স্কয়ার, এসিআই ও এপেক্স—দেশের করপোরেট জগতের তিন জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানের নাম। এ তিন প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারসহ স্বনামধন্য উদ্যোক্তাদের উদ্যোগে জন্ম হয়েছিল মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি) লিমিটেডের। দেশের তুলনামূলক ভালো ব্যাংকের স্বীকৃতিও পেয়েছে ব্যাংকটি। যদিও দুই দশকের পথ পাড়ি দেয়া ব্যাংকটির সম্প্রসারণ, মূলধন, সম্পদের মান ও মুনাফা পরিস্থিতি নিয়ে সন্তুষ্ট নয় সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষই।
ব্যাংকটির সাবেক ও বর্তমান শীর্ষ নির্বাহীসহ সংশ্লিষ্টরাই বলছেন, সুযোগ থাকা সত্ত্বেও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক কাঙ্ক্ষিত সম্প্রসারণে ব্যর্থ হয়েছে।
দেশে ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের ঘাটতির জন্য দায়ী করা হয় পরিচালনা পর্ষদকে। পরিচালকদের যোগসাজশে ঋণ বিতরণের মাধ্যমে ব্যাংকের সম্পদ লুণ্ঠনের অভিযোগ উঠছে অহরহ। এদিক থেকে অনেকটাই নিরাপদ থাকার কথা মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক। এর আগে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ছিলেন এপেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী, স্কয়ার গ্রুপের স্থপতি স্যামসন এইচ চৌধুরী, এসিআইয়ের ড. আরিফ দৌলার মতো করপোরেট গুরুরা। স্কয়ারের অঞ্জন চৌধুরীর মতো শিল্প উদ্যোক্তাও ছিলেন ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে। তার পরও প্রত্যাশা অনুযায়ী সম্প্রসারণ ও সম্পদের গুণগত মান ধরে রাখতে পারেনি মিউচুয়াল ট্রাস্ট।
গত পাঁচ বছরে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ঋণ ও আমানতের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু সে তুলনায় বাড়েনি ব্যাংকটির নিট মুনাফা। ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা শেষ হয়ে যাচ্ছে ক্রমাগতভাবে বেড়ে চলা খেলাপি ঋণের কারণে। গত পাঁচ বছরে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে চার গুণ হয়েছে। ২০১৫ সাল শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২০৩ কোটি টাকা। ২০১৯ সাল শেষে খেলাপি হয়ে যাওয়া ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ২২ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। খেলাপি ঋণের এ পরিসংখ্যান মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনের। তবে প্রকৃত অর্থে ব্যাংকটির দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ খেলাপি ঋণের কয়েক গুণ বেশি। কাগজে-কলমে এমটিবির খেলাপি ঋণের হার ৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ। যদিও সঠিকভাবে হিসাবায়ন করলে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার ২০ শতাংশ ছাড়াবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
প্রত্যাশা অনুযায়ী এমটিবির সম্প্রসারণ হয়নি বলে স্বীকার করেছেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুুবুর রহমান। পরিচ্ছন্ন পরিচালনা পর্ষদ থাকা সত্ত্বেও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ঋণমান এতটা খারাপ কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ভালো ঋণগ্রহীতা চিনতে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ভুল ছিল। এ কারণে ব্যাংকের অনেক ঋণের মান খারাপ হয়ে গেছে। ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে ডিউ-ডিলিজেন্সেরও অভাব ছিল। একই সঙ্গে ঋণগ্রহীতাদের মনিটরিং ও সুপারভিশনেও ঘাটতি ছিল। এসব কারণে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ঋণমান প্রত্যাশিত নয়। এ ব্যাংকের ভালো পরিচালনা পর্ষদের যথাযথ ব্যবহার এর আগে হয়নি। এজন্য ব্যাংকের সম্প্রসারণও কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছেনি।
২০১৯ সালের নভেম্বরের শেষের দিকে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে দায়িত্ব নেন সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ব্যাংকটিকে ঠিক করতে ‘যুদ্ধ’ করতে হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। এর আগে ঢাকা ও ব্র্যাক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী পদে দায়িত্ব পালনকারী সৈয়দ মাহবুব বলেন, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে এসে আমি একটি যুদ্ধের মধ্যে পড়েছি। দায়িত্ব গ্রহণের পর ব্যাংকের কর্মীদের জাগিয়ে তোলা, সম্পদের গুণগত মান বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিলাম। এর মধ্যেই বিশ্বব্যাপী মহামারী আঘাত হেনেছে। এ অবস্থায় ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় কমানোর উদ্যোগও নিতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে যে পরিস্থিতিতে পড়েছি, সেটি বর্ণনাতীত।
১৯৯৯ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর যাত্রা করেছিল মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ২০০৭ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করেন এপেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী। এরপর ২০১১ সাল পর্যন্ত এমটিবির চেয়ারম্যান ছিলেন স্কয়ার গ্রুপের স্থপতি স্যামসন এইচ চৌধুরী। ২০১২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এসিআই গ্রুপের পরিচালক আরিফ দৌলা ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে এমটিবির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন এপেক্স ট্যানারির পরিচালক মো. হেদায়েতুল্লাহ।
করপোরেট জায়ান্টদের পর্ষদে পেয়েও ব্যাংকটি কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছতে পারেনি বলে মনে করেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক এমডি আনিস এ খানও। ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত টানা ১১ বছর মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর দায়িত্বে ছিলেন তিনি। এমটিবির দীর্ঘকালীন শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বণিক বার্তাকে আনিস এ খান বলেন, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো এর পরিচালনা পর্ষদ। শীর্ষ নির্বাহীর দায়িত্ব পালনকালে আমি ব্যাংকটিতে শতভাগ স্বাধীনতা পেয়েছি। পরিচালনা পর্ষদ কখনো কোনো কাজে অনৈতিকভাবে আমাকে চাপ দেয়নি।
পরিচালনা পর্ষদের ভাবমূর্তি ও কার্যকর করপোরেট সুশাসনের উপস্থিতি সত্ত্বেও দুই দশকে এমটিবির অগ্রগতি, মূলধন কাঠামো, মুনাফা পরিস্থিতি নিয়ে আপনি সন্তুষ্ট কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এক বাক্যে বললে আমি সন্তুষ্ট না। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল মূলধন। সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী স্যার চাইতেন, ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাকালীন উদ্যোক্তারা পর্ষদে থাক। এজন্য তিনি মূলধন বাড়ানোর বিপক্ষে ছিলেন। কারণ মূলধন বাড়ালে ২ শতাংশের বাধ্যবাধকতা পালন করতে ব্যর্থ হওয়ায় কিছু উদ্যোক্তা পর্ষদে থাকতে পারতেন না। প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান হিসেবে মঞ্জুর এলাহী স্যার মূলধন বাড়ানোর বিপক্ষে ছিলেন। এত অল্প মূলধন নিয়ে দ্রুতগতিতে সামনে এগোনো সম্ভব ছিল না। মূলধন বৃদ্ধির জন্য আমরা স্টক ডিভিডেন্ড, রাইট শেয়ার ইস্যু ও বন্ড ছেড়েছি। সর্বশেষ ব্যাংকের ১০ শতাংশ শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে আমরা দ্য নরওয়েজিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড ফর ডেভেলপিং কান্ট্রিজ বা নরফান্ডকে নিয়ে এসেছি।
আনিস এ খান বলেন, ২০০৯ সালে আমি এমডি পদে দায়িত্ব গ্রাহণের সময় এমটিবির আমানত ছিল ৪ হাজার কোটি টাকা। দায়িত্ব ছাড়ার সময় আমি ব্যাংকের ১৯ হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত রেখে এসেছি। ঠিক সমান্তরালভাবে ব্যাংকের ঋণ বিতরণ বেড়েছে। ১০ বছর আগে এমটিবির ভালো কোনো অফিস ছিল না, ছিল না করপোরেট ব্র্যান্ড ভ্যালু। বর্তমানে এমটিবি দেশের ব্যাংকিং খাতে উজ্জ্বল ভাবমূর্তির প্রতিষ্ঠান ও ব্র্যান্ড হিসেবে নিজের অবস্থান করে নিতে পেরেছে।
চলতি বছরের জুন শেষে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ছিল ৭০৩ কোটি টাকা। এর সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের রিজার্ভ, রিটেইনড আর্নিংসসহ অন্যান্য সম্পদ মিলিয়ে ব্যাংকটির শেয়ারহোল্ডার ইকুইটি ১ হাজার ৭২৩ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। জুন শেষে এমটিবির আমানত ছিল ২০ হাজার ৮৯ কোটি টাকা। এ আমানত থেকে ১৯ হাজার ২০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকটি। সব মিলিয়ে এ সময়ে ব্যাংকটির ইকুইটি ও দায়ের পরিমাণ ছিল ২৬ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা।
ব্যাংক হিসেবে মিউচুয়াল ট্রাস্ট গত পাঁচ বছরে যতটা বড় হয়েছে, সে তুলনায় নিট মুনাফা বাড়েনি। ২০১৫ সালে ব্যাংকটির বিনিয়োগ ছিল ১০ হাজার কোটি টাকারও কম। কিন্তু ওই বছর ১৩৬ কোটি টাকা নিট মুনাফায় ছিল ব্যাংকটি। ২০১৯ সালে এমটিবির বিনিয়োগ প্রায় দ্বিগুণ বা ১৯ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। যদিও বছরটিতে ব্যাংকটির নিট মুনাফা হয়েছে মাত্র ১৩৩ কোটি টাকা। এ সময়ে এমটিবির খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪০৩ শতাংশ। খেলাপি ঋণের এ নাজুক পরিস্থিতিই ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা শেষ করে দিচ্ছে। করোনাভাইরাসের প্রভাবে এমটিবির ভবিষ্যৎ আরো বড় ঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছে। ব্যাংকটির শীর্ষ ঋণগ্রহীতাদের অনেকের অবস্থাই নাজুক।
করোনার প্রভাবে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের অনেক ভালো গ্রাহকও খারাপ হয়ে যাচ্ছে বলে স্বীকার করেন বর্তমান এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমানও। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণগ্রহীতাদের চলতি বছর কিস্তি পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থেকে নিষ্কৃতি দিয়েছে। তার মানে এই নয়, গ্রাহকরা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণের কিস্তি পরিশোধ করবেন না। কিস্তি না দেয়ায় প্রতিনিয়ত সুদের পরিমাণ বাড়ছে। আমাদের কিছু গ্রাহক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করছেন। কিন্তু বেশির ভাগ গ্রাহকই টাকা দিচ্ছেন না। এতে ভালো গ্রাহকরাও খারাপের দিকে যাচ্ছেন। আগামী বছর ব্যাংকের ওপর খেলাপি ঋণের যে ধাক্কা আসবে সেটি ভয়ের।
আরো পড়ুন: