণমাধ্যম) তদন্ত করে দেখেন। আসলে ভেতরের ঘটনা অন্য কিছু আছে কি না?

এ বিষয়ে জানতে চাইলে লামনিরহাট জেলা প্রশাসক মো. আবু জাফর বলেন, ‘স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপ-পরিচালক (ডিডিএলজি) ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক(সার্বিক) রফিকুল ইসলামকে তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছি। আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে তাকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর তা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পাঠানো হবে।’

আরও